ভিজে প্যান্ট পরে ননী আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
‘বুঝলি, তোর এখন খুব খাওয়া দরকার। না খেলি গায়ে জোর হয় না।’
‘আজ একটা ব্যাপার হয়েছে রে।’ শিবা মুখের মধ্যে একটা লুচি গুঁজে চোখ বুজে চিবোতে লাগল। ননী এক দৃষ্টে ওর খাওয়া দেখছে।
‘আজ ঘুসি মেরে হেভি ব্যাগটা ফাটিয়ে দিয়েছি।’
‘আরি সাবাস!’
‘হলধর টুর্নামেন্টে আশ্চোয্যোদা আমায় নামাবে।’
‘আরিঃ ববাস!’
‘আমাকে আরো ট্রেনিং করতে হবে, আরো খাটতে হবে, জোর বাড়াতে হবে।’
‘নিশ্চয়। এক কাজ করলি হয়, এখানেই বস্তা ঝুলায়ে তুই ঘুসি মারার কাজ করতি পারিস। সে আমি বস্তা আর বালি ম্যানেজ করে ফ্যালব।’
‘ট্রেনারের কাছে ট্রেনিং করতে হয়। চোখের সামনে করলে, ভুল ধরিয়ে দেয়, নতুন নতুন কায়দা দেখিয়ে দেয়।’
‘তুই বিকালে শিখে আসবি আর রাতে এখানে করবি। কালাসাহেবটা ত তোর মালিকের বন্ধু। ও কয়ে দিলে মালিক তোরে ছুটি দেবে বিকালেই।’
ফ্রাঙ্ক গোমসই এই চাকরিটা শিবাকে করিয়ে দিয়েছে। প্রথম লালবাগান জিমন্যাসিয়াম থেকে ফিরে সে ফাঁপরে পড়েছিল। চায়ের দোকান না ছাড়লে, তার পক্ষে ট্রেনিং করতে যাওয়ার উপায় নেই। চুপিচুপি সে শ্রীকান্ত দাসকে বলেছিল: ‘তোমাদের গ্যারেজে একটা কাজ দাও না শ্রীকান্তদা।’ শ্রীকান্ত বলেছিল দুর্লভ চক্রবর্তীকে: ‘রাতে একজনের গ্যারেজে থাকা দরকার। ছেলেটার সাহস আছে গায়ে জোর আছে, পাহারাও দেবে দিনের বেলাতেও কাজ করবে। বিশ্বাসী ছেলে আমার বাড়ির কাছেই ওর দাদা—মা থাকে, ভাল পরিবার।’
দুর্লভ সব শুনে বলেছিল ‘দেখি।’
এর দু—দিন পরেই গোমস আসে গ্রেট বেঙ্গলে। প্রথমেই সে খোঁজ নেয় শিবার তারপর নিজেই চলে আসে বটকেষ্টর দোকানে।
‘হ্যাললো তুমি ত গেলে না!’
দু—মিনিট পর সে শিবাকে টানতে টানতে আনে দুর্লভের সামনে।
‘এ ব্রিলিয়ান্ট ফাইটার, দুর্লভ। যদি আমার কাছ থেকে ফারদার কোনো কাজ চাও তাহলে একে কাম দাও। দারুণ জিনিস আছে এই ছেলেটার মধ্যে।’
পরদিন সকালেই শিবা কর্মস্থান বদল করে।
‘গোমস বললে হয়তো ছুটি দেবে।’
‘ব্যস। এবার বস্তা—টস্তা আমি ম্যানেজ করবখন। মন দিয়া তুই শুধু ঘুসি চালায়ে যা। আর শোন’, ননী গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘এই মোটর গাড়ির কাজে কিন্তু বেশি খাটাখাটনির মধ্যে যাবি না।’
‘ফাঁকি দোব?’
‘হ্যাঁ। ঘুসির জন্য শরীরে শক্তি চাই। মোটরের পিছনে তা খরচ করিস না। যত পারবি কম খাটবি, বুঝলি?’
