রিং—এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে রেফারি যখন হাত নেড়ে দু—জনকে ডাকল শিবা দম নেওয়া পুতুলের মতো এগিয়ে গেল। এখন সে একটা ব্যাপারই শুধু চাইছে, এই অসাড় অনুভূতিটা কেটে যাক তার স্নায়ু থেকে। যেভাবেই হোক তাকে প্রখর জ্যান্ত হতে হবে। তার সামনে সুনীল বেরা। তার কোমরে লাল রিবন বাঁধা, বুকে ইংরেজি অক্ষরে ‘ই সি পি সি এ’ লেখা গেঞ্জিতে। ওকে মেরে শুইয়ে দিতে হবে।
‘তোমরা দু—জনেই নিশ্চয় রুলস জান। যখন বলব ‘ব্রেক’ দু—জনেই এক পা পিছিয়ে যাবে, তার মধ্যে ঘুসি চালাবে না… পিছিয়ে গিয়ে তারপর আবার শুরু করবে। নো হিটিং বিলো দ্য বেল্ট। কিডনি পাঞ্চ…কোমরের পিছন দিকে এইখানে কিংবা র্যাবিট পাঞ্চ…ঘাড়ের পিছনে এই জায়গায়—একদম করবে না। যখন ‘স্টপ’ বলব থেমে যাবে, যখন ‘বক্স’ বলব লড়াই শুরু করবে। পরিচ্ছন্ন ভাবে লড়বে… গুড, ক্লিন, স্পোর্টসম্যান ফাইট।’
রেফারির নির্দেশনামা শিবার কানে একরাশ মাছির মতো ভনভনিয়েই উড়ে চলে গেল। সে তাকিয়ে সুনীলের চোখের দিকে। ধীরে ধীরে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মেরে শুইয়ে দিতে হবে—এই একটাই তার চিন্তা। তিন রাউন্ডের লড়াই, প্রতি রাউন্ড তিন মিনিটের—প্রতি সেকেন্ডে একটা করে ঘুসি মারা যায় বলেছিল গোমস। অসম্ভব। পরপর দ্রুত পাঁচটা ঘুসি চালালেই হাঁপিয়ে জিভ বেরিয়ে যায়। কোথায় গোমস?
নিজের কর্নারে শিবা দাঁড়িয়ে রিং—এর দিকে পিঠ ফিরিয়ে। ঠিক একইভাবে সুনীলও দাঁড়িয়ে তার কর্নারে, শরীরটা ঝাঁকাচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আলোর ঝাপটা লাগা আধো—অন্ধকার গ্যালারিতে সার দিয়ে আবছা আবছা মুখ। রিং—এর ধারে গোমস বসে। টেবিলে কাগজ—পেন্সিল। গোমসের মুখ পাথরের মতো। কোনো রকম ইঙ্গিতের আঁচড়টুকুও নেই। রিং—এর কাছে বসা দর্শকদের মধ্য থেকে একজন পাশের লোককে বলল, ‘ইঁদুর, বেড়াল, শেয়ালের পর এবার দুটো মোষ উঠেছে।’
‘ঢং।’
টাইম—কীপারের ঘণ্টার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল দু—জন।
‘বক্স।’
রেফারি দুহাত নেড়ে দুজনকে রিং—এর মাঝে আসতে সঙ্কেত জানাল।
মেরে শুইয়ে দেব, শুধু এই একটি নির্দেশ শিবার মাথা থেকে নেমে এল পা পর্যন্ত। দুটো গ্লাভস মুখের সামনে ধরে একটা বুনো শুয়োরের মতো সে সোজা তেড়ে গেল থুতনিটা বুকের দিকে চেপে ধরে।
তিন মিনিট পর প্রথম রাউন্ড শেষ হবার ঘণ্টা পড়তে বিভ্রান্ত, ঘোরলাগা চোখে শিবা ফিরে এল নিজের কর্নারে। হাপরের মতো বুকটা ওঠানামা করছে। ততক্ষণে অনিমেষ লাফ দিয়ে রিং—এর মধ্যে উঠে এসেছে একটা টুল নিয়ে। শিবাকে টুলে বসিয়ে দিয়ে সে হাঁটু ভেঙে কুঁজো হয়ে শিবার পা—দুটো তুলে নিয়ে নিজের ঊরুর উপর রাখল। লজ্জায় পা টেনে নিচ্ছিল সে কিন্তু অনিমেষ প্রায় ধমকে উঠল, ‘রাখ।’ বালিশের মতো পুরু কর্নার প্যাডিংটায় হেলান দিয়ে শিবা চোখ বুজল।
