‘ওকে নিয়ে চল না শক্তিদা। এ রকম দু—একজন দরকার হবে।’ চাপাস্বরে একজন বলল।
শক্তি মুহূর্তের জন্য ভাবল।
‘শিবা, তুই বোধ হয় জানিস না আজ এগারো দিন আমাদের কারখানায় ধর্মঘট চলছে। এই এগারো দিন নীতু কারখানার গেটেই পড়ে আছে আরো অনেকের সঙ্গে। ধর্মঘট ভাঙার জন্য মালিক সবরকম চেষ্টাই করেছে। এবার গুণ্ডা লাগিয়েছে। কাল রাতে কয়েকটা ছেলে এসে শাসিয়ে গেছে ছোরা দেখিয়ে। আজও আসবে। আমাদের দিকে যদি দু—একজন তাগড়াই কেউ থাকে তাহলে ভাল হয়…মানে আমাদের মনোবল তাহলে বাড়বে। আসলে মারপিট ত আমরা জানি না, পারবোও না। সেই গুণ্ডা লীডারের চোয়াল ভেঙে দেওয়ার পর তোর নাম অনেকেই জেনে গেছে। তুই যাবি? তাহলে অনেকটা ভরসা পাওয়া যাবে।’
‘ওদের গুণ্ডারাও চট করে ঝামেলা করতে সাহস পাবে না।’ শক্তির এক সঙ্গী বলল।
‘তোর যদি অসুবিধে থাকে তাহলে—’
‘না না অসুবিধে কি আর। আজ আমি ঠিক করেছি ছুটিই নেব।’
‘তোর ভয়ের কিছু নেই। যদি তেমন মারাত্মক কিছু হতে পারে দেখিস তাহলে তুই, চলে আসিস।’
শোনামাত্রই এক ঝলক রক্ত শিবার মাথায় উঠে এল। ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল তার সর্বাঙ্গ।
‘শক্তিমামা আমি ভীতু নই। আমি ফাইটার—পালাতে জানি না। চল তোমাদের সঙ্গে যাব।’
মিনিট পনেরো পর, পীচের রাস্তা থেকে ওরা কাঁচা রাস্তায় নামল। লরি চলাচলে রাস্তার দুই কিনারা বরাবর গর্ত। দু—ধারে গাছ, ঝোপ, কাঁচা বাড়ি। একটা চালায় চা—সিগারেটের দোকান, ভাঙা ইটের পাঁজা জরাজীর্ণ শিবমন্দির পার হয়ে একটা মোড় ঘুরেই কারখানার পাঁচিল। গ্যারেজের মতোই এর গেটটা করোগেট টিনের। লরি ঢোকার মতো চওড়া। তার পাশে বাঁশের কাঠামোয় খাড়া করা অস্থায়ী চটের চালা, তাতে ঝুলছে লাল সালুতে সাদা অক্ষরে লেখা: ”জি এস ইঞ্জিনিয়ারিং শ্রমিক ইউনিয়ন”, পাঁচিলের গায়ে হাতে লেখা কয়েকটি পোস্টার সাঁটা।
শিবারা মোড় ঘুরে দূর থেকেই দেখল একটা গোলমালের মতো কিছু ঘটছে।
তিনটি লোক চিৎকার করে গালাগাল দিয়ে চলেছে। একজনের হাতে সাইকেলের চেন। সেটা সে ঘোরাচ্ছে। শিবা দেখল, তার দাদা এবং আরো জনা ছয়েক জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। দু—হাত বাড়িয়ে নীতু কিছু একটা বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। একজন এগিয়ে এসে তাকে চড় মারল।
তাই দেখেই বিকট চিৎকার করে শিবা ছুটল ওদের দিকে। তিনজনই ঘুরে দাঁড়াল।
‘শিবা এগস না।’ নীতু চেঁচিয়ে উঠল।
ততক্ষণে শিবা এসে পড়েছে। চেনটা বাতাসে চাবুকের মতো ঝলসে উঠে ওর বাহুর উপর পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে একজনের হাতে ছুরি বেরিয়ে এল। কিন্তু শিবা খ্যাপামোষের মতো এগিয়ে আসছে লোহার চাবুকের মার অগ্রাহ্য করে। গুণ্ডা তিনজন পিছিয়ে গেল কয়েক পা। দু—হাত মুঠো করে বাড়িয়ে শিবা কুঁজো হয়ে ওদের পাক দিয়ে ঘুরতে শুরু করল।
