রাতে ফিরে এসে শিবা মোটরের চালে চীৎ হয়ে অনেকক্ষণ ভাবে গোমসের কথাগুলো। গ্যারেজের দরজা খোলার শব্দ শুনে সে তড়াক করে লাফিয়ে নেমেই বলল, ‘জানিস ননী, আর দু—মাস পরই বেঙ্গল চ্যাম্পিয়নের লড়াই হবে। আমি নামব, গোমস বলেছে।’
‘তাহলে বস্তাটাকে ঝোলা, কাম শুরু কর আর এই আপেলটা ধর। বিকালে এক প্যাসেঞ্জার রিক্সা থেকে নামবার সময় থলি ধরতে দিছিল। একটা ম্যানেজ করে রাখছি।’
আপেলে কামড় দেবার আগে শিবা বলল, ‘হ্যাঁরে পিপল মানে জানিস?’
.
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার জন্য শিবার মোট সময় লাগল, প্রথম লড়াইয়ে এক মিনিট, পরের লড়াইয়ে ২০ সেকেন্ড। ডান হাতের দুটি কঠিন পাঞ্চ তাকে দুটি নক আউট এনে দিয়ে বক্সার মহলে সাড়া ফেলে দেয়। চ্যাম্পিয়নশিপ চলছে বৌবাজারে রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের এস ও পি সি রিংয়ে। এবার শিবা ছাড়া আর কেউ নক—আউট করে ফাইনালে উঠতে পারে নি। ফাইনালে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সুনীল বেরা। চ্যাম্পিয়নশিপে এখন যাবতীয় চোখ লাইট ওয়েট ফাইনালের দিকে। এস ও পি সি থেকে উপচে ধর্মতলা স্ট্রিটের ফুটপাত গড়িয়ে ট্রাম লাইন পর্যন্ত ভীড়।
ওদের চোখাচোখি হল রিং—এর মাঝে হ্যান্ডশেকের সময়। নিথর অথচ কঠিন দু—জোড়া চাউনির সংঘর্ষ থেকে ফুলকি ছিটকাল। চীৎকার ভেসে এল গ্যালারি থেকে: ‘নক আউট…নক আউট চাই।’
রেফারির প্রথা মাফিক নির্দেশ বিতরণের পর ওরা দু—জন নিজেদের কর্নারে ফিরে এল। শিবা আলতো চোখ বোলাল রিং—এর ধারে বসা বিশিষ্ট দর্শকদের উপর। গোমস ও আশ্চর্য ঘটক দাঁড়িয়ে তার কাছেই। হেসে মাথা নাড়ল গোমস। শিবাও মাথা নাড়ল। না, সে আগের মতো তেড়ে যাবে না। রিং—এর ধার ঘেঁষে অনিমেষ। এবারও তার সেকেন্ড। অনিমেষের পাশে উবু হয়ে বসে ননী। ফিসফিসিয়ে সে বলল, ‘ওস্তাদ…পিপল তোর কাছেই আছে।’
হাসতে গিয়ে শিবার চোখ আটকে গেল একজোড়া চোখে। টকটকে ফর্সা, ধুতি—পাঞ্জাবি পরা, সোনার ফ্রেমের চশমা চোখে আঁটা লোকটির পিছনে তীক্ষ্ন দৃষ্টি নিয়ে চেয়ারে বসে রয়েছে সাধু। ঝুঁকে সে সামনের ফর্সা লোকটিকে কিছু কথা বলে আবার তাকাল। ঠোঁটে যেন এক চিলতে হাসি।
‘ঢং।’
শিবা এগল। সতর্ক, ধীর গতি। কাছাকাছি এসে ঘুরতে শুরু করল। আগে আসুক সুনীল, ঘুসি বাড়াক। শিবা একটু এগিয়ে ঘুসির পাল্লার মধ্যে মুখটা আনল। একটা লেফট জ্যাব তার মুখের দিকে এগিয়ে এল। শিবা পিছনে হেলে মুখটা সরিয়ে নিল অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। জ্যাব করতে সুনীল একটু ঝুঁকে পড়েছিল, ডান হাতটা সরে গেছে মুখটাকে খুলে দিয়ে। প্রচণ্ড একটা লেফট—হুক ওর মুখে বসিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মুখটা একটু পাল্লার বাইরে রয়েছে, পাঞ্চের পিছনে জোর দেওয়া যাবে না। আর একটু কাছের থেকে, আর একটু এগিয়ে বাগের মধ্যে আনার পর বসাতে হবে। অযথা ঘুসি নষ্ট করতে শিবা রাজি নয়।
