সাধু হাত বাড়াতেই গোরাবাবু ড্রয়ার থেকে নোটের গোছা বার করে তুলে দিল। সাধু সেগুলো গুনল এবং একটিও কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গোরাবাবুর মুখ এবার হাসিতে ভরে উঠতে শুরু করল। শিবা চাবির তোড়া টেবলে রেখে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন তাকে ডেকে হাত থেকে ঘড়িটা খুলে বাড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘ইউ আর এ ভেরি ভেরি গুড বয়।’
শুনে খুশি হয়েছিল। সেই রাতে বহুক্ষণ ঘড়িটা হাতে পরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছিল। বিছানায় শুয়ে হাতটা কানে ঠেকিয়ে টিকটিক আওয়াজ শুনতে শুনতেই তার মনে পড়ে ভবানী স্যারকে। আশ্চর্য, সেদিনও ঠিক এইভাবেই সাধুর কাঁধে হাত রেখে সে বলেছিল, ছেড়ে দাও। গোরাবাবু ‘গুড বয়’ বলায় যতটা ঝলমলে লাগছিল ধীরে ধীরে সেটা মলিন হয়ে গেল। একই ভঙ্গিতে কাঁধে হাত দিয়ে একই কথা সে বলেছে। দু—বারই সে রক্ষা করেছে দুটো লোককে কিন্তু কি যেন একটা তফাত রয়ে যাচ্ছে। দুটো লোকের মধ্যে আকাশ—পাতাল তফাত। সেদিনের মতো নিজেকে তার বিরাট মনে হচ্ছে না। শিবা ঘড়িটা আঁকড়ে ধরে সেই রাতে শুধু ভবানী স্যারের কথাই ভেবেছিল। ইতিমধ্যেই সে জেনে গেছে গোরাবাবুর নানান ধরনের ব্যবসার মধ্যে ট্রেনের ওয়াগন ভেঙে লুট করা মাল কেনা এবং বিক্রি, চোরাচালানী, কালোবাজারী ব্যবসাও আছে।
.
হাত বাড়িয়ে টেবল থেকে ঘড়িটা তুলে শিবা সময় দেখল। সিনেমায় যাবার সময় আর নেই। বিকেলের চা দিয়ে যাবার সময় পার হয়ে গেছে অথচ দেয় নি। বিরক্ত হয়ে সে উঠে বসল। ভিজে গামছায় গা মুছে বাইরে এল।
আকাশের দিকে মুখ তুলে সে তাকাল। আকাশটার ফিকে নীল রঙের উপর হলুদ আলো পড়েছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। গুদামের পিছনেই রেল লাইন। কিছুক্ষণ ধরে একটা ইঞ্জিন মালগাড়ি শান্টিং করে যাচ্ছে। যখন রাতে করে শিবা ঘুমোতে পারে না। স্টিমারের ভোঁ শুনলে তার অস্বস্তি হয়। তখন আরো বেশি করে সে নিঃসঙ্গ বোধ করে।
নিম গাছের নিচু ডাল থেকে লোহার শিকল ঝুলছে, ডগায় একটা আংটা। হেভি পাঞ্চিং ব্যাগটা ওই আংটা থেকে ঝোলে। ব্যাগটা ঘরের মধ্যে এক কোণে পড়ে রয়েছে। প্র্যাকটিস করতে তার ইচ্ছে করে না। গত দু—মাসে দু—তিনবার মাত্র ব্যাগটা ঝুলিয়েছিল। গোটা কুড়ি ঘুসি মেরেই বিরক্ত বোধ করে। তিন মাস সে দৌড়য় নি। গঙ্গার ধার দিয়ে উত্তরে বাগবাজারের খালের মুখ নয়ত দক্ষিণে হাওড়া ব্রিজের তলা পর্যন্ত গিয়ে আবার ছুটে ফিরে আসত। দিন তিনেক আগে স্কিপ করেছিল। অল্পক্ষণেই হাঁফিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়। শ্যাডো প্র্যাকটিশ করতেও আর ভাল লাগে না।
