ননী থেমে গেল। শিবার দু—চোখে ধক ধক চাহনি।
‘আমি কি ভিখারি? আমার ইজ্জৎ নেই? ওরা দেবে বলেছে ত বলেছে, যদি না দেয় ত নাই দিল, তাই বলে চাইতে যাব!’
‘কি জানি, কারে যে তুই ইজ্জৎ বলিস বুঝি না। বাপ উদ্বাস্তু হয়ে আসছে, আমি জন্মাইছি এখানে, জন্ম থেকেই দেখতিছি হাঁড়িতে ভাত নাই, ইজ্জতের কথাটা ভাবার সময় পাই নাই, বাঁচার কথাটাই শুধু ভেবে গেছি। আচ্ছা ঠিক আছে, দেখি কি করা যায়।’
ননীর সরু সরু দুটো পা ঝপঝপ ওঠানামা করল প্যাডেল চেপে। রিক্সাটা স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ানো পর্যন্ত শিবা তাকিয়ে ছিল।
যথারীতি বটকেষ্ট দাঁত খিঁচিয়ে বলল ‘অ্যাই যে, বাবু সন্ধে কাবার করে তবে এলেন। বলি, শচীন চা করবে না খদ্দের অ্যাটেন করবে?’
শিবা কথায় কান না দিয়ে শুধু বলল, ‘মাইনেটা আজ রাতে বাড়িতে দিয়ে আসব, ঠিক করে রাখবেন।’
‘তার মানে নটার সময় ছুটি চাই?’
‘হ্যাঁ। আর এবার থেকে বিকেলেও দু—ঘণ্টা ছুটি চাই। বক্সিং শিখতে যাব।’
অবিশ্বাস এবং বিস্ময়, একসঙ্গে চটকে কেউ যেন বটকেষ্টর মুখে মাখিয়ে দিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে সে বলল, ‘কি শিখবি বললি? বক্সিং!’
‘হ্যাঁ। লালবাগানে একটা ক্লাবে।’
‘তারজন্য দু—ঘণ্টা করে রোজ ছুটি দিতে হবে?’
বটকেষ্ট হেসে উঠল। দু—জনে কেউ আর এই নিয়ে কথা বলল না।
.
রাত তখন প্রায় সাড়ে নটা, যখন নিচু টালির চালের ঘরটার সামনে শিবা এসে দাঁড়াল। জমি থেকে এক বিঘৎ উঁচু দু—গজ চওড়া দাওয়া, ডান দিকে রান্নার জায়গা আর পিছনে একখানি ঘর। পাশে এবং পেছনেও এই রকম এক ঘর বা দু—ঘরের বাড়ি। মাঝ দিয়ে গেছে একটা সরু গলি, খোলা নর্দমা। কোনো কোনো বাড়ির চালে দেখা যাবে বিছিয়ে আছে কুমড়ো বা লাউ গাছের পাতা। শিবাদের পিছনে শচীনের ঘর। কিছু দূরে গ্রেট বেঙ্গলের শ্রীকান্ত দাসের। কেরোসিন তেল বাঁচাবার জন্য এখানে হারিকেন বা লম্ফ রাত আটটার মধ্যেই নিভে যায় কিন্তু তখনই সবাই ঘুমোবার জন্য শুয়ে পড়ে না।
অন্ধকারের মধ্যেই পাশের বাড়ির দাওয়া থেকে কে বলে উঠল, ‘কে রে, শিবা নাকি?’
