একটা সিদ্ধ ডিম। তাড়াতাড়ি সেটা পকেটে রেখে শিবা বলল, ‘ননী কোথায়?’
‘গেছে কোন এক বৌভাতের বাড়িতে জলটল তোলনের কাম লয়্যা।’
শিবা গ্রেট বেঙ্গল অটো রিপেয়ারিং—এর টিনের দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকল। ছোট একটা আঙিনা পাঁচিল ঘেরা। একটা পুরনো মোটর গাড়ি, তারপাশে কতকগুলো খালি মোবিলের টিন, গ্রিজের ড্রাম। দুটো আড়াআড়ি বাঁশে ঝুলছে কপিকল আর শিকল। তালাবন্ধ একটা ছোট্ট টিনের ঘর, তারমধ্যে আছে অ্যাসিটিলিন—ব্লোয়ার, রং—স্প্রেয়ার, সিলিন্ডার, পেট্রলের টিন, পেইন্টসের কৌটো, স্পেয়ার পার্টস আর কাজের যন্ত্রপাতি। এই ঘরের চাবি দুর্লভের কাছে। সে আসবে সকাল সাতটা নাগাদ, শ্রীকান্তরা আসার আগেই শিবাকে নিয়ে গ্রেট বেঙ্গলে কাজের লোক এখন পাঁচজন। একটা—দুটো মোটর গাড়ি গ্যারেজে সব সময়ই থাকে। তারই মধ্যে শিবার রাতের ঘুম সারা হয়ে যায়।
একটা অ্যাম্বাসাডর রং পালটাবার জন্য গতকালই এসেছে। গ্যারেজের দরজাটা ভেজিয়ে শিবা গাড়িটার সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের সীটে বসে রইল কিছুক্ষণ। দুটো হাতের আঙুলের উপরের চামড়া জ্বালা করছে, ছাল উঠেছে কয়েক জায়গায়। আঙুলের গাঁটগুলোয় ব্যথা, মুড়লেই টাটিয়ে উঠছে।
সে সিদ্ধ ডিমটার খোসা ছাড়াতে শুরু করল। সারাদিনে দু—বেলায় দুটো ডিম শচীনকাকু সরাতে পারে বটকেষ্টর শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে। ব্যাপারটা হয় এইভাবে—অ্যালুমিনিয়ামের মগে একটি ডিম ভেঙে ফাটিয়ে তার সবটাই ওমলেট করার জন্য সসপ্যানে শচীন ঢালে না। প্রায় এক—পঞ্চমাংশ মগেই রেখে দেয়, খদ্দেররা সেটা টের পায় না। পাঁচটি ডিমে ছটি খদ্দেরকে তা থেকে ওমলেট করে দেওয়া যায়। একটি ডিম বাঁচে এবং শচীনের কাছ থেকে সেটি লুকিয়ে নিয়ে আসে ননী কিংবা শচীনই, এক সময় রিক্সাওয়ালাদের কাউকে দিয়ে আসে।
রাত্রে ট্রেনিং করে আসার পর শিবার অসম্ভব খিদে পায়। তখন ইচ্ছে করে তার আস্ত আস্ত গাড়িগুলো, পেট্রল গ্রীজ, প্লায়ার ব্রেঞ্চ, সিলিন্ডার গপগপ খেয়ে নিতে। পঁয়তাল্লিশ টাকা মাইনের চাকরিতে তার দুবেলার খিদে মেটে না। বাড়িতে এখন আর সে টাকা দেয় না। একদিন নিতু এসেছিল গ্যারেজে। শিবা তখন একটা মোটরের বনেট থেকে চেঁছে রং তুলছিল।
‘তুই এবার যাস নি বাড়িতে?’
শিবা জবাব না দিয়ে গভীর মনোযোগে কাজে ব্যস্ত থাকে। কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করে নিতু বলে: ‘তুই আর টাকা দিবি না?’
শিবা ইতস্তত করে বলে : ‘আমার এখন টাকা লাগবে। আমি বক্সিং শিখছি….এই কটা টাকা বাড়িতে দিলে খাব কি?’
‘তুই বাড়িতেও যাস না আর।’
শিবা জবাব দেয় না।
‘তুই কি আমাদের ত্যাগ করলি?’