শিবা দু—আঙুলে চিমটের মতো ধরে পেটের মাংস টানল। ঢিলে হয়ে গেছে পেশী। শরীর বেশ ভারী লাগে। সে ঠিক করল ওজন কমাতে হবে, খাওয়াও কমাতে হবে। আটমাস আগে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ফিরে আর শরীরের দিকে নজর দেয় নি, এবার দিতে হবে। আর দু—মাস পরেই কলকাতায় অল ইন্ডিয়া ইনভিটেশন টুর্নামেন্ট। শিবার মুখটা ধীরে ধীরে বিকৃত হাসিতে ভরে উঠল। সে যে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হতে পারে নি, একথাটা তার মনেই থাকে না। মনে করা দরকার, মাঝে মাঝে দরকার।
বোম্বাইয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর আগের দিন সে আর সুনীল বেরা ওজন দেবার জন্য ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে যায়। অন্যান্য রাজ্যের বক্সাররাও এসেছে। সুনীল একজনকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘চিনে রাখ, জব্বলপুরের রোজারিও, এখন ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ন। লড়তে হবে ওর সঙ্গে।’ শিবা দেখল তামাটে ছিপছিপে লম্বা একটা লোক গটগট করে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুধু পিঠটুকু সে দেখতে পেল।
ব্রেবোর্ন থেকে বেরিয়ে চার্চগেট স্টেশনের সামনে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ওরা সময় কাটাচ্ছিল। সুনীল আগে বোম্বাই এসেছে, সে বাড়িগুলো এবং রাস্তা চিনিয়ে দিচ্ছিল শিবাকে।
‘এই যে ইলেকট্রিক ট্রেন এখান থেকে দু—তিন মিনিট অন্তর ছাড়ছে চলে যাচ্ছে সোজা উত্তরে বোম্বাই শহরের মাঝখান দিয়ে বরিভলি। রাতে দু—তিন ঘণ্টা বাদে সারাক্ষণই ট্রেন চলে। এখানকার লোক তাই বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে পারে তাই কাজও বেশিক্ষণ করতে পারে, পয়সাও বেশি কামায়। রাস্তা দেখছিস কত চওড়া আর পরিষ্কার, গাড়িগুলো স্পীডে চলেছে, ট্র্যাফিক জ্যাম নেই।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শিবা বলেছিল, ‘কলকাতার থেকে সভ্য শহর।’
ওরা হাঁটতে যাবে এমন সময় একটা পোস্টার চোখে পড়ল সুনীলের। পড়ে বলল, ‘ক্রিকেট খেলা হচ্ছে মেয়েদের, বেঙ্গল খেলছে রাজস্থানের সঙ্গে। চল দেখে আসি।’
এই খেলাটি শিবা একদমই বোঝে না এবং পছন্দও করে না। সুনীলই তাকে টেনে আনল স্টেশনের পাশের রাস্তা দিয়ে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। দর্শক খুবই কম। সুনীলই টিকিটের পয়সা দিল। গ্যালারিতে শিবা বিরক্ত হয়েই বসেছিল। বেঙ্গল ফিল্ড করছে। একবার বল তাদের দিকে বাউন্ডারি হল এবং যে মেয়েটি বল কুড়োতে ছুটে এল, তাকে দেখেই শিবা চিনল এবং অবাক হল। ভবানী সান্যালের কোচিংয়ের সেই মেয়েটি যে জিমন্যাস্টিকও করে। নামটা জানে না। ও ক্রিকেট খেলছে কেন? তাহলে জিমন্যাস্টিক করা কি ছেড়ে দিয়েছে? শিবা এর পর মন দিয়ে কিছুক্ষণ খেলা দেখে হাই তুলে সুনীলকে বলল, ‘চল চল বিচ্ছিরি লাগছে। কি যে ভাল লাগে তোদের এই ঠুকুস ঠুকুস খেলা। ওঠ খিদে পেয়েছে, ভেলপুরি খাব।’
