মিনিট পাঁচেক পর, যখন লাইট—ওয়েল্টার ফাইনাল চলছে, এক শীর্ণকায় প্রৌঢ় শিবার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলবেন গোরাবাবু, একবার বাইরে আসবে?’
‘কে গোরাবাবু!’ শিবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল!
‘উনি খেলাধুলোর একজন বড় পেট্রন। অনেক ক্লাব ওর টাকায় বেঁচে আছে। তোমার লড়াই ওর ভাল লেগেছে, তাই একটু কথা বলবেন।’ একটু থেমে লোকটি যোগ করল, ‘মস্ত ব্যবসায়ী কারখানা আছে দু—তিনটে।’
খালি গায়ে তোয়ালেটা জড়িয়ে শিবা বেরিয়ে এসে যাকে দেখল, তাকেই সে দেখেছে পিছনে মুখ ফিরিয়ে সাধুর সঙ্গে কথা বলতে। ফর্সা রং ধুতি—পাঞ্জাবি, সোনার ফ্রেমের চশমা, মাথার সামনের দিকের চুল পাতলা।
‘বেশ লড়েছ।’ গোরাবাবু মিহিস্বরে, মৃদু ধীর ভঙ্গিতে বললেন এবং শিবার পিঠে চাপড় দিলেন। ‘কোথায় থাক, কি কর।’
‘বনহুগলির কাছে থাকি। মোটর সারাইয়ের গ্যারেজে কাজ করি, থাকিও সেখানে।’
‘কে আছে তোমার?’
‘কেউ নেই।’ বলেই শিবার মনে হল, একথা কেন বললাম? মা, দাদা, এরা ত আছে! তাহলে হঠাৎ মুখ দিয়ে কেন বেরিয়ে এল ‘কেউ নেই।’
‘পড়াশুনো কতদূর করেছ?’
‘ক্লাস সেভেন পর্যন্ত।’
‘কাজ করবে? না না, তোমার বক্সিং—এর ক্ষতি হয় এমন কিছু কাজ নয়। আমার বাড়িতেই থাকবে। খাওয়াও আমার, মাইনেও দেব।’
শিবা ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঢোঁক গিলে বলল, ‘কি কাজ?’
‘সামান্যই কাজ। তুমি এসো না আমার বাড়ি তখন বলব আর এই নাও।’
গোরাবাবু একটি একশো টাকার নোট এগিয়ে ধরলেন ‘আজকের নক আউটের পুরস্কার। ধরো।’
মন্ত্রমুগ্ধের মতো শিবা হাত বাড়িয়ে নোটটা নিল। গোরাবাবু নাম ঠিকানা লেখা কার্ডটা দিলেন। যাবার সময় আবার বললেন ‘খুব খাটুনির কাজ নয়। গ্যারেজে আর কতদিন বাস করবে। এবার ভাল খাওয়া—দাওয়া, থাকা তোমার দরকার।’
কথাটা রাত্রেও তার মনের মধ্যে দপদপ করে উঠল রাস্তার সিগন্যাল আলোর মতো। চিরকাল কি সে মোটর গাড়ির মধ্যে রাত কাটাবে? দুপুরের দিকে একবার একটুখানির জন্য তার ঘুম পায় সকালে দৌড়ের পরিশ্রমের মাশুল দিতে। কিন্তু ঘুমোতে পারে না, ঘুমোবার জায়গা নেই। বিছানায় শুতে কেমন লাগে তা সে জানেই না প্রায়। বাড়িতে ময়লা ছেঁড়া কাঁথায় শুত। তোষকে কখনো শোয় নি। চীৎ হয়ে তারা—ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিবার মনে হল এই একটা সুযোগ এসেছে জীবনটাকে বদলে নেবার। এটা তার ছাড়া উচিত হবে না। তাকে উঠতে হবে, অনেক উপরে উঠতে হবে। গোমস বলেছিল খোয়াব দেখতে হবে। এবার সে খোয়াব দেখবে আর সেজন্য যে সুযোগই পাবে কাজে লাগাবে। দোনামনা করলে চলবে না। দু—বেলা নিশ্চিন্তে খাওয়ার ভাবনা থেকে আগে রেহাই চাই।
