‘আয় ননী, আমাকে হেল্প কর। ব্যাগটা দুলিয়ে ছুঁড়ে দে আমার দিকে। এইভাবে।’
বলতে বলতেই শিবা ঝোলানো ব্যাগটা দু—হাতে ঠেলে দুলিয়ে দিল। দুলে পিছনে গিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে ব্যাগটা, শিবা তার সামনে এসে দাঁড়াতেই ব্যাগটা তার পেটের উপর আছড়ে পড়ল।
‘এবার তুই এভাবে দুলিয়ে যা।’
তিন মিনিট পরেই শিবা হাঁফাতে হাঁফাতে বসে পড়ল। তার বুক, পেট, মুখ যন্ত্রণায় অসাড় হয়ে গেছে। কলজে নিংড়ে বেরিয়ে গেছে যাবতীয় বাতাস। গোঙানির মতো শব্দ করতে করতে সে মুখ তুলে বাতাস গিলছে।
‘হয়ে গেল? এইটুকু ট্রেনিং করেই হয়ে গেল? এতেই তুই ফাইটার হবি? ওঠ ওঠ।’
হঠাৎ ননী, তার সরু দুটি পায়ের অন্যতম, ডান পা দিয়ে শিবার পিঠে লাথি কষাল।
‘লজ্জা করে না তোর? হাজার লোকের চোখের সামনে মার খেয়ে এলি, লজ্জা করে না।’
আবার সে লাথি কষাল শিবার পিঠে। প্রথমটিতে শিবা চমকে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়েছিল। বিশ্বাস করতে পারছিল না ননী এমন এক দুঃসাহসিক কাণ্ড করতে পারে, দ্বিতীয়টিতে সে খেপে গিয়ে লাফিয়ে উঠে ননীর জামাটা মুঠোয় ধরে তাকে ঝাঁকাতে শুরু করল।
‘ব্যাপার কিরে, তোর সাহস ত কম নয়! পা—টা যদি ভেঙে দিই।’
‘গায়ে জোর বেশি তোর, ভাঙতে ত পারবিই। কিন্তু আজকের লজ্জা কি তাতে ভাঙবে?’
হঠাৎ শিবার মনে হল, সে যেন সাধু আর ননী যেন ভবানী স্যার। সাধুর মতোই তার মুখ দিয়ে কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে—পা—টা যদি ভেঙে দিই।
‘শচীনকাকুকে কওয়া মাত্র ওর মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কাল অনেকেই জিগাবে, শিবা জিতছে ত?’
‘আমি কি করব’, শিবা চাপাস্বরে ভাঙা গলায় বলল। ‘মানুষ মাত্রেই হারে।’
‘মানুষ জেতেও। তার জন্য মনের জোর চাই।’
শিবা আবার চলে গেল অন্ধকার কোণটায়। ফিরে এল একজোড়া ছেঁড়া গ্লাভস নিয়ে। আশ্চর্য ঘটকের দেওয়া উপহার।
‘পর তুই।’
‘কেন?’
‘বলছি যা তাই কর।’
ননী গ্লাভস জোড়া মুঠোয় গলাল। মোটরের বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শিবা বলল, ‘এবার আমায় মার। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত যেখানে খুশি পাঞ্চ করে যা, যত জোরে পারিস।’
ননী কয়েক মুহূর্ত দ্বিধাগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘রাগ করেছিস আমার ‘পর?’
‘রাগ—ফাগ করলে এতক্ষণে তুই ছাতু হয়ে যেতিস। ক্লে যেভাবে ট্রেনিং করে আমিও সেভাবে করব, মার আমাকে।’
‘ক্লে আবার কে?’