শিবা চুপ করে থাকে।
‘আমাদের ইউনিয়নের দাবির অনেকগুলো মালিক মেনে নিয়েছে, কিন্তু দু—তিনটে মানতে রাজি হয় নি। এবার ধর্মঘট হয় নি, হয়তো হবে কোনো এক সময়। তখন আমার রোজগার থাকবে না, তোকেই তখন…।’
‘বললুম ত’, অধৈর্য হয়ে গলা চড়িয়ে শিবা বলেছিল। ‘আমার খাওয়ার জন্য টাকা দরকার…আমার এখন খিদে পায়, খিদে পায়।’
কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে নিতু বিমর্ষ মুখে চলে গেছল। শিবার কাছে তখন একুশ টাকা রয়েছে। সেদিন সন্ধ্যায় শ্রীকান্তের হাত দিয়ে সব টাকা সে বাড়িতে পাঠিয়েছিল। পরদিন শ্রীকান্ত দশ টাকা ফেরত এনে বলে: ‘নিতু তোকে দিল।’ পরের মাসের মাইনে না পাওয়া পর্যন্ত শিবা জলমাখা ছাতু খেয়ে কাটায়।
ডিমটা খেতে খেতে শিবা ভাবছিল এখন সে কি খাবে? ডিমটা তার খিদেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কৌটোয় ছাতু আর ছোলা ভিজানো আছে। এর সঙ্গে পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা যদি—শিবার মুখে লালা জমে উঠল।
গাড়ি থেকে নামতেই দেখল একটা ছায়া দরজা খুলে ঢুকল।
‘কে?’
‘আমি রে, আলোটা জ্বাল।’
শিবা সুইচের কাছে যেতে যেতে বলল, ‘বৌভাতের খ্যাঁট কেমন হল, সাঁটিয়েছিস খুব?’
চল্লিশ ওয়াটের বাল্বটা জ্বেলে শিবা দেখল, পকেট থেকে ননী কি যেন বার করায় ব্যস্ত।
‘নে ধর।’
এক তাড়া লুচি। অন্য পকেট থেকে বার করল চটকানো কয়েকটা বেগুনভাজা, মিহিদানায় মাখামাখি। অবশেষে দুটো মাছের টুকরো।
‘এর বেশি আর পারলাম না। ভাবলাম সন্দেশও হাতাব, তা একটা বাবু এমন নজর রাখতে শুরু করল—খা, খায়্যা নে, হাঁদার মতো দেখতিছিস কী?’
লুচিগুলো বিছিয়ে তার উপর মিহিদানা রাখতে রাখতে ননী বলে চলল, ‘প্যান্টটা রসে ভিজে গেছে, তোর এখানে জল আছে?’
টিনের ঘরের পিছনে বড় ড্রামে জল রাখা আছে। প্যান্টের বোতাম খুলতে খুলতে ননী আড়ালে চলে গেল।
শিবার চোখ জ্বলজ্বল করছে। ঝুঁকে মাছের গন্ধটা নিল বুক ভরে। লুচিগুলোয় আলতো আঙুল বোলাল, ঠোঁট দুটো বেগুন ভাজায় ঠেকিয়ে, চাটল। যেন এক তোড়া গোলাপ সে পেয়েছে।
‘বুঝলি শিবা’, চেঁচিয়ে ননী কথা বলে চলল। ‘ভাবলাম বাড়িতেই নিয়া যাই। তারপর ভাবলাম ধুর, এই কটা ত জিনিস আর অতগুলো পেট, এক একজনের ভাগে কিসুই পড়বে না, তার থেকে বরং একজনই পেট ভর্যা খাক।’
শিবার মুখের মধ্যে তখন লুচি আর বেগুন ভাজা। সে শুধু মাথাটা নাড়িয়ে ননীর এই বিজ্ঞ সিদ্ধান্তের প্রতি অনুমোদন জানাল। কথা বলার মতো অবস্থা মুখের মধ্যে তৈরি হতেই সে বলল, ‘এই বিয়েবাড়ির খাবার খেয়ে আমার ছোট ভাই দুটো মরেছে। তুই বাড়িতে না নিয়ে গিয়ে ভালই করেছিস।’