একশো টাকার নোটটা পকেট থেকে বার করে সে অন্ধকারে চোখের সামনে ধরল। ননীর সঙ্গে ফেরার সময় সে বলেছিল ‘বুঝলি ননী, একটা ফিস্টি করা যাবে। যারা যারা চাঁদা দিয়ে আমায় সাহায্য করেছে তাদের সবাইকে পেটপুরে খাওয়াব।’ কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজের প্রতি বিরক্ত হল। কি দরকার ছিল কথাটা বলার? টাকাটা ত তার নিজের জন্য দরকার। ভাল প্যান্ট, শার্ট, জুতো কিনতে হবে। নানান জায়গায় টুর্নামেন্ট যেতে হবে, নানান দেশের লোকের সঙ্গে মেলামেশা করতে হবে। এবার ন্যাশনাল বোম্বাইয়ে। তার ভাল পোশাক চাই। কি দরকার ছিল ফিস্টি দেবার কথাটা বলার! না, এই টাকা খরচ করব না।
সিদ্ধান্তে পৌঁছে শিবা পাশ ফিরে ঘুমোবার উদ্যোগ করল এবং ঘুম যখন ক্রমশ তার দু—চোখের পাতা জুড়ে নেমে আসছে, সারাদিনের উত্তেজনায় ছিলে—টানা ধনুকের মতো টানটান স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে আসছে তখন কতকগুলো আবছা মূর্তি তার চোখে ভেসে উঠতে লাগল। সে দেখল ভবানী স্যারকে: ‘আমি নুইব না নুইব না।’ সাধুর দু—হাতের পেশীগুলো দপদপ করে ফুলে উঠছে। রাধেশ্যামের ছেঁড়া জামার ফাঁকে জিরজিরে বুক : ‘শিবা ভগমান তোর রূপ লইয়্যা দেখা দিছেরে।’ গোমস বলছে: ‘ইউ আর এ বিগ বয়।’ দাদা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল: ‘তোর রোজগারই তখন কিন্তু সম্বল হবে।…এবার ধর্মঘট হয়তো হবে কোনো এক সময়। তখন আমার রোজগার থাকবে না, তোকেই—’ ননী হাসছে: ‘…এই এরাই চাঁদা দিল। আমাদের জন্য একজন ফাইটার দরকার তাই দিল।’ ‘বাবুদের বাড়ির দালানে রঞ্জু বসে ভাত খাচ্ছে। তারিয়ে তারিয়ে চিবোচ্ছে। চিতায় শুয়ে দুটো ভাই চোখ মেলে তাকিয়ে তার দিকে। হঠাৎ ফিসফিস হল তার বুকের মধ্যে।
‘শিবা হাত বাড়া।’
ঘুমের মধ্যে শিবা ছটফটিয়ে উঠে এপাশ—ওপাশ করতে লাগল।
.
চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি, সার্টিফিকেট আর ‘বেস্ট বক্সার’ মেডেলটা কোথায় রাখবে? বাড়িতে ছাড়া শিবার আর জায়গা নেই। ভোরবেলাতেই সে ওগুলো নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। মাঝখানে শক্তি দাসের সঙ্গে দেখা। সঙ্গে তিনজন লোক। ব্যস্ত হয়ে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে। শিবাকে দেখেই সে থমকে দাঁড়াল।
‘কাল রাতে তোর জন্য তোর মামী বসেছিল। আমরা ভাবলুম তুই আসবি, কি পেলি—টেলি দেখাবি। ঘুসোঘুসির ব্যাপার কিছুই বুঝি না, তবে কাপ মেডেল পেলে আনন্দ হয়।’
‘না, মানে, কাল এতরাত হয়ে গেল ফিরতে—’ শিবা লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে লাগল।
‘এইসব পেয়েছিস বুঝি।’ শক্তি ট্রফিটি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে পাশের লোকটিকে বলল, ‘আমাদের নীতুর ভাই গো। দারুণ জোর ঘুসিতে। বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন। এক এক ঘুসিতেই কাত করে দেয়।’
