রিং—এর মেঝেয় হামা দেবার মতো অবস্থায় হাত ও পায়ে ভর দিয়ে শিবা মাথা ঝাঁকাল। চারিদিক সে ঝাপসা দেখছে। গ্যালারি থেকে ছিটকে আসছে উল্লাস ‘আরো, আরো।’ বক্সিং—এর দর্শকদের মতো নিষ্ঠুর পাগল এবং রক্তপিপাসু পৃথিবীতে কোনো খেলায় নেই।
‘…সেভেন….এইট…’
রেফারি গুণে চলেছে। দশ হলে নক আউট। শিবা উঠে দাঁড়াল। মাথার মধ্যে ভোমরা ডাকটা বন্ধ করে দিতে হবে। সুনীল আবার তেড়ে আসছে, শিবা পিছিয়ে এল। মাথার মধ্যে যে জট পাকিয়ে গেছে সেটা খুলতে হবে।
শিবা সরে যেতে লাগল সুনীলের নাগালের বাইরে।
‘পালাচ্ছে, পালাচ্ছে—ব্যাটাকে ধর। মুখ ফাটিয়ে দে।—কিল, কিল হিম।’
শিবার মাথার মধ্যে শব্দগুলো গোলার মতো ঢুকে, গুম গুম আওয়াজে ফেটে জট খুলে দিচ্ছে, চোখের সামনে থেকে কুয়াশা সরিয়ে দিচ্ছে। তার চেতনায় এখন একটিই কথা : আত্মরক্ষা, বাঁচতে হবে।
‘হেভি ব্যাগ ফাটিয়ে দিয়েছে বলে গুজব রটিয়েছে। বোগাস, মিথ্যুক।’
কে বলল? কান্তি না বেচু? সুনীলের জ্যাব থেকে মুখ সরিয়ে নিতে নিতে শিবা রিং—এর আর এককোণে হটে এল। কে বলল কথাটা? সুনীল এগিয়ে এসেছে। তার কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত ফণার মতো দুলছে। দু—হাত তুলে মুখটা আড়াল করে শিবা পরপর ঘুসি নিতে লাগল হাতে, পাঁজরে। তারপর সে সুনীলের গলা প্রায় জড়িয়ে ধরল। একটা আপার কাট তলা থেকে তার থুতনি লক্ষ করে উঠে এল। তেমন জোর নেই পাঞ্চটায়। দু—জনের হাত যেন জট পাকিয়ে জড়াজড়ি করছে।
‘ব্রেক।’
রেফারি চেঁচিয়ে হুকুম দিতেই দু—জনে এক—পা পিছিয়ে গেল। আর তখনি রাউন্ড এবং লড়াই শেষের ঘণ্টা বাজল।
জাজেদের কাছ থেকে রেফারি স্কোর লেখা কাগজ সংগ্রহ করে যাচ্ছে। দুই বক্সার নিজেদের কর্নারে অপেক্ষমাণ ফল ঘোষণার জন্য। শিবা মুখ তুলে গ্যালারির দিকে তাকাল। সবাই জানে ফল কি হবে, শিবাও জানে। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঠোঁট টিপে সে সামাল দিচ্ছে। রেফারি হাত নেড়ে দু—জনকে ডাকল।
‘উইনার সুনীল বেরা।’
রেফারি বাঁ হাতে উঁচু করে তুলে ধরল সুনীলের ডান হাত। রেফারির ডান হাতে ধরা শিবার বাঁ হাত। সেটা উঠল না। আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিল শিবা। সুনীল এগিয়ে এসে দু—হাত বাড়াল, শিবাও দু—হাত বাড়াল। হ্যান্ডশেক করে সুনীল ওর পিঠে গ্লাভসের চাপড় দিল। শিবার মনে হল তপ্ত চাটু তার পিঠে কেউ ছোঁয়াল।
রিং থেকে নামার সময় শিবা শুনতে পেল—শিস দেওয়ার আওয়াজ। ওরা হয়তো ই সি পি সি এ—র ছেলে। ”বলহরি হরিবোল”—চীৎকার করল একজন।
ড্রেসিংরুমে যাবার পথটা জুড়ে লোকেরা দাঁড়িয়ে। ভীড় কেটে কিভাবে যাবে। পথ খুঁজতে গিয়েই চোখে পড়ল বিশিষ্ট দর্শকদের মধ্যে চেয়ারে বসে রয়েছে সাধু, একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। এক চিলতে হাসি যেন সাধুর ঠোঁটজোড়াকে বেকিয়ে রেখেছে। শিবা মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
এখান থেকে এখুনি তাকে পালাতে হবে।
.
