‘ওর পার্টির দেবু নামে একজন আজ আমার দাদাকে চড় মেরেছে। আমি ছিঁড়ে খাব ওকে।’
শিবা হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে উঠল একটু কুঁজো হয়ে। ঘাড়ে রোঁয়া দেখা দিয়েছে। চোখ জ্বলজ্বলে।
প্রিয় হালদার আবার কিছুক্ষণ শিবার দিকে তাকিয়ে থেকে সিগারেটটা দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে বলল, ‘তোমার ওপর সাধুর রাগ আছে, বুঝলে রাগ আছে। থাকারই কথা। তা থাকুক। ওতে তোমার ভয় পাবার কিছু নেই, তুমি গোরাবাবুর আশ্রয়ে এখন। তোমার কোনো অভাব এবার থেকে থাকবে না, বুঝলে, টপ ক্লাসে উঠতে গেলে টপ ভাবে থাকতে হয়। তুমি শুধু এবার নিজের উন্নতির কথাই ভাব। এই এগজিবিসন ফাইটগুলোর জন্য অনেক টাকা ঢালা হবে। এতে ভাল মতো লড়লে ইন্ডিয়া ফেমাস হয়ে যাবে।’ প্রিয় হালদার মুখটা শিবার দিকে এগিয়ে গাঢ় রহস্যময় স্বরে বলল, ‘এত কষ্ট করে ঘুসি খাবে কেন, কি জন্য? কিছু ত তার বদলে পাওয়াও চাই, কেমন কিনা? পাবে পাবে, টাকা একটা মস্ত জিনিস, তাই দিয়ে সুখ, আরাম কেনা যায়। তুমি কি এসব চাও না?
শিবা যন্ত্রের মতো মাথা হেলাল।
‘ঠিক আছে, চলো এবার পঞ্চাননকে চিনিয়ে দিই।’
পাথর বাঁধানো সরু পথ ধরে ওরা পিছনের ছোট একটা দরজা দিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকল। সামনেই রান্নাঘর।
‘পঞ্চানন….পঞ্চা….।’
প্রিয় হালদার হাঁক দিতেই বেঁটে, কালো, হাঁটু পর্যন্ত তোলা ধুতি, একটি লোক ব্যস্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।
‘একে দেখে নাও, শিবাজীবাবু এর নাম! এখানে থাকবে আজ থেকে, খাবেও।’
হাত জোড় করে পঞ্চানন বিনীত নমস্কার জানাতেই শিবা তটস্থ হয়ে কুঁকড়ে গেল। জীবনে এই প্রথম সে নমস্কার পেল।
‘বাবু কি এখন ভাত খাবেন?’
‘বাবু’ সম্বোধন পাওয়াও শিবার জীবনে প্রথম। শুনতে তার ভালই লাগল। বেশ ভাল লাগল। নিজেকে সে চা—এর দোকানের বা গ্যারেজের শিবার থেকে আলাদা, অন্য এক মানুষ হিসাবে দেখতে পেল। তার মনে হল, দুটো পায়ে ভর দিয়ে এখন সে দাঁড়িয়ে, একটা কিছু অর্জন করেছে যা ট্রফি জেতার থেকে আলাদা। কিছু পেতে পারে, পাওয়া উচিত, পাওনা হয়েছে—এমন এক ধারণা এই প্রথম তার মনের মধ্যে উঁকি দিল। নমস্কার এবং বাবু শব্দটিকে সে ভালবাসল। মান চাই। ভাল পোশাক, খাদ্য আর আবাস তার দরকার। গোমস কি একেই খোয়াব বলেছিল?
