রিং থেকে নামামাত্র কারা তাকে কাঁধে তুলে ড্রেসিংরুমে পৌঁছে দিয়েছিল। তখন তার মনে হচ্ছিল যা কিছু দেখছে শুনছে, সবই কেমন অবাস্তব। চায়ের দোকানের শিবা ব্রেবোর্নকে কাঁপিয়ে এখন ‘শিবাজী শিবাজী’ ধ্বনিতে নায়কের মর্যাদা পাচ্ছে। শিবা বিশ্বাস করতে পারছে না।
.
পরদিন কলকাতা থেকে গোরাবাবু প্লেনে উড়ে এলেন। খবর দিতেই বিকেলে তার হোটেলে শিবা দেখা করতে এল সুনীলকে নিয়ে। গোরাবাবু সুনীলকে ঘরের বাইরে কিছুক্ষণের জন্য পাঠিয়ে শিবাকে বললেন, ‘এই ফাইনালটা নিয়ে হেভি বেটিং হচ্ছে শিবা। হাজার হাজার টাকার ব্যাপার। আমারও অনেক টাকা এতে রয়েছে। তুমি ফার্স্ট—রাউন্ড নক আউট পারবে? এই নিয়েই বেটিং, দরটা বেশি তোমারই বিরুদ্ধেই।’
‘আমি পারব না ধরে নিয়েছে?’ ঔদ্ধত্য এবং নিজের উপর প্রবল আস্থা শিবার স্বরে ফুটে উঠল।
‘হ্যাঁ। বারবার তিনবার যা পেরেছ চতুর্থবার তা হবে না, এটাই সবাই ধরে নিচ্ছে।’
‘তাহলে আমি ফার্স্ট রাউন্ডেই করব।’
‘কিসের জোরে একথা বলছ?’
‘রোজারিও বুড়ো হয়ে গেছে। গায়ের জোর কমে গেছে, আমার থেকে স্লো, দমেও পারবে না।’
‘পাঁকাল মাছের মতন পিছল, শেয়ালের মতো ধূর্ত। কিভাবে লড়াইগুলো পয়েন্টে জিতেছে লক্ষ করেছ?’
‘করেছি। সব জারিজুরি ভেঙে যাবে এই লেফট হুক যখন ওর চোয়ালে পড়বে।’ বলতে বলতে শিবা বাঁ হাতের মুঠো বাতাসের মধ্যে দ্রুত চালাল।
‘রোজারিও কিন্তু বেহরামের লোক। আমার পার্টনার হলেও ওকে আমি বিশ্বাস করি না। ও চাইবে আপসেট ঘটিয়ে দাঁও মারতে। তোমাকে কিছু খেতে দিলে খাবে না, জলও না। বাইরে থেকে জল নিয়ে যাবে ফ্লাস্কে। মনে রেখো তোমার উপর অনেক টাকা আমি ধরেছি।’
শিবার ঠোঁট তাচ্ছিল্যে একটু বেঁকে গেল। চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট চতুর্থ বারও হবে জেনে রেখে দিন।’
কিন্তু শিবা একটা জিনিস জানত না রোজারিওর বৌ ও ছেলে রিং—এর ধারে বসবে। ছেলে একবার অন্তত বাবাকে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে লড়তে দেখুক, বাবার বলদৃপ্ত তেজী ছবিটি ওর মনে গেঁথে যাক, এটাই রোজারিওর ইচ্ছা।
ফাইনালের দিন অন্যান্য ওয়েটের লড়াইগুলোর দিকে দর্শকরা ভ্রূক্ষেপ করল না। তারা প্রায় সাত—আট হাজার। প্রথম রাউন্ডেই নক আউট করার ভেল্কি দেখতে তারা এসেছে। তিনবার ঘটিয়েছে যে, সে চতুর্থবারও ঘটাবে না কেন? বোম্বাইয়ের বক্সিং পাগলরা অপেক্ষা করছে আর একবার ভেল্কি দেখার জন্য।
তাই শিবা রিং—এ উঠতেই রকেটের মতো একটা উল্লাস, হুশশ করে আকাশে উঠে গেল। ডান হাত তুলে শিবা চারধারে তাকিয়ে মাথা নোয়াল। এইসব আদবকায়দা সে এখানে এসে দেখে শিখেছে। পিঠের তোয়ালেটা সুনীলকে দিয়ে সে রিং—এর ধারে বসা মানুষদের উপর চোখ বোলাতেই দেখতে পেল রোজারিওর ছেলে নীল তার দিকে তাকিয়ে। বড়বড় দুটো চোখে বিস্ময়, সারল্য এবং ভয়ও। চোখাচোখি হতেই নীল হাত নাড়ল। শিবা পারল না। হাত তুলতে গিয়ে তার মনে হল, কে যেন চেপে ধরেছে।