‘একটা মানুষ, নে মার।’
ননী দু—হাতে এলোপাতাড়ি ঘুসি চালাচ্ছে। বনেটে হেলান দিয়ে দু—হাত মুখের কাছে তুলে, শিবা অন্ধকারে নিছকই আন্দাজে, হাতের উপর, মাথায় এবং পেটে ঘুসি দিতে লাগল। গোটা পনেরো ঘুসি বসাবার পর ননী হাঁফিয়ে উঠে থেমে পড়ল। গা ঝাড়া দিয়ে শিবা সিধে হয়ে দাঁড়াল। ঘুসিগুলো অত্যন্ত হালকা, নিতে কোনো অসুবিধা হয় নি। ননী তা বুঝতে পেরে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, ‘রিক্সা চালাই, হাতের থেকে তাই পায়েই জোরটা বেশি। বক্সিং যদি পা দিয়ে লড়া হয়, তোরে প্রথম রাউন্ডেই নক আউট করব।’
চারদিন পর সন্ধ্যায় লালবাগানে রিং—এর ধারে শিবার কাঁধে হাত রেখে গোমস বলল, ‘জীবনের প্রথম ফাইট তুমি হেরেছ। হার কাকে বলে না জানলে, জিত কাকে বলে জানা হয় না। ইটস অ্যান এডুকেশন। শিক্ষা যদি নিতে পার তাহলে বড় হতে পারবে। শিবা এই কথাটা জেনে রাখ, চ্যাম্পিয়ন জিমে তৈরি হয় না। চ্যাম্পিয়ন তৈরি হয় তাদের ভিতরের, একেবারে ভিতরের জিনিস থেকে, সামথিং দে হ্যাভ ডীপ ইনসাইড দেম। —সেটা হল ইচ্ছা, একটা খোয়াব একটা ভিসন। মনের মধ্যে এটা না থাকলে, কেউ বড় হতে পারে না শিবা। আর চাই স্ট্যামিনা, ফাস্ট হতে হবে, স্কিল থাকা চাই আর চাই মনের জোর যাকে বলে উইল। স্কিলের থেকেও স্ট্রংগার হবে উইল। তুমি দেখবে, অনেক ফাইটার হারে তার থেকেও লেস স্কিলফুল অপোনেন্টের কাছে। কেন? ওই উইলের কমতি থাকে বলে। তুমি সেদিন প্রথমেই মার খেয়ে বুদ্ধি গুলিয়ে ফেলেছিলে। মাথার মধ্যে গোলমাল হয়ে যায়। তোমার স্কিল, স্ট্রেংথ, স্ট্যামিনা বেশি থাকা সত্ত্বেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে লড়তে পার নি। তোমার ইচ্ছাটা খারাপ পথে চলে গেছল, শর্ট কাটে লড়াই জেতার কথা ভেবেছিলে। তুমি অপোনেন্টকে মাপিয়ে নাও নি, জানতে চেষ্টা কর নি তার ক্ষমতা কত, তার গলদ কোথায়। ফাইটারস আর ডিসকভারারস। তারা নিজেদেরও ডিসকভার করে। একটা কথা মনে রেখ, কি করতে হবে, কিভাবে ফাইট করবে এটা বাইরে থেকে কেউ বলিয়ে দিতে পারে না। তোমাকে নিজে সেটা ঠিক করে নিতে হবে। এজন্য তোমার মাথা, বুদ্ধি, মন এসব তৈরি করতে হবে। সবার আগে চাই ইচ্ছা…ডিজায়ার।
ধীরে ধীরে গোমস কথাগুলো বলে গেল। কখনো মাটির দিকে কখনো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে শিবা শুনল। সন্ধ্যার ধূসর আকাশ থেকে রাত্রি ঝরে পড়ছে। গোমস ক্রমশ আবছা হয়ে উঠছে। কিন্তু ওর ভারী মৃদু কণ্ঠস্বর শিবার মনের মধ্যে তরঙ্গহীন ভোরের গঙ্গার মতো শান্ত অথচ গভীর অনুভব তৈরি করে দিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে যেন রেল লাইনের মাঝ দিয়ে বা বালি ব্রিজের উপর দিয়ে সে ছুটছে। টাটকা ভোরের বাতাস ফুসফুস টেনে নিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে শিরায় শিরায়। ভোরের আলোর মতো তাজা হয়ে উঠছে ক্লান্ত দেহটা, সেই সঙ্গে তার মনও।
‘ভাল কথা চিন্তা করবে, ভাল লোকের বন্ধু হবে। সিনসিয়ার আদমি, অনেস্ট আদমি এদের কাছাকাছি থাক তাদের দেখে তুমি ইনস্পিরেশন পাবে। ভাল বড় আদমি মানে সাধু প্রফেট কি রিচম্যান নয়, গরিব কমনম্যান যার সিনসিয়ারলি কাজ করে, অনেস্টলি চেষ্টা করে নিজের জন্য, বালবাচ্চচার জন্য। শিবা, একটা জিনিস লক্ষ্য করবে, একটা প্লেয়ার টুর্নামেন্টে ইনডিভিজুয়ালি যা খেলে তার থেকে অনেক বেশি জোর দিয়ে খেলে যখন দেশের হয়ে রিপ্রেজেন্ট করে। কেন? তখন তার ইনস্পিরেশন থাকে দেশ আর পিপল। তুমিও লড়বে যখন তোমার নিজের পিপলের কথা তোমার মনের মধ্যে থাকবে।’