অনিমেষ তোয়ালে দিয়ে তার হাত, মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে। এমন অভিজ্ঞতা শিবার জীবনে এই প্রথম। কেউ তার গায়ে এত নরমভাবে কখনো হাত দেয় নি আর এতগুলো ঘুসিও সে মুখে আর শরীরে এত কম সময়ে পায় নি।
‘হয়েছে কি তোর, এত মার খাচ্ছিস কেন? এত তাড়াহুড়ো কচ্ছিস কেন, আরো দু—রাউন্ড লড়তে হবে খেয়াল নেই? জল খা।’
অনিমেষ জলের বোতলটা দিতেই শিবা তিন—চার ঢোঁক জল খেল। তোয়ালেটাকে ভাঁজ করে পাখার মতো নেড়ে অনিমেষ তাকে হাওয়া দিয়ে চলেছে।
‘বোকার মতো শুধু অ্যাটাকই করে যাচ্ছিস। ও কত সুইফট সরে গিয়ে হিট করছে! এলোপাথাড়ি রাইট ক্রস আর চালাস নি। তোর মুখ খোলা পাচ্ছে আর মেরেই সরে যাচ্ছে। ডিফেন্স ঠিক রাখ।’
দুটি রাউন্ডের মাঝে এক মিনিটের ইন্টারভ্যাল। এই সময়ের মধ্যেই শিবার সেকেন্ড অনিমেষ ঝড়ের বেগে কথার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করে চলল। অপর কোণেও একই দৃশ্য। শিবা এখনো বুঝতে পারছে না কি তার ভুল হচ্ছে।
‘ঢং।’
দ্বিতীয় রাউন্ড শুরুর ঘণ্টা পড়ল। হঠাৎ দর্শকদের একটা উৎকট বীভৎস ধ্বনি তাকে ঘিরে পাকিয়ে উঠল।
‘হিট হিট…নক আউট চাই, নক আউট চাই…।’
শিবা এবারও তেড়ে গেল বুনো শুয়োরের মতো। নক আউট। নক আউট। তার মাথার মধ্যে একটিই কথা, নক আউট।
তিন মিনিট পর, ঘণ্টা বাজতেই শিবা ফিরে এল তার কর্নারে। দ্বিতীয় রাউন্ডে একবার মাত্র সে একটা লেফট হুক সুনীলের ডান পাঁজরে বসাতে পেরেছে। ঘুসিটা খেয়েই সুনীল ছিটকে পিছিয়ে যায় চোখে বিস্ময় নিয়ে। যন্ত্রণায় শরীরটা একবার কুঁকড়ে গিয়েই আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। শিবা যতবার তেড়ে যায়, সে ঘুরে ঘুরে এড়িয়ে রাউন্ডটা শেষ করে।
‘দড়িতে চেপে ধর। ইন ফাইটিং—এ যেতে চাচ্ছে না—কর্নারে নিয়ে যা। আজেবাজে চালাচ্ছিস তুই, দম ধরে রাখ।’ অনিমেষ তার বুদ্ধি অনুযায়ী পরামর্শ দিল। শিবা চোখ বুজে হাঁফাচ্ছে। চোখ খুলে দেখল তার বিপরীত কর্নারে সুনীল টুলে বসে, দু—হাত, দু—পাশে দড়ির উপর ছড়ানো। রিং—এর বাইরে থেকে কান্তি তাকে কি সব বলে যাচ্ছে।
‘ঢং।’
শিবা রিং—এর মাঝে পৌঁছে সুনীলের মুখোমুখি হবার সঙ্গে সঙ্গেই অতর্কিতে লেফট—রাইট কম্বিনেশন পাঞ্চিং—এর সামনে থ হয়ে গেল। দুটোই তার মাথায় আঘাত করেছে। প্রতিপক্ষ হঠাৎ এইভাবে মারমুখী হবে, সে ভাবে নি। তার মাথার মধ্যে গুনগুন করে উঠল ভোমরা। সেই সময়ই একটা ক্রশ এগিয়ে এল তার চোয়ালে এবং ছিটকে পড়ার মুহূর্তে সে দেখল একটা দরজা খুলে যাচ্ছে। দপদপ করছে গাঢ় হলুদ আর সবুজ আলো।