ননী চলে যাবার পর শিবা কয়েকটা লুচি আর মিহিদানা কাগজে মুড়ে রেখে, গ্যারেজের দরজায় তালা দিয়ে শুয়ে পড়ল মোটরের পিছনের সিটে। দু—মিনিটের মধ্যেই ঘুম তাকে জড়িয়ে ধরল।
সূর্য ওঠার আগেই শিবা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তখন কাকের ডাক, দু—চারটে লরি বা মোটর ভ্যানের ছুটে যাওয়া এবং কিছু পথিক তাদের শব্দ ও গতি দ্বারা এই আবছা পৃথিবীকে জীইয়ে রাখে। আজও সে রাস্তা দিয়ে ছুটতে শুরু করল। গোমস তাকে বলেছে : রিং—এ তোমার ডিফেন্স নির্ভর করবে পায়ের জোরের উপর। তোমাকে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে লড়তে হবে, অপোনেন্টের ঘুসির আওতার বাইরে লাফিয়ে সরে যেতে হবে। এজন্য ফুটওয়ার্ক দরকার। তোমাকে দম তৈরি করতে হবে। দৌড়ে দৌড়ে পায়ের জোর বাড়াতে হবে। রাস্তায়ই ক্লান্ত হতে হবে, তাহলে দেখবে রিং—এ যত শক্ত লড়াই হোক তার ক্লান্তি তুমি সয়ে যাচ্ছ। প্রতিদিন দৌড় বাড়াবে। কলজে টনটন করতে শুরু করবে। যখন এটা শুরু হবে তখন নিজেকে ঠেলে দেবে সেই যন্ত্রণার মধ্যে। ছুটতে থাকবে যন্ত্রণাকে হটাতে হটাতে। এই যন্ত্রণা জমা থাকবে তোমার শরীরে। যখন অন্যে তোমাকে মারবে, তোমার শরীর সেই মারের যন্ত্রণা দিব্যি হজম করে নেবে।
শিবা ছোটে আর গোমসের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করে। ফুটওয়ার্ক, ক্লান্তি, যন্ত্রণা—শব্দগুলোকে আলাদা করলে তার অর্থ সে বুঝতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে করে গোমস আধা হিন্দি, কিছু ইংরাজি আর বাকিটা বাংলায় মিশিয়ে যা বলেছিল শিবা তার অর্থ না বুঝলেও অন্তর্নিহিত ভাবটুকু মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছে। একবার গোমস বলে : ‘ইউ মাস্ট লার্ন টু হিট উইদাউট গেটিং হিট।’ কথাটার অর্থ সে বুঝতে পারে নি। গোমস পরে যখন তাকে রিং—এ তুলে আর একটি ছেলের সঙ্গে লড়তে দেয়, তখন বারবার বলতে থাকে ‘ইয়েস—ইয়েস দ্যাটস দ্য রাইট ওয়ে…’ শিবা পরে ভেবে দেখে যখন সে জ্যাব করেই নিমেষে পিছনে মাথাটা হেলিয়ে পালটা ঘুসি এড়াচ্ছিল তখনই গোমস ইয়েস ইয়েস বলে উঠছিল। ‘ঘুসি চালাতে দেবে। তোমার অপোনেন্ট বহুত ঘুসি চালাক, চালাতে চালাতে সে টায়ার্ড হয়ে যাবে। তুমি টোপ দাও… ওর হিটিং রেঞ্জের মধ্যে মাথা আনো, ও ঘুসি চালাবে, কুইক তুমি পিছনে তলিয়ে যাবে, ইউ লীন ব্যাক…তারপর ডাইনে কি বাঁয়ে চট করে সরে গিয়ে আবার জ্যাব কর, আবার জ্যাব…মাথা আনো হিটিং রেঞ্জে। ও আবার হিট করবে, তুমি মাথা পিছে হেলিয়ে দেবে…ওর ঘুসি আবার ফসকাবে। শুধু বাতাসে ঘুসি মেরে মেরে তোমার অপোনেন্টের স্ট্রেংথ বার হয়ে যাবে। সবার আগে তৈরি কর ডিফেন্স, কনসেনট্রেট অন টাইমিং অ্যান্ড মোশনস। ঘুসি থেকে সরে যাওয়া শিখতে হবে অনবরত প্র্যাকটিশ করে করে। তুমি কুইক আছ, অ্যান্ড ইউ গট দ্য ট্যালেন্ট।’
ট্যালেন্ট কাকে বলে? শিবা ডানলপ ব্রিজের পাশ থেকে বেঁকে দক্ষিণেশ্বরের দিকে ছুটতে ছুটতে ভেবে যায় ট্যালেন্ট কি—ক্রস, আপারকাট, জ্যাব বা হুকের মতো কোনো ঘুসির নাম?
