শক্তি ফিসফিস করে কাকে বলল, ‘লোকটা মনে হচ্ছে যেন প্রিয় হালদার। মালিকের সঙ্গে সঙ্গে থাকে।’
প্রিয় হালদারই প্রৌঢ়ের নাম। সে ওদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে শিবাকে ডাকল। শিবা এগিয়ে গেল। তখনো চেনটা তার হাতে।
‘তুমি এখানে কি করছ শিবাজী? গুণ্ডাদের সঙ্গে মারপিট? লোকে শুনলে বলবে কি! কালই যে বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সে কিনা মাস্তানী করছে?’
‘মাস্তানী আমি করি নি। মাস্তানদের ঠাণ্ডা করছিলুম। ওরা এসেছিল এইসব লোকেদের মারতে।’
‘তাই বুঝি? ওদিকে গোরাবাবু ত তোমার জন্য ভেবে অস্থির। চলো চলো একবার দেখা করে আসবে চলো, উনি গাড়িতে বসে আছেন। সকালে এদিকেই আমরা এসেছিলুম। হঠাৎ খবর এল তোমায় নাকি গুণ্ডারা ধরেছে। পুলিশে খবর দিয়েই উনি চলে এসেছেন। চলো চলো, তাছাড়া চাকরি তুমি করবে কিনা সেটাও উনি জানতে চান। কালই বোম্বাই রওনা হচ্ছেন।’
প্রিয় হালদার কথা বলতে বলতে শিবার কাঁধ ধরে প্রায় টানতে টানতেই ওকে নিয়ে এগল।
‘একি তোমার কনুইয়ে কালসিটে! ইনজুরি হলে যে চিরকালের মতো বক্সিংই খতম হয়ে যাবে, এটা বোঝ না?’
দু—একবার শিবা মুখ ফিরিয়ে পিছনে তাকিয়েছিল। তারপর হাত তুলে নীতু এবং শক্তিদের ইসারায় জানাল, সে এখুনি আসছে। ওরা কঠিন মুখে তখন ওর দিকে তাকিয়ে।
কিন্তু শিবা আর আসে নি।
.
মোটরে অপেক্ষা করছিলেন গোরাচাঁদ সেন অর্থাৎ গোরাবাবু। প্রিয় হালদার প্রায় ঠেলেই শিবাকে গাড়িতে তোলে। গোরাবাবু মিষ্টি হেসে উদ্বিগ্নস্বরে বলেন, ‘যাক খুব রক্ষে পেয়েছ।’ এই বলে তিনি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মাথাটা হেলান। গাড়িটা তখনই স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করে। শিবা পলকের জন্য দেখতে পায় দূরে গাছতলায় দাঁড়িয়ে সাধু সিগারেট খাচ্ছে।
ওরা সোজা এসে হাজির হয় আহিরীটোলায়, গঙ্গার কাছাকাছি গোরাবাবুর বাড়িতে। বিরাট সেকেলে বাড়ি। পিছন দিকে পাঁচিলঘেরা কিছুটা জমি, তার একদিকে বড় বড় কাঠের দরজাওলা গুদামঘর। একটা খালি লরি দাঁড়িয়ে। পাঁচিলের একপ্রান্তে দরজা, তারপাশে ছোট ছোট কয়েকটা ঘর। তারই একটায় শিবাকে থাকতে দেওয়া হল।
গাড়িতে ওরা বিশেষ কথা বলে নি। শুধু শিবা একবার জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কোথায় যাচ্ছি।’ প্রিয় হালদার জবাব দেয় ‘গোরাবাবুর বাড়িতে। ওখানেই থাকবে।’ গাড়ি পৌঁছতেই গোরাবাবু নেমে, সাদা মার্বেলের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাড়ির মধ্যে চলে যান। প্রিয় হালদার পাশের সরু গলি দিয়ে শিবাকে বাড়ির পিছনে এই ঘরটায় আনে।
‘এখানে থাকবে। বিছানা—বালিশ সবই আছে। খাওয়ার ব্যবস্থাটা বাড়ির মধ্যে। রাঁধুনি পঞ্চাননই বলে দেবে কখন ভাত কখন জলখাবার পাওয়া যাবে।’
‘আমি এখানে কি করব?’ শিবা অস্বস্তিভরে জিজ্ঞাসা করেছিল।