গ্যারেজে মোটরের চালে শিবা চীৎ হয়ে শুয়ে। প্রায় আধঘণ্টা এইভাবে সে আকাশের দিকে মুখ করে, ঝকঝকে কালো পাথরের গায়ে শাদা চূণের হাজার হাজার ফোঁটার মতন, তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে। একটু আগেই তার দু—চোখের কোণ বেয়ে জল নেমেছিল। এত নিঃসঙ্গ, একা সে জীবনে বোধ করে নি। তার বারবার মনে পড়েছে, মা, দাদা, ছোট দুটো মরা ভাই, প্রতিবেশী শক্তিমামা, সাগরমামী, শচীনকাকুদের কথা, ওর এখন ইচ্ছে করছে বক্সিং ছেড়ে, এই গ্যারেজের কাজ ছেড়ে ফিরে যায় বাড়িতে, আবার বটকেষ্টর দোকানে।
‘ক্যাঁচ’ শব্দ হল গ্যারেজের দরজা খোলার।
একটা ছায়া ভিতরে ঢুকে থমকে দাঁড়াল। শিবাকে খুঁজছে।
‘এখানে।’
ছায়াটা এগিয়ে এসে গাড়ির পাশে দাঁড়াল। ননী।
‘তোরে দেখলাম বাসে উঠছিস, ডাকলাম না।’
‘তুই গেছলি।’
ননী জবাব দিল না। হাতটা তুলে বাড়িয়ে দিল শিবার দিকে। হাতে একটা সিদ্ধ ডিম।
‘খিদে নেই।’
‘শচীনকাকু কয়েছিল ফিরে এসে তারে জানাতে।’
‘জানিয়েছিস।’
‘হ্যাঁ।’
ডিমের খোসা ছাড়িয়ে ননী আধখানা কামড়ে নিয়ে, বাকি আধখানা শিবার হাতে দিল। কিছুক্ষণ চীৎ হয়ে নিথর থেকে, স্প্রিং—এর মতো ছিটকে সে উঠে বসল। পাঁচিলের উপর দিয়ে ছুঁড়ে দিল ডিমের টুকরোটা। তারপর দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রইল মোটরের চালে।
‘আমি ছেড়ে দেব বক্সিং।’
‘সেই ভাল। তাই—ই বরং ভাল। তোর দ্বারা ফাইট চলবে না। ফাইটার অন্য ধাতুতে গড়া হয়।’
‘কি ধাতু?’
‘তা জানি না। তবে ঘটিবাটি থালার ধাতু নয়। এ হচ্ছে মনের ধাতু। স্বামী বিবেকানন্দর ছবিটা দেখেছিস স্যারের ঘরে? চোখ দিয়া যেন আগুন ঠিকরায়।’
শিবার মনের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা কথা ঝলসে উঠল এই মুহূর্তে : আমি নুইব না, নুইব না। ধীরে ধীরে শিবার শিরা—উপশিরায় তপ্ত জোয়ার ফুলে ফুলে উঠতে শুরু করল। কিছু একটা করার প্রবল তাড়না তার শরীরকে গ্রাস করছে। সাধুর বাঁকা ঠোঁট আর চাহনিটা দপ দপ করে উঠল চোখের উপর। কানের কাছে কারা যেন কথা কইছে। বোগাস: বোগাস।
মোটরের চাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে শিবা ছুটে গেল গ্যারেজের অন্ধকার একটা কোণে। দু—হাতে প্রায় একমণ ওজনের বালিভর্তি হেভি ব্যাগটা বয়ে আনল সে কপিকলটার কাছে। দড়িটা কলে লাগিয়ে টান দিয়ে ব্যাগটা মাটি থেকে তুলে বাঁশের সঙ্গে দড়িটা বেঁধে নিল।
