এই সিদ্ধান্তের পরের দিনই দুপুরে ননী একগাল হেসে তাকে বাইরে থেকে ইশারায় ডাকল। দোকানে খদ্দের নেই। শিবা বেরিয়ে আসতেই ননী একটা ছোট্ট পুঁটলি তার হাতে তুলে দিল।
‘কি এটা!’
‘খুলে দেখই না।’
সাদা হাতকাটা গেঞ্জি, কালো হাফপ্যান্ট, আর নীল রঙের একজোড়া কেডস। এগুলো মোড়া একটা খয়েরি তোয়ালেতে। শিবার দুটো হাত কেঁপে উঠল। অস্ফুটে চাপা গলায় সে বলল, ‘এসব কার, এসব কে দিল?’
‘কে আবার দেবে, আমরাই। রিক্সাওয়ালারা, সবজিওয়ালারা, বিড়ির দোকান—এই এরাই চাঁদা দিল। আমাদের জন্য একজন ফাইটার দরকার তাই দিল।’
ননী হাসছে। আর শিবার চোখের সামনে ওই হাসিটা এক হাজার সূর্যের আলো নিয়ে ঝলসাতে শুরু করল। চোখ বন্ধ করে ফেলে সে যন্ত্রণায় চীৎকার করে উঠল মনের মধ্যে—’আমি হব।’
.
তিন
”ঢপ…ঢপ…ঢপ।”
দু—সেকেন্ড পরে আবার। ‘ঢপ…ঢপ।’
পাঁচ মিনিট ধরে নাগাড়ে শব্দগুলো হতে হতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরটার আলো নেভানো। এত রাত্রে অর্থাৎ দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট এখন, ইলেকট্রিক খরচ করে মাত্র একজনকে ট্রেনিং—এর সুযোগ দেবার জন্য অর্থ ব্যয়ের সামর্থ বা ইচ্ছা এই জিমন্যাসিয়ামের নেই। ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় একটা বাল্ব জ্বলছে। সেখানে একটা নড়বড়ে টেবল ঘিরে চেয়ারে কয়েকজন প্রবীণ সদস্য পৃথিবীর তাবৎ ভাল—মন্দ সুখ—দুঃখ নিয়ে প্রতিদিনের মতো আজও আলোচনায় ব্যস্ত। আশ্চর্য ঘটক খাতা, বিলবই, নানাবিধ ফর্ম এবং চিঠি নিয়ে টেবলে ঝুঁকে রয়েছে। কিছুদিন পরই শুরু হচ্ছে লালবাগান জিমন্যাসিয়াম পরিচালিত হলধর বর্ধন স্মৃতি বক্সিং টুর্নামেন্ট। তারই ব্যবস্থায় আশ্চর্য ঘটক এবং কয়েকজন ব্যস্ত।
‘অন্ধকারে হেভিব্যাগে কে ট্রেনিং করছে গো!’ একজন জানতে চাইল।
‘গোমসের ছেলে।’ আশ্চর্য মুখ না ফিরিয়েই বলল।
‘এত রাতে!’
‘সময় করে উঠতে পারে না।’
‘মনে হচ্ছে ডেডিকেটেড, আগে ত একে দেখি নি।’
‘এতদিন সন্ধেবেলায়ই আসত, ছিল চায়ের দোকানে, চাকরিটা বদলে এখন একটা মোটর সারাবার কারখানায় কাজ নিয়েছে ট্রেনিং—এর সুবিধের জন্য। আপনি নোটনদা আজ বেশিক্ষণ রয়েছেন তাই ওকে দেখলেন নয়ত আমরা চলে যাবার পরও শিবা থাকে।’
‘শিবা নাম?’
‘হ্যাঁ। গোমস এবার ওকে নিয়ে পড়েছে।’
‘গোমস একটা খ্যাপা। এই নিয়ে কটাকে ধরে আনল বলত।’
আর একজন বলল ডিবে থেকে নস্যি বার করতে করতে।
‘বেঙ্গল থেকে বহু বছর বক্সার ওঠে নি।’ চাপা স্বরে খেদ শোনা গেল।
‘বড় কষ্ট করতে হয় ওঠার জন্য। শেষ পর্যন্ত বাঙালিরা আর টিকে থাকতে পারে না। আদত জিনিস ঘুসির জোর, সেটাই এখানকার বাঙালি ছেলেদের নেই।’ বলতে বলতে নোটনদা উঠলেন বাড়ি যাবার জন্য।
ঠিক এই সময়ই জিমন্যাসিয়াম ঘরের দরজার কাছ থেকে ফিসফিস স্বর শোনা গেল : ‘আশ্চোয্যোদা।’
আশ্চর্য ঘটক মুখ তুলে তাকাল।
‘একবার আসবেন।’
একটু অবাক হয়েই উঠে গেল ঘরটার মধ্যে। ঘরের আলো জ্বলল এবং আধ মিনিটের মধ্যে আশ্চর্য উত্তেজিত ভাবে বেরিয়ে এসে, ক্লাব গেটের কাছে পৌঁছনো নোটনদার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল: ‘নোটনদা, নোটনদা এক মিনিট একটু এদিকে আসুন।’
ভ্রূ কুঁচকে নোটনদা ঘুরে দাঁড়ালেন। ‘রাত হল, দেরি হয়ে যাবে। ব্যাপার কী?’