খেতে বসে যখন একটি ঝি তার সামনে থালা রেখে গেল, শিবার নিশ্বাস তখন আটকে এল এত ভাতের দিকে তাকিয়ে। এত! জীবনে সে এত ভাত একসঙ্গে পায় নি। ধবধবে যুঁই ফুলের একটি স্তূপ। আলতো হাত বোলাল ভাতের উপর। ভাঙতে মায়া হচ্ছে। ভাতের পাশে চাকা চাকা আলু ভাজা, শাক, পটল—কুমড়োর তরকারি। পঞ্চাননের সহকারী ডালের ডেকচি নিয়ে অপেক্ষমাণ।
প্রথম গ্রাসটি মুখে দিয়েই শিবার শরীর চিনচিন করে উঠল। মনে পড়ে যাচ্ছে রঞ্জুর কথা। তখন সে ভাবত, এইভাবে দালানে বসে রঞ্জু মুখে দিচ্ছে তার মায়ের রান্না, দারুণ রান্না, অদ্ভুত স্বাদ। সে মনে মনে ভাবত রঞ্জু চোখ বুজে চিবোচ্ছে আর মাথা নাড়ছে তৃপ্তিতে। আর আজ সে নিজে খেতে বসেছে ওই রকম একটা বড় বাড়ির দালানে। ওই রকম একটা রান্না ঘরের সামনে বাবু হয়ে বসে।
‘বাবু ডাল দেব আর?’
‘দাও। আর কি আছে?’
‘রুই মাছের ঝোল, পেঁপের চাটনি। দুধ খাবেন কি?’
‘হ্যাঁ খাব।’
খাওয়ার পরে এসে শিবা দেখে একটি চাকর বিছানা পাতছে গম্ভীর মুখে। ঠিক এই রকমই গোঁফওয়ালা টাক মাথা একজন বটকেষ্টর দোকানে একদিন তাকে খিঁচিয়েছিল চা—এ পিঁপড়ে ভাসছিল বলে। শিবা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘অ্যায় খাবার জল নিয়ায়।’
লোকটা শুনেও শুনল না। শিবা অপ্রতিভ বোধ করল। নিজের অল্পদামি, ময়লা প্যান্ট শার্ট, চটি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভাবল, এগুলো ছাড়তে হবে। গ্যারেজের শিবার পরিচয়ের ছাপ এতে লেগে আছে। চাকরটার চোখে তা ধরা পড়ছে।
‘জল বাইরের টিউকলে। ওবেলা কুঁজো দিয়ে যাব।’ বলেই লোকটি বেরিয়ে গেল।
শিবা চুলে হাত বোলাল। চিরুনী আর আয়না চাই। গায়ে ঘেমো গন্ধ বেরোচ্ছে। চান করা দরকার। সাবান আর গামছা চাই। পকেটে হাত দিতেই গোরাবাবুর দেওয়া একশো টাকা নোটটার ছোঁয়া পেল। বিছানায় চীৎ হয়ে শুয়ে সে ভাবল, প্যান্ট শার্ট জুতোও চাই, সেজন্য টাকাও চাই।
পাশ ফিরেই ‘আহহ’ বলে আরামে কাতরে উঠল। এত নরম কোনো জিনিসের উপর সে মাথা আর শরীর রাখে নি। এত পেট ভরেও জীবনে সে খায় নি। কান্তি যেমন বিরাট ঘেরের বেলবটম পরে তেমনি একটা প্যান্ট আর লাল নাইলন গেঞ্জি কেনার কথা ভাবতে ভাবতে সে গভীর ঘুমের মধ্যে ডুবে গেল।
.
চারদিন পর বিকেলে শিবা বাস থেকে নামল দেবদাস পাঠক রোডের মোড়ে।
স্ট্যান্ডে দুটিমাত্র রিক্সা। ননী নেই। শিবা গ্রেট বেঙ্গলের দিকে এগোল। দূর থেকেই সে দেখতে পেল শ্রীকান্ত দাসের হাতে একটি ডিস্ট্রিবিউটার ক্যাপ। তারপাশে একটি ফিয়াট এবং ধুতি—পাঞ্জাবি—পরা একটি লোক সম্ভবত মোটরের মালিক ক্যাপটা তুলে ধরে সে লোকটিকে কি বোঝাচ্ছে। শিবা গ্যারেজে ঢুকল ধীর পায়ে।
শ্রীকান্তের চোখ তার উপর পড়তেই ভ্রূ কোঁচকাল। শিবাকে উপেক্ষা করে সে মোটরের দিকে ঝুঁকে ক্যাপটা লাগাতে শুরু করল। মিনিট তিনেক পর শ্রীকান্ত সিধে হয়ে গম্ভীরস্বরে বলল, ‘এখানে কি মনে করে?’
শিবা অবাক হয়ে গেল কথাটা শুনে। দ্বিধাভরে সে বলল, ‘একটা কাজ পেয়েছি—।’