হঠাৎই তার মনে হল এখন তার দরকার ঘৃণা—হেট রোজারিওকে হেট। নয়ত সে লড়তে পারবে না। ভিতর থেকে একটা জোর তাকে চাগিয়ে তুলতে হবেই। হাতটাকে যে শক্তি চেপে ধরেছে, সেটাকে গুঁড়িয়ে দিতে এখন একটা আক্রোশ দরকার। কোথা থেকে সে পাবে। রোজারিওকে সে প্রায় চেনেই না, কিভাবে সে ঘৃণা তৈরি করবে? লোকটাকে যতটুকু দেখেছে মোটামুটি ভালই লেগেছে। শিবা স্যাডো করার জন্য কয়েকবার শরীরটা নাড়িয়ে ঘুসি চালাল আর নিজের উপর রেগে উঠল এই ভেবে—কেন বেলুন কিনে দিতে গেলাম। কেন ওকে নীলু মনে হল। বক্সিং—এ স্নেহ মমতা অচল এটা বুঝতে পারলুম না।
রোজারিও রিং—এ উঠতেই, শিবা লক্ষ করল, নীল একইভাবে হাত নাড়ল। হাসিতে ঝকঝক করে উঠল রোজারিওর মুখ, সেও হাত তুলল। শিবার মনে হল, তার জন্য কেউ নেই! কলকাতা হলে নিশ্চয় ননী থাকত! ননী! ননী! ননী! ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল শিবার মাথার মধ্যে একটা রাগ। এই ননীই বলেছে : ”সাবাস ফাইটার। এবার পাবি সোনার বকলেস।”
হ্যাঁ, সোনার বকলেসই গলায় নেব। স্যাডো করতে করতে শিবা অযথা দুটো কঠিন ঘুসি শূন্যে গেঁথে দিল। এখন ডিসেম্বর, কলকাতায় লোকে সোয়েটার পরছে। কিন্তু সমুদ্রের ধারে এখানে প্যাচ প্যাচে ঘাম। শিবাও ঘামছে উত্তেজনায় আর অন্ধ রাগে। সাগর মামীর কথাটা তার মনে পড়ল।
‘এই কি বড় হবার পথ। এমন পথে ত কুকুরে যায়।’
‘হ্যাঁ আমি কুকুরই। কুকুর, কুকুর।’ শিবা গজরাতে শুরু করল মনে মনে। তোমাদের সবাইকে দেখাব আমি ফাইটার কিনা। সোনার বকলস পরেই যাব তোমাদের কাছে। সেদিন সবাই এসে আমার পা চাটবে।
রেফারি যথারীতি নিয়মকানুন আউড়ে গেল। শিবার কানে কিছুই ঢুকল না। সে তখন মাথা নিচু করে রাগে ফুলে ফুলে উঠছে। রাগ তাদেরই বিরুদ্ধে যারা তার কাছের মানুষ ছিল। যারা দিনরাত কষ্টের মধ্যে আধপেটা খেয়েও তাদের পরিবেশের মধ্যে শিবাকে ধারণ করে রেখেছিল। যারা রক্তের মধ্যে লড়াই করার প্রবল ইচ্ছা জীইয়ে রেখে সেটা প্রবাহিত করে দিয়েছিল শিবার রক্তে, যার জোরে সে রিং—এ উঠে শক্তিমান হয়ে উঠত। সেই রক্তধারার বিরুদ্ধে এখন তার রক্তের মধ্যে চীৎকার উঠছে।
কয়েক মুহূর্ত পরেই শিবা ও রোজারিও মুখোমুখি হল।
প্রথমেই শিবার মনে হল, রোজারিওর মুখে সে তার বাঁ হাত পৌঁছে দিতে পারবে, শুধু সোজা ঘুসিই নয় লেফট হুকও। দ্রুত কয়েকটা স্ট্রেট লেফট দিয়ে রোজারিওর স্পিড পরীক্ষা করে বুঝল দূরপাল্লা থেকে ও দ্রুত ঘুসি পাঠাতে পারে না কিন্তু নড়াচড়ায় দ্রুত। কুকুর যেমন গা থেকে জল ঝেড়ে ফেলে সেইভাবেই ঘুসি ঝেড়ে ফেলতে পারে। তবে শিবার মনে হচ্ছে, তার বাঁ হাত থেকে এড়িয়ে যাবার সাধ্য রোজারিওর কমই। ফার্স্ট রাউন্ডে ফেলে দিতে হলে ওকে বাঁ হাতের পাল্লার মধ্যে কাছে টেনে আনতে হবে কিংবা এগোতে হবে। ফার্স্ট রাউন্ডে ওকে চাই—ই। গোরাবাবুর কাছে সে বড়মুখ করে বলেছে—করব।