পরপর দুটো জ্যাব ছুঁড়েই সে পিছিয়ে গেল। সুনীল এগচ্ছে। শিবাও এগল। চোখে চোখ দু—জনেরই। শিবার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, এবার সুনীল কি করবে। শিবা বাঁ হাতের ছোট্ট একটা আঘাত দিল মাথায়। দর্শকদের মর্মর গুঞ্জনটা জোর হয়ে উঠল। সুনীল সবেগে ডান হাত চালাল পাঁজর লক্ষ্য করে। শিবার কনুই চকিতে আটকে দিল। মুখটা তার খোলা। সুনীল বাঁ হাতের ঘুসি মুখ লক্ষ্য করে চালাতেই শিবা হেলে গিয়ে মুখ সরিয়েই দেখল, ঘুসির ঝোঁকে সুনীল মাথাটা ঝুঁকিয়ে ফেলেছে। মুখের সামনে গার্ড নেই। বিদ্যুৎ গতিতে শিবার লেফট হুক সুনীলের চোয়ালে গিয়ে পড়ল। তারপরই ডান হাতের সোজা ঘুসিটা।
উত্তাল চীৎকারের মধ্যে শোনা গেল না সুনীলের পতন শব্দ। চীৎ হয়ে নিঃসাড়ে সে পড়ে রইল। রেফারি হাত নেড়ে শিবাকে নির্দেশ দিল কাছের কর্নারটিতে গিয়ে অপেক্ষা করতে। শিবা কর্নারে চলে যাবার পর রেফারি গুণতে শুরু করল হাতটাকে উপর—নীচ করাতে করাতে : ‘ওয়ান…টু…থ্রি’ এবং ‘টেন’ বলার পরও সুনীল একইভাবে মেঝেয় পড়ে আছে দেখে শিবাকে ডাকল রিং—এর মাঝে আসার জন্য।
শিবার বাঁ হাত রেফারি উপরে তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই ননী তড়াক করে লাফিয়ে দড়ি রিং—এর মধ্যে শিবাকে পিছন থেকে জড়িয়ে পিঠে মুখ ঘষতে শুরু করল।
‘ওস্তাদ ওস্তাদ।’ ফিসফিসিয়ে ননী বলল, ‘তোরে রিক্সায় বসায়ে প্রোসেশান করে ঘোরাব। আজ তুই বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন।’
সুনীলকে তিন—চারজনে ধরাধরি করে রিং থেকে বার করে নিয়ে গেল। শিবা নামতেই আশ্চর্য ঘটকের বিরাট থাবা তাকে টেনে নিল বুকের মধ্যে।
‘এভাবে প্রত্যেকটা খেলায় নক আউট আমি দেখি নি রে কখনো। লালবাগানের ইজ্জত বাড়িয়ে দিলি।’
শিবা ঝুঁকে তাকে প্রণাম করে উঠতেই শুনল গোমস বলছে: ‘ঘোটোক তোমাকে বলেছিলাম যা এবার তা মিলিয়ে নাও। ঝুটা কি সাচ্চচা আমি ঠিক চিনতে পারি কিনা।’
শিবা তাকেও প্রণাম করতে যেতেই গোমস হাত দুটি ধরে ফেলে শুধু বলল, ‘আই অ্যাম রিয়েলি প্রাউড টু—ডে। এবার হার্ড ট্রেনিং ন্যাশনালের জন্য।’
‘সে আমি আইজ রাত থেকেই শুরু করাব।’ ননী বলল আশ্চর্যের বিরাট দেহের পিছন থেকে।
ড্রেসিং রুমে সুনীল বেঞ্চে বসে আছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। শরীর ক্লান্ত অবসন্ন। শিবা গিয়ে তার হাত দুটি ধরে ঝাঁকাল। নিরাসক্ত চোখে সুনীল তাকাল। ফিকে হাসল। লালবাগানের কয়েকটি ছেলে শিবাকে ঘিরে রয়েছে। তাদের সরিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে কান্তি এল। বলল, ‘কনগ্র্যাচুলেশন নতুন করে আর কি জানাব। জানতুমই তুই নক আউট করবি। যা পাঞ্চের জোর, সুনীলের মুখটা আস্ত রয়েছে কি করে ভেবে পাচ্ছি না।’