‘তোমার একটা কাজ, এই গুদামে মাল যখন আসবে আর বাইরে যাবে তখন নজর রাখা। খুব দামি দামি জিনিস এখানে আছে। চুরিটুরি হতে পারে ত। তাছাড়া মাঝে মাঝে লরিতে মালের সঙ্গেও যেতে হতে পারে, ডেলিভারি দিতে বা নিতে। কিন্তু এসবের থেকেও আর একটা বড় ব্যাপার আছে।’
প্রিয় হালদার সিগারেট ধরিয়ে তক্তপোশটায় বসে শিবাকেও বসতে ইসারা করল।
একটা অল ইন্ডিয়া বক্সিং টুর্নামেন্ট হবার কথা চলছে। ঠিক টুর্নামেন্ট নয়, এগজিবিসন ফাইটই বলা উচিত। ইন্ডিয়ার সেরা কজন থাকবে, বার্মা, সিলোন, তাইল্যান্ড থেকেও বক্সার আসবে। ফাইটগুলো হবে বড় বড় শহরে। অনেক টাকার ব্যাপার। বোম্বাইয়ের বেহরাম মিস্ত্রি, পাঞ্জাবের আজাইব সিং আর গোরাবাবু, এই তিনজনেই টাকা ঢালছে। তোমার লড়াই দেখে গোরাবাবু এত ইমপ্রেসড যে, ঠিক করেছেন এই এগজিবিসনগুলোয় তোমায় নামাবেন। বেঙ্গলের আরো দু—একটা ছেলের দিকেও অবশ্য ওর নজর আছে। তা আমিই ওকে বললাম, শিবাজী ছেলেটা যা লড়ছে ওর জন্যই লোকে দেখতে আসবে। তোমার দুটো নক আউটের পর ফাইনালে হেভি বেটিং হয়েছিল, চার একের দর ছিল ফার্স্ট রাউন্ড নক আউটের উপর। যাকগে এসব কথা, এবার থেকে তুমি এখানেই থাকবে।’
‘আমার কোনো জামাকাপড় নেই। গ্যারেজে আমার মাল রয়ে গেছে।’
‘কি মাল?’
‘গ্লাভস, হেভি ব্যাগ, স্কিপিং দড়ি, কেডস, তোয়ালে, একটা প্যান্ট, একটা—’
প্রিয় হালদার হাত তুলে থামতে ইসারা করল।
‘ওর কোনোটার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। দু—দিনের মধ্যে সব এখানেই পেয়ে যাবে। শোনো শিবাজী তোমাকে এবার বড় হবার কথা ভাবতে হবে। তারজন্য খাওয়া চাই, বিশ্রাম চাই, ট্রেনিং চাই। তুমি কি এগুলো পাবে এখন যে জীবনে আছ? কত টাকা মাইনে পাও, য়্যাঁ কত পাও? জানি জানি সবই জানি। হাড়ভাঙা কাজ করতে হয়, বিশ্রাম পাও না, রাতে থাক ওই মোটর গ্যারেজেই। রুটি, ছোলা খেয়েই কাটাও, পাও পঁয়তাল্লিশ।’
‘আপনি জানলেন কি করে?’
প্রিয় হালাদার রহস্যময় হাসি তৃপ্তি সহকারে হাসল।
‘বললুম ত, সব খবর নিয়ে তবেই না গোরাবাবু তোমাকে চ্যুজ করেছেন।
‘সাধু বলেছে।’
‘চেনো নাকি ওকে?’
‘ও আমাকে চেনে, আমি ওকে চিনি না।’
‘বটে। তুমি বুঝলে কি করে যে সাধুই বলেছে?’
‘গোরাবাবুর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি কাল। আজও ওকে দেখেছি মোটর থেকে। ও আমাদের ওদিকেই থাকে।’
প্রিয় হালদার একটু গম্ভীর হয়ে গেল। কিছুক্ষণ শিবার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘সাধু লোকটা খুব ভাল নয়। বুঝলে। জানি তুমি ওর চোয়াল ভেঙেছিলে, গোরাবাবুর কাছে সে খবরও আছে। আসলে ওনার একটা ব্যবসা আছে তাতে সাধুর হেল্প দরকার হয়। সেইজন্যই তুমি ওদের একসঙ্গে দেখে থাকবে, নয়তো গোরাবাবু ওকে দু—চক্ষে দেখতে পারে না। তুমিই বল, সাধুকে তুমি কি টলারেট করবে? গুণ্ডা, বদমাস, ওয়াগান ব্রেকার, সমাজের শত্রু ওই লোকটা।’
