‘কিসের বেইমানি করেছি। গুণ্ডা ঠেকাবার দায় আমার নয়। আমি ধর্মঘট করতে বলি নি। ওখানে আমার যাবার কথা নয়। এসব করতে গেলে হাঙ্গামা হবে, এটা বুঝেশুনেই ত ওরা নেমেছে তবে সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপানো কেন? আমারও জীবন আছে, সেটা ত কেউ কোনোদিন দেখে নি? দেখতে আসবেও না। নিজেকেই নিজে দেখতে হবে, বড় হতে হবে। সবাই বড় হতে চায়, সেজন্য যে পথই খোলা পাব সেই পথেই আমি যাব।’
‘মনুষ্যত্ব বলে একটা জিনিস আছে।’ সাগর মামী তীক্ষ্নকণ্ঠে বলল, ‘যারা তোর দাদাকে মারতে এল, তাদের সঙ্গেই তুই চলে গেলি? এই কি বড় হবার পথ। এমন পথে ত কুকুরে যায়।’
রাগে অন্ধ হয়ে শিবা কিছু একটা করার জন্য অবশেষে দরজার পাল্লায় একটা ঘুসি বসাল। পাতলা কাঠের পাল্লাটা ফেটে গেল। পাগলের মতো সে এধার—ওধার তাকাল রাগটা বার করে দেবার উপায় খুঁজতে। দুটি স্ত্রীলোক আর চোট খাওয়া একটি পুরুষ ছাড়া কাছাকাছি আর সবই নিষ্প্রাণ বস্তু।
হাঁফাতে হাঁফাতে শিবা বলল, ‘বেশ আমি কুকুরই। এবার থেকে কুকুরদের সঙ্গেই থাকব।’
আর কোনো কথা বলার বা শোনার জন্য সে অপেক্ষা করে নি। বটকেষ্টর দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় শচীন তাকে ডাকল।
‘ওরে তোর জন্য ননী রেখে গেছে এটা।’
শচীন দোকানের পিছনের তাক থেকে একটা কাগজে মোড়া বস্তু আনল। কাগজটা খুলতেই বেরল তার ট্রফি, মেডেল, সার্টিফিকেট। আর একটা কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা: সাবাস ফাইটার। এবার পাবি সোনার বকলেস।
কাগজটা মুঠোয় পিষে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শিবা তিক্ত স্বরে বলল, ‘আসব, হ্যাঁ সোনার বকলস পরেই আসব। সেদিন সবাই এসে আমার পা চাটবে।’
চার
বিকেলে ঘুম ভাঙার পর বিছানা ছেলে শিবা ওঠে নি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে প্রায় আধঘণ্টা। নিম গাছের কিছু পাতা, আকাশের একটা টুকরো আর গুদাম ঘরের কার্নিশের খানিকটা ছাড়া আর কিছু জানালা দিয়ে দেখা যায় না। ভীমরুলের মতো শব্দ করে টেবিলে ফ্যানটা ঘুরছে তবুও ঘামে সপসপ করছে তার বুক—পিঠ। এইমাত্র সে একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছে?
