যখন সে বিরাট খিদে নিয়ে গ্রেট বেঙ্গলে ফিরে এল তখন দেবদাস পাঠক রোডের উপর বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠছে। রাতে রেখে দেওয়া লুচি—মিহিদানার কথা মনে পড়ল। সেগুলো বার করে খেতে গিয়েই সে থমকে গেল। বাসি! এক মুহূর্ত ভেবে, গ্যারেজের বাইরে গিয়ে সে লুচি আর মিহিদানা ফেলে দিল।
.
জিমন্যাসিয়াম ঘরের মধ্যে দেয়াল ঘেঁষে বেঞ্চ। তিনটি ছেলে শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে বসে আছে। তাদের পাশে একটা টুলে বসে শিবা। দরদর ঘামছে। কাঁধ দুটি মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। সামনের ছেলে তিনটির দিকে আড় চোখে সে বারবার তাকাচ্ছে। আর মনে পড়ছে ভবানী স্যারের ঘরে ঠিক এইভাবেই সামনে তাকিয়ে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটা ছেলে। সেদিন তখন শিবার মনে হয়েছিল শ্মশানের দিকে সে তাকিয়ে। প্রত্যেকের চোখে একটা করে লাস।
ঘরের একদিকে হালকা ব্যায়ামে ব্যস্ত দু—জন। আয়নার সামনে একজন স্যাডো বক্স করে যাচ্ছে। বাইরে থেকে প্রচণ্ড দমকে হল্লার মতো একটা আওয়াজ উঠল। তার মধ্য থেকে বুদবুদের মতো দু—চারটে শব্দ ঘরের মধ্যে ভেসে এসে ফেটে পড়ল : ‘মার…মার…রক্ত বার করে দে…রক্ত চাই।’
হলধর বর্ধন বক্সিং টুর্নামেন্টের আজ প্রথম দিন। এখন ফ্লাই ওয়েটের প্রথম রাউন্ডের লড়াই চলছে। শিবা লাইট ওয়েটে লড়বে, কে তার প্রতিপক্ষ এখনো সে জানে না। নিজের ওজনের সঙ্গে আন্দাজ মিলিয়ে তার মনে হচ্ছে যে স্যাডো বক্স করে চলেছে বোধ হয় সেই। শিবা একদৃষ্টে তাকে লক্ষ করতে লাগল। হঠাৎ শিবার চোখ আয়নার দিকে পড়তেই দেখতে পেল ছেলেটি দু—হাত নামিয়ে রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে, তারই মতো লক্ষ করছে তাকেই। কিছুক্ষণ পরস্পরের চোখের দিকে দু—জনে তাকিয়ে রইল।
‘মার মার—সাবাস, শুইয়ে দে—শুইয়ে দে।’
শিবার বুকের মধ্যে ধুকধুক শব্দটা জোর হয়ে উঠল। দু—পাশে তাকিয়ে সে এমন কোনো বস্তু দেখতে পেল না যা তাকে এই মুহূর্তে ভরসা দিতে পারে। গোমস এখন রিং—এর পাশে জাজ হয়ে বসে আছে। ওকে কাছে পেলে সে জিজ্ঞাসা করত ‘আমি কি করব এখন?’
লাউডস্পীকারে ফেদার ওয়েটের লড়াইয়ের ডাক শোনা যাচ্ছে। একজন ব্যস্ত হয়ে বাইরে থেকে ঢুকল।
”কই কই, আরে এখনো তোরা এখানে বসে? ওয়ার্ম—আপও করিস নি! আয় আয়, আর করবার সময় নেই।”
বেঞ্চ থেকে দুটি ছেলে কলের পুতুলের মতো উঠে বেরিয়ে গেল। ওদের গেঞ্জিতে ছাপা ক্লাবের নাম দেখে শিবা জানল ওরা একই ক্লাবের ছেলে। তার সঙ্গে লড়াই পড়েছে, মহাদেব দাসের ইস্ট ক্যালকাটা ফিজিক্যাল কালচার অ্যাসোসিয়েশন অর্থাৎ সংক্ষেপে যা ই সি পি সি এ তারই একজনের সঙ্গে। নাম সুনীল বেরা।
দুটি লোকের সঙ্গে কান্তি ঘরে এল। তিনজনে এগিয়ে গেল, সুনীল বেরা যদি ওর নাম হয় তাহলে সুনীল বেরার দিকে। ওরা নিচু গলায় কি বলাবলি করল। কান্তি তাকাল শিবার দিকে। ওরাও তখন তাকাল। তারপর কান্তি মুচকি হাসল এবং একটু উঁচুস্বরে বলল, ‘হেভি ব্যাগ ফাটিয়েছে, আজ তোকে ফুটো করে দেবে।’
শিবা মুখ ঘুরিয়ে নিল। ভিতরে ভিতরে সে দমে যাচ্ছে। বেঞ্চে এখনো যে ছেলেটি বসে তার মুখে কৌতূহলের আভাস। শিবা আবার মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল।
‘পারবি ত শিবা একে ফুটো করে দিতে?’