শিবা এগিয়ে গেল সেদিকে। ওটা প্রতিবেশী শক্তি দাসের ঘর, দাওয়ায় তিন—চারজন বসে, তার মধ্যে নিতুও রয়েছে। দু—জনে একই কারখানায় কাজ করে। শক্তিই নিতুকে কাজটা করিয়ে দেয়। শিবার বাবা মারা যাবার পর শক্তি দাসই বস্তুত তাদের অভিভাবকের মতো। বছর পঁয়ত্রিশের, তেজী, রগচটা কিন্তু আমুদে লোক। ওর স্ত্রী সাগর ঠান্ডা, জেদী, স্বল্পবাক। এরা নিঃসন্তান।
‘শুনলাম তুই নাকি সাধুটাকে পিটিয়ে তক্তা করে ছেড়েছিস! আয়, আয়, বোস এখানে।’
দাওয়া থেকে দুটি লোক উঠে দাঁড়াল।
‘তাহলে আমরা আসি। এই কথাই তাহলে রইল।’
‘চল তোমাদের এগিয়ে দি। শিবা তুই বোস, আমি আসছি।’
শক্তি দাস লোক দুটিকে নিয়ে এগিয়ে গেল। নিতু বলল, ‘মায়ের হাঁপানি শুরু হয়েছে। শুয়ে আছে। দেখে আয় একবার।’
শিবা তাদের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। ভিতরে অন্ধকার। অদ্ভুত একটা আওয়াজ আসছে ঘরের মধ্য থেকে। হাঁপানির টানের সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ফুসফুসে টেনে নেবার জন্য মরীয়া চেষ্টা আর তাই তৈরি হওয়া মর্মভেদী কাতরানি। শিবার পাকস্থলী হঠাৎ গুলিয়ে উঠল। ঘরে না ঢুকে সে অস্ফুটে দুবার ‘মা…মা’ বলল। কেউ সাড়া দিল না।
কাঁধে কে হাত রেখেছে। শিবা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। নিতু নিঃসাড়ে ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘ভিতরে যাবি না?’
‘আমার ভাল লাগে না। যন্ত্রণা, কাতরানি সহ্য করতে পারি না।’
শিবা তার মাইনের টাকা দাদাকে দেবার জন্য এগিয়ে ধরল। সে ভেবে রেখেছিল বলবে; এবার পুরো টাকাটাই রাখব। কতকগুলো জিনিস কিনতে হবে বক্সিং শেখার জন্য। আমার খুব টাকার দরকার।
কিন্তু সে এই কথাগুলোর একটিও এখন বলতে পারল না। ঘরের মধ্য থেকে যে আওয়াজ আসছে সেটা দমচাপা হতাশ অনুভব ছড়িয়ে দিচ্ছে তার শরীরের মধ্যে, এই শব্দটার জন্যই সে বাড়িতে আসতে চায় না। শ্বাসের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও হাঁপিয়ে ওঠে। তখন সে ভাবে মায়ের এত কষ্ট সহ্য করে বেঁচে থাকার দরকার কী? তার পরই মনের মধ্যে একটা গলা ফিসফিস করে ওঠে: শিবা হাত বাড়া।
‘আমাদের কারখানায় কিছু লোক ছাঁটাই হতে পারে শোনা যাচ্ছে। তখন আন্দোলন, ধর্মঘট, লক—আউট—এসব হবে। তোর রোজগারই তখন কিন্তু সম্বল হবে। তুই এবার রোজগার বাড়াবার চেষ্টা কর।’
‘করব।’
শুধু এই কথাটি কোনোক্রমে বলেই শিবা দাদার পাশ কাটিয়ে অন্ধকারে নেমে এল।
রাত্রে দোকানে শুয়ে আকাশ—পাতাল ভাবতে ভাবতে যখন ঘুমিয়ে পড়ছে, তখন সে এইটুকুই মাত্র বুঝতে পারে: কি করে রোজগার বাড়াব আমি তা জানি না। আমার বিদ্যে নেই, টাকা নেই, বুদ্ধি নেই। আমার বয়স মাত্র সতের। আমার আছে শুধু শরীর আর দু—হাতে দুটো ঘুসি। এই ঘুসি দুটোই শুধু আমাকে পথ তৈরি করে দিতে পারে।
বটকেষ্ট রাজি নয় তাকে প্রতিদিন দু—ঘণ্টার জন্য ছেড়ে দিতে। তার সাফ কথা। ‘তাহলে কাজ ছেড়ে দাও যদি ঘুসির কায়দা শিখতে চাও।’ সঙ্গে সঙ্গে দাদার কথাটা তখন শিবার মনে পড়ে। তোর রোজগারই তখন কিন্তু সম্বল হবে।
তাছাড়াও কেডস, হাফপ্যান্ট, গেঞ্জি, এই জিনিসগুলো না হলে ট্রেনিং করবেই বা কি করে। অন্তত পনের টাকা চাই। আর চাই এমন একটা কাজ যেখানে বিকেলে ছুটি হয়ে যায়। শিবা দু—দিন ধরে এই নিয়ে ভাবল এবং হাল ছেড়ে দিয়ে সিদ্ধান্তে এল, বক্সার হওয়া তার পক্ষে কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।
