‘বক্সিং বিশ্রী ব্যাপার। দেখলেই কেমন যেন মাথা ঘোরে, খালি ঘুসি মারা, মুখ ফটিয়ে দেওয়া।’
‘আমার কিন্তু বেশ লাগে।’ আর একটি মেয়ে উৎসাহ ভরে চটপট বলল, ‘কবে হবে আপনাদের, দেখতে যাব।’
‘কাল আরম্ভ, ফাইনাল রোববার।’
হঠাৎ মেয়েরা আড়ষ্ট হয়ে ভেলপুরি দোকানের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। কারণ খুঁজতে গিয়ে শিবা দেখল শীর্ণ লম্বা এক মহিলা তার দিকে কটমট চোখ রেখে মেয়েদের দিকে এগোচ্ছে।
‘এত দেরি হচ্ছে কেন তোমাদের, সব সময় সব জায়গায় আড্ডা না দিলেই নয়? গাড়ি কতক্ষণ তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে?’
শিবা পায়ে পায়ে তখন পিছোতে শুরু করে দিয়েছে।
প্রথম লড়াই ছিল দিল্লির অরুণকুমারের সঙ্গে। শিবা অপেক্ষা করছিল ড্রেসিংরুমের বেঞ্চে। এমন সময় পাকাচুলভরা মাথা, ঘাড়ে—গর্দানে, বেঁটে একটি লোক শিবার পিছন থেকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে ‘ইউ আর শিবাজী আইচ?’
শিবা লাফিয়ে উঠেছিল ভয় পেয়ে। লোকটার কণ্ঠ নাকিসুরের। শিবা ঘাড় নাড়তেই বলল, ‘আই অ্যাম বেহরাম মিস্ত্রি।’
নামটা শিবা যেন শুনেছে। প্রিয় হালদার বলেছিল, গোরাবাবুর সঙ্গে এই লোকটা আর এক পাঞ্জাবী মিলে অল ইন্ডিয়া টুর্নামেন্ট করবে।
‘ফার্স্ট রাউন্ডমে নক আউট করো, ইনাম মিলেগা হান্ড্রেড রূপীজ। ইয়ে অরুণকুমার কুছ নেহি। কেয়া সেকেগা?’
শিবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। যন্ত্রের মতো শুধু মাথাটা হেলাল।
‘গোরা টেলেক্স ভেজা, তুম বহুত ফাস্ট ঔর হার্ড হিটার বক্সার। তুমহারা পর উইনকা দর আজ ক্যালকাটামে চার—এক, ফাস্ট রাউন্ড নক আউটকা দর আট—এক। বোম্বাইমে তিন—এক, দিল্লিমেভি তিন—এক।’ মিস্ত্রি ওর কাঁধ চাপড়ে আর একবার বলে, ‘শও রূপেয়া।
ঘরের আর একদিকে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকা অরুণকুমারের দিকে তাকিয়ে শিবা আবার মাথা হেলাল। ব্যাপারটা সে বুঝতে পারছে না। তবু এটুকু সে জেনে গেছে, তাকে ফার্স্ট রাউন্ডে জিততে হবে নক আউট করে যদি একশো টাকা পেতে হয়।
রিং—এ দু—মিনিটের মধ্যেই শিবা একশো টাকা জিতে নিল। অরুণকুমার শুরুতেই এগিয়ে এসে দুটো লেফট জ্যাব ছোঁড়া। শিবা অবহেলায় মুখটা পিছিয়ে নেয়। আবার জ্যাব করতেই শিবার বাঁ হাত পলকে অরুণকুমারের মাথায় এবং সেটা অনুসরণ করে চোয়ালে ডান হাতে সোজা একটা। কাঠের মতো হয়ে গিয়ে ওর হাঁটু দুটো কেঁপে উঠল। টলতে টলতে সে পিছিয়ে গেল আর শিবা এগোতে লাগল। ওর চোখ দেখে শিবা বুঝে গেল, লড়াইয়ের ইচ্ছা শেষ হয়ে গেছে। এবার শুধু খুশিমতো হাত বাড়িয়ে ওকে মারা। কর্নারে নিয়ে গিয়ে শিবা দ্রুত ডান—বাঁ কম্বিনেশন চালাতেই অরুণকুমার পড়ে গেল।
