‘তোর বড্ড খাই—খাই। অত খেলে আনফিট হয়ে যাবি।’
শিবাকে গুম হয়ে যেতে দেখে সে আবার বলল, ‘বোস না খেলা ত শেষ হয়ে এল। বেঙ্গল আর দুটো উইকেট পেলেই জিতবে।’
‘হ্যাঁরে এদের খেলার পোস্টার দিয়েছে, আমাদের দেয় নি?’
‘কাপড়ে লিখে টাঙিয়েছে স্টেশনের সামনেই, চোখে পড়ে নি তোর?’
‘মেয়েরাও কি বক্সিং করে?’
‘না।’
খেলা শেষ হল। বেঙ্গল জিতেছে ৩২ রানে। সাদা—প্যান্টে পরা মেয়েরা মাঠ থেকে বেরিয়ে প্যাভিলিয়নে গেল। ওরা দু—জন মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগোল চৌপট্টির দিকে ভেলপুরি খাবার জন্য।
জায়গাটায় মেলার মতো ভীড়। আরব সমুদ্রের কোলে হাঁসুলির মতো মালাবার পয়েন্ট থেকে নরিম্যান পয়েন্ট পর্যন্ত অর্ধচন্দ্রাকৃতি উপকূল। চওড়া বেলাভূমি। সেখানে বেড়াতে আসা মানুষ গিজগিজ করছে। দু—পাশে তাকালে প্রকাণ্ড উঁচু বাড়িগুলো বুঝিয়ে দেয় এই শহর স্পর্ধা দেখাতে পারে সুন্দরভাবে। ভেলপুরি, আলুমটর, পিঁয়াজি, আইসক্রীম—যা দেখল শিবা তাই কিনে খেল।
সাবধান করে সুনীল বলল, ‘অত খাস নি ওয়েট বেড়ে যাবে।’
‘ট্রেনিং করে কমিয়ে নেব।’
তারপর শিবা গুটিগুটি জলের দিকে এগিয়ে যায়, সমুদ্রের জলের স্বাদ কেমন পরখ করার ইচ্ছায়। ফিরে আসছে যখন, দূর থেকেই দেখল সুনীল কথা বলছে সেই লোকটির সঙ্গে, যার জামায় লাল—সাদা ফুলের ছাপ, চার ইঞ্চি চওড়া বেল্ট, কব্জির উপর উল্কি, ছিপছিপে লম্বা, যার নাম রোজারিও। সঙ্গে একটি বাচ্চচা ছেলে বছর ছয়—সাত বয়সের আর স্কার্ট—ব্লাউজ পরা এক মহিলা। শিবা মনে মনে কুঁকড়ে ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়ার কথা ভাবল। যার সঙ্গে দু—তিন দিনের মধ্যেই রিং—এ লড়তে হতে পারে, তার সঙ্গে সে কথা বলতে চায় না।
‘এই শিবা।’ সুনীল চীৎকার করে ডাকতেই শিবা ঘুরে দাঁড়াল।
‘এদিকে আয় আলাপ করিয়ে দি।’
শিবা কাছে আসতেই রোজারিও হাত বাড়িয়ে দিল। কুণ্ঠিতভাবে শিবাও হাত বাড়াল।
‘বেরা ওয়াজ জাস্ট টেলিং মী অ্যাবাউট ইউ। হাম তো রিটায়ার করনেওয়ালা বুঢঢা হ্যায়। তুমহারা পাঞ্চ বহত জোরদার হ্যায়, হাম বেরাসে শূনা। তো থোড়া আস্তে সে হামকো হিট করো; হাম মর যায়গা তো মেরা ইয়ে বিবি ঔর বাচ্চচাকো কৌন দেখেগা।’ এই বলে রোজারিও হো হো করে হাসল।
শিবা অপ্রতিভ হয়ে বলল, ‘নেহি নেহি, হামতো আপনার কাছ থেকে শিখেগা।’
‘কেয়া শিখেগা?’