চেন ধরা হাতটা উঠল। মাথার উপর বনবন ঘোরাচ্ছে। সুযোগ খুঁজছে সপাৎ করে বসাবার জন্য। লোহার চেন মাথায় বা হাড়ের উপর সজোরে পড়লে ফাটিয়ে দেবে। শিবার যেন চেনাচেনা লাগছে মুখ তিনটি। সাধুর দলের ওরা। ওই লম্বাটে মুখ, বড় জুলফি—ওই বড় দাঁত, দাড়ি, এরাই ত ঘনশ্যামের রিকশার চাকা খুলে নিয়ে গেছল। ওই মাঝের জন ছোরাটাকে সামনে বাড়িয়ে এধার—ওধার তাকাচ্ছে আর চিৎকার করছে—’এইবার, এইবার তোকে পেয়েছি রে, আজ তোর জান লেবো। কে বাঁচায় তোকে আজ দেখব।’ এটাই ত সেই দেবু! শিবা এতক্ষণে চিনতে পেরেছে।
‘হিসস।’
চেনটা শিবার চুল ছুঁয়ে পাখার ব্লেডের মতো ঘুরে গেল। বসে না পড়লে তার কানে এসে লাগত।
‘শিবা তুই চলে যা।’ নীতু চেঁচিয়ে বলল।
‘আমি ফাইটার, আমি পালাতে জানি না।’
‘হিসস।’
লোহার চেনটা এবার নেমে এল শিবার ডান পাঁজর লক্ষ্য করে। বিদ্যুৎ গতিতে শিবা বাঁ হাত বাড়াল। চেনটা কনুই স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই সে মুঠোয় জড়িয়ে নিয়ে হ্যাঁচকা টান দিল। লোকটার মুঠোয়ও চেনটা জড়ানো, তাই টান লাগতেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। একটা ভয়ঙ্কর রাইট হুক দিয়ে শিবা তাকে সিধে করে দিল।
‘বাপস।’
মুখে হাত দিয়ে সে টলতে টলতে পিছিয়ে গেল।
চেনটা এখন শিবার হাতে। ঘোরাতে ঘোরাতে সে এগল। ওরা তিনজনই বিপদ বুঝে পিছোচ্ছে। পিছনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ওরা চোখাচোখি করল। চেনওয়ালার ঠোঁট ফেটে কষ বেয়ে রক্ত পড়ছে। থুথু ফেলল। রক্তের সঙ্গে একটা দাঁতও পড়ল। দূরে দু—তিনজন পথচারী দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে। শক্তির হাতে শিবার ট্রফি, মেডেল আর সার্টিফিকেট। তার পাশে নীতু এবং বাকিরা। তাদের সকলের চোখ বিস্ময়ে, ভয়ে বিস্ফারিত। শিবার সাহায্যের জন্য যে এগিয়ে আসবে সেই বোধটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
‘প্রত্যেকটার দাঁত খুলে নেব। দেবু এইবার দেখব তোমার ছোরার কত ধার। মনে আছে সেদিনের ঘুসির কথা।’
শিবা চেনটাকে বাতাসে ক্রস চিহ্নের মতো ঘোরাচ্ছে আর এগচ্ছে। ওরাও পিছোচ্ছে।
‘মনে আছে সেদিনের কথা। আজ কিন্তু আমার পাঞ্চে আরো বেশি জোর। যে হাতে তুমি চড় মেরেছ ওই হাত আমি ভাঙব।’
ঠিক এই সময়ই দূর থেকে একটি লোক হাত নেড়ে ইশারা করতেই দেবু এবং তার দুই সঙ্গী পিছন ফিরেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল এবং মোড় ঘুরে অদৃশ্য হল। সকলে তাকিয়ে রইল ওদের পালানোর দিকে।
লোকটি এগিয়ে আসছে। শিবা চিনতে পারল। কাল এই লোকটিই তাকে ডেকে নিয়ে গেছল গোরাবাবুর সঙ্গে কথা বলাতে।