প্রায় হাজার চারেক লোক চীৎকার করে শিবাকে তারিফ জানায়। ফোটোগ্রাফারদের ফ্ল্যাশ মুহুর্মুহু ঝলসে ওঠে। রেফারি যখন অরুণকুমারের উপর এক দুই গুণে যাচ্ছে শিবা তখন চোখ বোলায় দর্শকদের উপর। ব্রেবোর্ন মাঠের একবারে ইস্ট স্ট্যান্ড ঘেঁষে রিং। এত লোক সে আগে দেখে নি। ওদের চীৎকার তার ভাল লাগছে। নক আউটই ওদের ভাল লাগে। যত মারবে ততই ওরা ভালবাসবে। শিবা ভালবাসা চায়। একা নিঃসঙ্গ জীবনকে ভরাবার জন্য এই চীৎকার তার দরকার।
পরদিন দ্বিতীয় লড়াই রেলওয়েজের মার্টিনের সঙ্গে। গত দিনের মতো বেহরাম এসে বলল, ‘আজ ভি শও রূপেয়া। ফার্স্ট রাউন্ডমেই খতম করো।’
শিবা তাই করল। মার্টিন অতি সাবধানী হয়ে অপেক্ষা করছিল শিবার আক্রমণের জন্য। শিবা মুখের সামনে গার্ড না রেখে দু—হাত নামিয়ে, এক মুখ হাসি নিয়ে ওকে পাক দিয়ে ঘুরতে থাকে। দর্শকরা হৈ হৈ করে ওঠে মজা পেয়ে। বিদ্রূপ করে তারা মার্টিনকে কুকুরের ডাক দিতে শুরু করে। তখন মেজাজ খারাপ করে মার্টিন তেড়ে এসে শিবার পাঁজরে বাঁ হাতের ঘুসি চালায়। ডান হাতে ঘুসিটা রুখে দিয়েই শিবার লেফট হুক এবং আপার কাট ঝলসে ওঠে। ক্যানভাসের নীচের তক্তাটা কেঁপে ওঠে মার্টিনের পড়ার ধাক্কায় আর শিবার কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম হয় চীৎকারের শব্দে। আবার ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট।
এই রাতেই শিবা আবার রিং—এ এল সেমি—ফাইনালে সারভিসেসের শ্যামবাহাদুরের সঙ্গে লড়তে। এখনো পর্যন্ত তার গায়ে একটাও ঘুসি লাগে নি। আর এক দিক থেকে উঠেছে রোজারিও আর রবিশেখর। দুটো লড়াই পুরো তিন রাউন্ড পর্যন্ত লড়ে জিততে হয়েছে রোজারিওকে। সকলেই ধরে রেখেছিল ফাইনালে তার সঙ্গে শ্যামবাহাদুরের লড়াই হবে। কিন্তু এখন অন্য গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
শিবা ড্রেসিংরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিল রোজারিওর লড়াই। রবিশেখরকে নাস্তানাবুদ করছে। সুনীলও তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে। প্রথম দিনেই সুনীল এই রবিশেখরের কাছে হেরেছে। সেকেন্ড রাউন্ডে রেফারি লড়াই থামিয়ে দেয়। সুনীলের তখন ভ্রূ কেটে রক্তে মুখ ভেসে যাচ্ছিল। মিস্ত্রি শিবাকে ডান হাতের পাঞ্জা তুলে দূর থেকে দেখাল। শিবা বুঝতে পারল না। সুনীলকে বলল, ‘শুনে আয় ত।’
ফিরে এসে সুনীল বলল, ‘পাঁচশ যদি ফার্স্ট রাউন্ডে নক আউট করতে পারিস।’
শিবা ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট করেছিল। এবং চ্যাম্পিয়নশিপে এই প্রথম সে ঘুসি খেল। শ্যামবাহাদুরের একটা রাইট সুইং, সঙ্গে একটা লেফট হুকও পাঠিয়েছিল। শিবা সাইড—স্টেপ করে বাঁদিকে সরে গিয়েও দেখতে পায় নেপালির মুখের সামনে ডান হাতের গার্ড নামানো। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় চোয়াল লক্ষ্য করে শিবার লেফট হুক বেরিয়ে এল। ডান হাতে মারল বুকে, পাঁজরের মাঝখানে। শ্যামবাহাদুর ঝুঁকে পড়তেই তার মুখে শিবার ডান—বাঁ, ডান—বাঁ এবং আপার কাট ঝড় তুলে দিল। শান্ত এবং ক্লান্তভাবে শ্যামবাহাদুর আস্তে আস্তে উবু হয়ে লুটিয়ে পড়ল ক্যানভাসে।