শিবা কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। রোজারিওর মুখের হাসিটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। শান্ত ধীর স্বরে বলল, ‘হাম বহত সাল বক্সিং মে হ্যায়, শূনকে রাখো, নেভার শ্যেক হ্যান্ডস উইথ অ্যান অপোনেন্ট আনটিল ইউ হ্যাভ হুইপড হিম। জিতনে কা আগে অপোনেন্ট কা সাথ কভি হ্যান্ডশ্যেক না করো।’
‘আপ হি তো কিয়া, আপ হি তো হাত পহেলা মিলায়া।’ সুনীল বলল।
‘দেখো, হাম অপোনেন্টকো হেট করতা। উই ফাইট, বাট ডিপ ইন আওয়ার মাইন্ড উই ডু নট রিয়েলি হেট। হাম মনমে হেট বানাতা, ঘৃণা তৈয়ার করতা। মনমে অপোনেন্টকো খারাপি দুষমন বানাকে হাম অ্যাটাক করতা।’
শিবা কথাগুলো বোঝবার চেষ্টা করছিল যখন, তার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো রোজারিওর ছেলেটি তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে এক বেলুনওয়ালার দিকে। শিবা ঝুঁকে বলল, ‘খোকা বেলুন নেবে?’ ছেলেটি লজ্জা পেয়ে তার মায়ের দিকে সরে গেল। শিবা ওর হাত টেনে নিয়ে গেল বেলুনওয়ালার কাছে। দুটো বেলুন কিনে ওর হাতে দিল। খুশিতে ঝকঝক করে উঠল চোখদুটো। হাসিতে ছড়িয়ে পড়ল ঠোঁট।
‘কি নাম তোমার, নাম কেয়া?’
‘নীল….নীল রোজারিও।’ বলেই ছেলেটি ছুটে তার মায়ের কাছে গেল।
নীল! শিবার মনে পড়ল ছোট ভাই নীলুকে। অনেকটা এই বয়সেই মারা গেছে।
‘আচ্ছা, থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য বেলুনস। হামকো আভিতো যানে হোগা। ইয়ে মেরা লাস্ট ন্যাশানালস হ্যায়। ওহি লিয়ে নীল ঔর উসকো মাম্মিকো লে আয়া। পাপ্পা ক্যায়সা ফাইটার হ্যায় নীল আপনে আঁখোসে দেখেগা, উনকো ইয়ে লাস্ট চান্স।’
যাবার আগে ছেলেটি হাত নাড়ল। শিবাও হাত নাড়ল।
‘ছেলেটা বেশ, নারে?’
সুনীল জবাব দিল না।
‘কি বলল বলত হ্যান্ডশেক করা নিয়ে?’ শিবা জিজ্ঞাসা করল।
‘বলল মনে মনে রাগ ঘেন্না তৈরি করে অপোনেন্টকে মারবার জন্য। কিন্তু ওটা বানানো ব্যাপার, আসলে মনের মধ্যে সত্যি সত্যি কাউকে ঘেন্না করে না।’
‘ধ্যেৎ এসব বানিয়ে তবে কিনা লড়তে হবে, জিততে হবে? কেন, এমনি কি জেতা যায় না? যখন হারবার ভয় পেয়ে বসে তখনই এসব করতে হয়।’
শিবা কথাটা শেষ করল, আর তখনি দেখল সাদা প্যান্ট ও শার্ট পরা চারটি মেয়ে ভেলপুরির দোকানের দিকে এগোচ্ছে।
‘ওদের একজনকে আমি চিনি।’
সুনীল অবিশ্বাসভরে তার দিকে তাকাল। তাই দেখে শিবা হাসল। সুনীল বলল, ‘ওরা বেঙ্গল টিমের মেয়ে।’
শিবা এগিয়ে গেল।
‘তুমি ভবানী স্যারের কোচিংয়ে পড়তে না? লালবাগানে জিমন্যাসটিকও করতে।’
মেয়েটি অবাক হয়ে গেল। তারপর চিনতে পারল। শিবার আপাদমস্তক দেখল।
‘হ্যাঁ।’
‘আর পড়তে যাও নি কেন? বলেছিলুম ত গুণ্ডার ভয় নেই।’
কথাটা এড়িয়ে মেয়েটি বলল, ‘আপনি এখানে?’
‘আমাদের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে।
‘কিসের?’
‘বস্কিং—এর ।’
‘অ।’
‘তোমাদেরও তো হচ্ছে। আজ দেখলুম বসে বসে।’
‘আমরা সেমিফাইনালে উঠলাম।’
‘আমাদেরটা দেখবে না? সামনেই ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে হবে।’