ফ্যানের হাওয়ায় টেবলের উপর কয়েকটা পত্রিকার পাতা খড়খড় শব্দে ওলটাচ্ছে। ওগুলো ইংরাজি বাংলা ফিল্মের পত্রিকা। শিবা পড়ে না, শুধু ছবি দেখে। পড়ার ব্যাপারে তার অসুবিধা হয়, বিরক্তও লাগে। কথা বলার মতো তার কেউ নেই। কোনো বন্ধুও নেই। অথচ অঢেল তার সময় যখন কাজ থাকে না। কাজ খুবই সামান্য। যে রাতে লরিতে মাল আসে তাকে জেগে থাকতে হয়। গুদামে তোলার সময় হাত লাগাতে হয়। তাছাড়া মাল যখন বাইরে যায় ড্রাইভার সুরজ সিংয়ের সঙ্গে তাকে থাকতে হয়। পথে পুলিশের সঙ্গে যাবতীয় বন্দোবস্তের ব্যাপারটা সুরজই করে।
শিবার কাজ ওর উপর নজর রাখা। প্রিয় হালদার বলেছিল, ”বিশ্বাস করতে নেই কাউকে এসব কারবারে।” তাছাড়া পথে যদি হামলা হয় লরির উপর, তা সামলাবার ভারও শিবার।
হামলা হয়েছিল বেবি ফুড আর বনস্পতির টিন কৃষ্ণনগরে পৌঁছে দিতে যাবার সময়। কল্যাণীর কাছাকাছি লাঠি হাতে একদল ভিজিলেন্স পার্টির ছেলে লরি থামিয়ে বলেছিল, সার্চ করবে। লঙ্কা—হলুদ—ডালের বস্তার আড়ালে অন্য কিছু আছে কিনা দেখবে। বাজারে তখন গুঁড়ো দুধ পাওয়া যাচ্ছিল না। শিবা তাদের সঙ্গে তর্ক করতে করতে আচমকা রড হাতে লাফিয়ে নেমে লরির সামনে দাঁড়ানো দু—জনের উপর চালিয়ে দেয়। এরপর নির্বিঘ্নে মাল পৌঁছে দিয়ে অন্যপথে ওরা ফিরে আসে। গোরাবাবু শুনে খুশি হয়েছিলেন। শান্ত, মৃদু স্বরে বলেছিলেন, ‘লরি থেকে নামার দরকার কী? সামনে আটকে দাঁড়ালে চালিয়ে চলে যাবে।’
তিনি আরো খুশি এবং নিশ্চিত হয়েছিলেন যেদিন শিবার জন্য সাধু থমকে হাত নামিয়ে নেয়। শিবা সেই রাতেই প্রথম এখানে সাধুকে দেখল। লরিতে এসেছিল তামার তার। অন্ধকারে সাধু দেখতে পায় নি শিবাকে। লরি থেকে নেমেই সে একধারে দাঁড়ানো গোরাবাবুর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। শুধু তামাই নয়, ছিল কিছু ইস্পাতের চাদরও। শিবা একাই সব জিনিস গুদামে তুলে দিয়ে দরজায় চারটে তালা এঁটে দেখে গোরাবাবু বা সাধু নেই। সুরজ জানাল, ওরা বাড়ির ভিতরে গেছে। নিয়ম, কাজ হয়ে গেলেই চাবি গোরাবাবুর হাতে জমা দিতে হবে।
একতলায় বৈঠকখানার পিছনের ঘরটায় টেবল—ল্যাম্প জ্বলছিল। গোরাবাবু চেয়ারে বসে। সাধু টেবলের ওধার থেকে ঝুঁকে কথা বলছে চাপা উত্তেজিত স্বরে। সেই সময় শিবা দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়।
‘যা কথা হয়েছিল তাই দিতে হবে। রেট বেড়েছে, খরচ বেড়েছে, আপনাকেও বাড়াতে হবে।’
‘এবারে এই নাও। পরে দেখা যাবে।’
‘আগেরবারও ত এই কথাই বলেছিলেন।’
‘গোলমাল করো না, যা দিচ্ছি নাও। নয়ত—’
‘নয়ত কি! আপনার হাতে মিনিস্টার আছে, এম এল এ আছে, পুলিশ আছে তাই ত?’
‘সাধু বেশি বাড় বেড়ো না, যা দিচ্ছি নাও।’
সাধু হঠাৎ দু—হাত বাড়িয়ে গোরাবাবুর দুটো বাহু ধরে তাকে টেনে তুলল। ফ্যাকাসে হয়ে গেল গোরাবাবুর মুখ।
‘একি একি, গায়ে হাত!’
‘যা কথা হয়েছিল সেই রেট চাই।’
এই বলে সাধু প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকাতে লাগল। ঠিক তখনই তার কাঁধে হাত রাখল শিবা। সাধু তখন মুখ ফিরিয়ে তাকাল।
‘ছেড়ে দাও।’
কিছুক্ষণ শিবার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সাধু আস্তে—আস্তে হাত নামিয়ে ছেড়ে দিল গোরাবাবুকে। চোখ দুটো বিষাক্ত চাহনিতে সরু করে তারপর বলল, ‘আবার তুই, এখানেও। ….তোলা রইল। একদিন শোধ দিতে হবে তোকে।’
