‘ভাল। তোর যা জিনিসপত্তর আছে এখুনি নিয়ে যা।’
শিবা ইতস্তত করে চালাঘরটার দিকে এগোল। দুর্লভ চক্রবর্তী চেয়ারে বসে এক পাঞ্জাবীর সঙ্গে কথা বলছিল। শিবা ঢুকতেই বলল, ‘কি রে, ব্যাপার কি?’ চারদিন ছিলিস কোথায়?
‘একটা ভাল কাজ পেয়ে গেছি।’
‘সে ত চেহারা দেখেই মালুম হচ্ছে।’
দুর্লভ তার চাহনি শিবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বার দুয়েক ওঠানামা করাল। লাল নাইলনের গেঞ্জি ঘিয়ে রঙের টেরিকট বেলবটস ও চপ্পলসমেত শিবা বোকার মতো হেসে মাথা চুলকোতে লাগল।
‘ভালই দিয়েছে। জি এস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক দেখছি খারাপ লোক নন। তা এখানে কি জন্য, এই কদিনের পাওনা টাকাটার জন্য? আজ হবে না দিন কতক পরে আসিস।’
দুর্লভ আবার কথা শুরু করল পাঞ্জাবী লোকটির সঙ্গে। শিবা ঘরের কোণ থেকে তার প্যান্ট, শার্ট, আশ্চর্য ঘটকের দেওয়া গ্লাভসটা নিয়ে বেরিয়ে এল। শ্রীকান্ত দাস বিড়ি ধরিয়ে একটি অল্পবয়সী ছেলেকে বলল, ‘চট করে একটা চা দিতে বলে আয়।’
শিবার মনে পড়ল, শ্রীকান্ত ঠিক এইভাবে পাঁচ—ছদিন আগে তাকেও হুকুম করেছে। ছেলেটা নতুন, বোধ হয় তার জায়গায় বহাল হয়েছে। গ্যারেজের পরিমল শিরিষ কাগজ দিয়ে কি একটা ঘষছে, ফিয়াটের মালিক নিবিষ্ট হয়ে তাই দেখছে। পল্টু গিয়ারবক্সের পিনিয়ন পেট্রল দিয়ে সাফ করায় ব্যস্ত। সন্তাোষের দুটো পা একটা অ্যাম্বাসাডারের তলা থেকে বেরিয়ে।
‘হেভিব্যাগটা পরে নিয়ে যাব।’
‘পরে কেন, এখনি নিয়ে যা। ওই ত পড়ে রয়েছে।’
শিবা তাকিয়ে দেখল ব্যাগের কাপড়টাই শুধু পড়ে আছে, ভিতরে বালি নেই।
‘কে করল।’
‘ননী।’
‘কেন?’
শিবা দ্রুত এগিয়ে ব্যাগটা তুলল। কয়েকটা গর্ত কাপড়ে। সে শ্রীকান্তর দিকে তাকাল।
‘ননী এই স্ক্রু—ডাইভারটা দিয়ে করছে। ওর কাছেই সব শুনলাম।’
‘কি শুনলে?’ হঠাৎ শিবার বুক অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল। এদের ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা যেন কেমন!
‘তুই নিজের দাদাকেও গুণ্ডাদের হাতে ফেলে দিয়ে পালাবি, এটা কেউ ভাবতে পারে নি।’
‘কি হয়েছে! কি হয়েছে দাদার?’
‘হাসপাতালে এখন। তিনটে পাঁজর ভেঙেছে। তোদের পাশের ঘরের শক্তি দাসের মাথা ফেটেছে, ডান হাতটাও গ্যাছে। তুই থাকলে এসব হত না। তুই মালিকের লোকের সঙ্গে চলে গেলি, তারপরই গুণ্ডারা ফিরে এসে মিনিট তিন চারের মধ্যেই যা করার করে দেয়। কেন, তুই এসব জানিস না?’
‘না।’
শিবা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‘আমি জানতুম না গোরাবাবুই মালিক।’
‘তাই নাকি, কিছুই জানতিস না!’ শ্রীকান্তর বিড়িটা নিভে গেছে। আবার ধরাল। ‘ধর্মঘট ভেঙে গেছে, নতুন লোক নিয়ে কারখানাও খুলেছে। ওরা সব বরখাস্ত। এখন মানুষকটা পরিবার নিয়ে কি যে খাবে!’