শিবা চট করে তাকাল। সুনীল বেরার মুখ গম্ভীর। বুশশার্ট প্যান্ট পরা একটি ছেলে ঢুকল। বাঁ চোখের নীচেটা ফুলে উঠে চোখটা প্রায় ঢেকে গেছে। রগের কাছে প্লাস্টারে আঁটা তুলো। ওদের মধ্যে একজন ওকে দেখে তাড়াতাড়ি বলল, ‘তোকে আর সুনীলের সেকেন্ড হতে হবে না, বিপ্লব হবে।’
ছেলেটি বেরিয়ে গেল। শিবার মনে এল তার উচিত একটু স্যাডো করে নেওয়া। কিন্তু এদের সামনে সে ক্রমশই আড়ষ্ট হয়ে আসছে। মনের মধ্যে একটা কেমন হীনবোধ কাঁধ দুটোকে চেপে তাকে বেঁটে করে দিতে চাইছে। ঘরটা থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে তখন শুনল কান্তি ওদের বলছে, ‘শুধু পাঞ্চের যা একটু জোর, একদম কাঁচা, ইজি তুই পয়েন্ট তুলে নিতে পারবি, টেকনিকের বালাই নেই।’
বাইরে এসে শিবা রিংটাকে দেখার চেষ্টা করল। শুধু রেফারি আর দু—জন বক্সারের মাথা, কাঁধ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। প্রচুর ভীড়। বিশিষ্ট দর্শকরা রিং—এর ধারে চেয়ারে বসে, তার পিছনে লোকেরা দাঁড়িয়ে। তাদেরও পিছনে, বাঁশের কাঠামোর উপর গ্যালারিতে দর্শক। হাজার তিনেক মানুষ দেখছে, তাদের মধ্যে অর্ধেকই চিৎকার করছে হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো।
সে পায়ে পায়ে সরে গেলে যেদিকে লালবাগান পার্কের মটুকনাথ মালির ঘর। এদিকটা অন্ধকার। শিবা মিনিট দুই স্যাডো বক্সিং—এর পরই ক্লান্তি বোধ করতে শুরু করল। চুপ করে সে দাঁড়িয়ে রইল আলো—উদ্ভাসিত রিং আর ভীড়ের দিকে তাকিয়ে। গল গল ঘাম হচ্ছে। তোয়ালের জন্য সে ঘরের দিকে এগবে, এমন সময় পিছনে গলা শুনল মটুকনাথের।
‘তোমার লড়াই হয়ে গেছে?’
‘না, এবার হবে।’
‘ডর লাগছে?’
শিবা কথা বলল না।
‘যাকে তুমি ডর করবে, তার সামনে জলদি জলদি গিয়ে দাঁড়াও। ডর থেকে দূরে সরে থেক না, তাহলে আরো বেশি ডর লাগবে।’
ঢং করে একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে বিকট একটা চীৎকার উঠল রিং—এর দিক থেকে। লড়াইটা শেষ হল। শিবা দ্রুত পায়ে ড্রেসিং ঘরের দিকে চলে গেল।
যখন তার নাম ডাকা হল, যখন সে সিঁড়ি দিয়ে রিং—এ উঠছে, তখন তার স্নায়ুগুলো পাকিয়ে দড়ি হয়ে গেছে, যাবতীয় অনুভূতি ভোঁতা হয়ে অসাড়। সে কিছু জানতে, দেখতে, বুঝতে পারছে না। একবার তার মনে হল, দূরে গ্যালারি থেকে ‘ওস্তাদ’ বলে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল। বোধ হয় হয় ননী। বলেছিল দেখতে আসবে। কাঁধের তোয়ালেটা কে যেন টেনে নিল। ক্লাবের তরফ থেকে অনিমেষ রয়েছে তার সেকেন্ডে। অনিমেষ তার গ্লাভসের লেস বেঁধে দিয়েছে, কোমরে বেঁধে দিয়েছে সবুজ রিবন, উৎসাহ দিয়ে অনেক কিছু বলেছে। কিন্তু শিবার কানে কিছুই ঢোকে নি।