‘হোক দেরি, এক মিনিট।’
অনিচ্ছুক নোটনদা এবং কৌতূহলী বাকিরা জিমন্যাসিয়াম ঘরে ঢুকল। এক কোণে যেন চোর দায়ে ধরা পড়েছে এমন মুখ করে শিবা দাঁড়িয়ে। ওরা সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে আশ্চর্যের দিকে তাকাল।
‘কি ব্যাপার আশ্চয্য?’
আশ্চর্য আঙুল তুলে কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো হেভি পাঞ্চিং ব্যাগটাকে দেখাল। ক্যানভাসের খোলের মধ্যে বালি ভরা ব্যাগটা নিথর হয়ে ঝুলে রয়েছে। আশ্চর্য এগিয়ে এসে ব্যাগের একটা জায়গায় দুটো আঙুল ঢুকিয়ে দিতেই ঝরঝরিয়ে বালি বেরিয়ে মেঝেয় পড়ল।
‘ফেটে গেছে!’ একজন বলল।
আশ্চর্য আঙুল তুলে শিবাকে দেখিয়ে বলল, ‘ওর কাজ।’
‘কি কাণ্ড, ফাটিয়ে দিয়েছে!’ নোটনদর সঙ্গে আর সবাই এগিয়ে এসে ব্যাগটিকে তন্নতন্ন পরীক্ষা করে বিস্ময়ে মাথা নাড়ল।
‘ব্যাগের কাপড়টা ত দেখছি পুরনো নয়।’
‘এ যে গোলে শট মেরে জাল ছিঁড়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার হল। এসব ত শুধু শুনেছি মাত্র, চোখে কখনো দেখি নি।’
‘ভাল করে দেখ ত ছেঁড়াটেড়া আগে ছিল কিনা।’
‘ছোঁড়াটা লোহা দিয়ে খুঁচিয়ে ফাটিয়ে রেখে তারপর বাহাদুরি নিচ্ছে না ত!’ একজন সন্দেহ জানাল নিচু গলায়।
‘না না ওসব আমি করি নি।’
শিবা ব্যাকুল হয়ে উঠল নিজেকে নিরপরাধ প্রতিপন্ন করতে।
‘আমি শুধু পাঞ্চ করে গেছি, আর কিছু করি নি।’
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরই শিবা করুণ সুরে বলল, ‘আশ্চোয্যোদা, ও—মাসে আমি নতুন ব্যাগ করিয়ে দেব, মাইনে পেলেই। ইচ্ছে করে কিন্তু আমি ফাটাই নি।”
‘হারামজাদা, ইচ্ছে করে কি কেউ ঘুসি মেরে এ ব্যাগ ফাটাতে পারে?’
বলতে বলতেই আশ্চর্য তার ভল্লুকের থাবার মতো তালুতে শিবাকে আঁকড়ে বিরাট দেহের মধ্যে টেনে নিল। ফিসফিস করে বলল, ‘তোকে হলধর টুর্নামেন্টে নামাব। চালিয়ে যা, চালিয়ে যা। যত ব্যাগ ফাটাতে চাস ফাটিয়ে যা।’
শিবা যখন দেবদাস পাঠক রোডের মোড়ে বাস থেকে নামল তখন জায়গাটা নির্জন। সব দোকানই বন্ধ, শুধু বটকেষ্টর চায়ের দোকান ছাড়া। শিবার জায়গায় পচা নামে একটা বাচ্চচা ছেলে কাজ করছে। দুটো রিক্সা খদ্দেরের আশায় দাঁড়িয়ে। রাধেশ্যাম ওকে দেখে রিক্সার সিট থেকে নেমে এসে বলল, ”শচীনের ছেলের জ্বর তাড়াতাড়ি চইল্যা গেল। এইটা তোমার জন্য দিয়া গ্যাছে।”