‘আমি কি করব? আমি কি ধর্মঘট করতে বলেছি?’
‘না বলিস নি। তুই শুধু বলেছিলি, আমি ফাইটার আমি পালাতে জানি না। তারপর শেয়ালের মতো পালালি, এইসব জামাপ্যান্ট পরার লোভে।’
বিড়িটা ফেলে দিয়ে শ্রীকান্ত হাঁক দিল, ‘কিরে পল্টু, সারাটা দুপুর ত কাবার করলি পিনিয়ানকটা—’ বলতে বলতে সে এগিয়ে গেল শিবাকে ফেলে রেখে।
চিড়বিড় করে উঠল শিবার মাথাটা শ্রীকান্তর কথা শুনে।
‘আমি পালিয়েছি একথা কে বলেছে? কে রটিয়েছে?’
শিবা প্রায় চীৎকার করে, দু—হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে শ্রীকান্তর দিকে এগোল। ঘর থেকে দুর্লভ বেরিয়ে এল। হাতে একটা স্প্যানার নিয়ে পরিমল লক্ষ করতে লাগল শিবাকে। দরকার হলেই ছুঁড়বে এমন ভঙ্গিতে একটা পিনিয়ন মুঠোয় ধরে পল্টু তাকিয়ে রইল।
‘সবাই বলেছে, এ তল্লাটের সবাই জানে।’ অবিচলিত স্বরে শ্রীকান্ত বলল, ‘তারা যে মিথ্যা বলে নি, সেটা তোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কাল তোর দাদা হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। তাকে গিয়ে জিগ্যেস কর।’
‘দাদা বলেছে? একথা দাদা বলেছে? বেশ তাই যাচ্ছি।’
শিবা প্রায় ছুটেই বেরল গ্যারেজ থেকে। মাথা নিচু করে হনহনিয়ে সে বাড়ির দিকে রওনা হল। দূর থেকেই সে দেখতে পেল তাদের ঘরের দরজাটা খোলা। সামান্য ইতঃস্তত করে ভিতরে ঢুকে, তক্তপোশে সাদা প্লাস্টারে বুকমোড়া নীতুকে শুয়ে থাকতে দেখে একটু থতিয়ে গেল। ঘরে আর কেউ নেই। নীতু খোলা জানলা দিয়ে বাইরে আনমনা তাকিয়েছিল। শিবার পায়ের শব্দে ঘাড় ফেরাতে গিয়ে যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত করল। শিবার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে অস্ফুটে বলল, ‘আয়, বোস।’
এগিয়ে এসে মুখটা ঝুঁকিয়ে শিবা বলল, ‘এরকম যে কিছু হবে, আমি জানতুম না। সত্যি বলছি দাদা, বিশ্বাস কর, আমি একদম বুঝতে পারি নি।’
নীতুর ঠোঁটদুটো নড়ে উঠল কিছু একটা বলতে চেয়ে। শব্দ হল না। যন্ত্রণায় মুখটা বেঁকে গেল। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মৃদুস্বরে সে বলল, ‘জানি, আমি কিছু মনে করি নি।’
স্বস্তিতে এবং মন থেকে বোঝা নেমে হালকা হওয়ার সুখে শিবার মুখ যখন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ঠিক তখনই দরজার বাইরে চীৎকার শোনা গেল তার মায়ের : ‘বেরো, বেরো! কি কত্তে এসেছিস এ বাড়িতে, মজা দেখতে?’
শিবা তাকিয়ে দেখল তার মায়ের পিছনে শক্তি দাসের বৌ সাগর মামীও। মুখটা থমথমে, চাহনিতে চাপা ঘৃণা। হালকাবোধ করার অনুভবটা শিবার মন থেকে মুহূর্তে অন্তর্হিত হয়ে গনগনে একটা রাগ তাকে এবার গ্রাস করল।
‘দরকার নেই অমন ছেলের। একফোঁটা উবকার কত্তে পারে না, পারে বেইমানি কত্তে।’
