‘কেন?’
‘বেদম ঘুসি খেয়ে ওদের লীডারের চোয়াল ভেঙে গেছে আর একজন যে ছিল, তারও পাঁজরের হাড়ে এমন ব্যথা যে এখনো রাস্তায় বেরতে পারে না।’
‘কে মারল!’
শিবা নিজের নামটা বলতে গিয়ে হঠাৎ লজ্জার বঙ্গোপসাগরে হাবুডুবু খেতে লাগল। নিজের মুখে নিজের বীরত্বের কথা বলা তার মনে হল, খুব বাজে খুব নিচু ধরনের ব্যাপার। যারা ফাঁপা তারাই এটা করে। তার করা উচিত নয়। তাছাড়া ভাবতে পারে মিথ্যে বড়াই করছি।
আমতা আমতা করে শিবা বলল, ‘ওখানকারই একটা ছেলে মেরেছে। তারপর লোকজন এসে ওদের ঘিরে ফেলে। সাধু যার হাতে ব্যাটন ছিল, সে যখন কথা দিল আর সে পাড়ার লোকদের সঙ্গে হুজ্জুতি করবে না, ও পাড়াতেও আসবে না, তখন ছাড়া পায়। এখন আমাদের রাস্তা আগের মতই শান্ত। তুমি নির্ভয়ে যেতে পার। ভবানী স্যারের মতো অমন অঙ্ক শেখাবার লোক আর পাবে কোথায়?’
‘তুমি ওর কাছে অঙ্ক শেখ? কোথায় পড় কলেজে?’
উৎসাহের যে তুবড়িটা তার মধ্যে ফুলকি ছিটাচ্ছিল সেটা নিভে গিয়ে শিবা এবার কুঁকড়ে গেল। লেখাপড়ার কথায় ত বটেই তাছাড়া, তাকে দেখে কলেজ পড়ুয়া ভেবেছে অর্থাৎ বড় শরীর নিয়ে তার যে সঙ্কোচ সেজন্যও। মাথা নেড়ে সে বলল, ‘না, আমি পড়ি না।’
তারপর ভাবল, চায়ের দোকানের কুড়ি টাকা মাইনের বয় এটা বলার দরকার আছে কি? মেয়েটির চেহারা এবং ব্লাউজ—স্কার্ট—জুতো ইত্যাদির উপর চোখ বুলিয়ে তার মনে হল, নিশ্চয়ই ভাল বাড়িতে থাকে, ভাল খায়। হাত—পা মচমচে শক্ত কিন্তু গোলগাল নয়, পাকা সোনা রঙের চামড়া তেলতেলা, হাড়গুলো চওড়া। বাড়িতে নিশ্চয় মা আছে বাবা আছে, দেখার লোক আছে। শাসন পায় যত্নও পায়। পড়াশুনার দিকেও বাড়ির লোকের নজর, নয়ত কোচিংয়ে দেবে কেন! হাতে একটি ঘড়িও। কালো ব্যান্ডটা বেশ দেখাচ্ছে ওর চওড়া কব্জিতে। শিবা কয়েক মুহূর্ত বিষণ্ণ বোধ করল। এর কোনটাই সে আজও জীবনে পায় নি। একা একাই তাঁকে বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টা করে যেতে হচ্ছে।
পর পর দুটো বাস এল। মেয়েটি উঠল না। শিবাও উঠল না। দুটো বাসই অন্য পথে যাবে।
‘তুমি পড়তে যেও।’ এইটুকুর বেশি আর কিছু সে বলতে পারল না।
এবার তাদের বাস এল মেয়েটি উঠল। শিবাও উঠল। বাসে ভীড় রয়েছে। পাঞ্জাবী কন্ডাক্টর যখন পয়সা চাইল, শিবা আধুলি দিল।
‘দোঠো?’
থতমত খেয়ে শিবা অস্ফুটে বলল, ‘হ্যাঁ’। তার হাতে কন্ডাক্টর কত পয়সা আর কটা টিকিট গুঁজে দিল সে তাকিয়ে দেখল না। শুধু একটা ভয় হঠাৎ তাকে আচ্ছন্ন করল। এটা কি ঠিক হল? ওর টিকিট কাটা ওকে না জানিয়ে, উচিত হল কি? একদমই আলাপ নেই। এটা অসভ্যতাও ভাবতে পারে। যদি কিছু মনে করে! শিবা দেখল মেয়েটি ভীড় ঠেলে লেডিজ সিটের দিকে এগিয়ে গেছে। উপরে তোলা সুঠাম একটি হাত রড ধরে রয়েছে। হাতটার দিকে তাকিয়ে আবার তার মনে হল, ভাল খায়, যত্নও পায়। এর কোনোটাই সে পায় নি। সে বাস থেকে নেমে পড়ল আর তখনই মনে হল, ওর নামটাও জানি না।
‘এই যে ওস্তাদ। চললা কোথায়?’
এতক্ষণ একমনে হন হন করে শিবা হাঁটছিল। থমকে পাশে তাকাল। রাধেশ্যামের ছেলে ননী, বাবার সাইকেল রিক্সাটা চালিয়ে তার পাশে পাশে চলেছে। রিক্সাটা খালি।
‘দোকান যাবি ত? উঠে পড়। আমিও ওদিকে যাচ্ছি। আধ ঘণ্টা এখানে খাড়া রইলাম প্যাসেঞ্জার নেই।’
মিনিট দশেক হাঁটলে দেবদাস পাঠক রোডের মোড়। শিবা উঠে পড়ল লাফিয়ে।
‘তোর যা চেহারা, দেখলে কেউ রিক্সায় উঠবে না।’
মুশকিলটা ত এইখানেই। লোকে ভাবে মোটা চেহারা হলেই গায়ে বুঝি বেশি জোর। গণেশ সাহার পুরো ফ্যামিলি, ইয়া ইয়া দু—জন আর চারটে ছানা, দেড় মাইল টেনে নিয়ে গেছি আজ দুপুরে, একবারও থামি নাই। তা ওস্তাদ গেছিলি কোথা?’
‘ওস্তাদ, ওস্তাদ কচ্ছিস কেন?’
‘ওরে ব্বাপ, সেদিন যা খেল দেখালি। এক এক ঘুসোয়—’
‘এবার তাহলে আর একটা ঘুসি মারব—’
ননী প্যাডেল করা থামিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেখল তার পিঠের উপর শিবার মুঠো উচানো।
‘মরে যাব রে শিবা, এই দুবলা শরীরে হজম করতে পারব না।’
‘তাহলে মনে থাকে যেন। ওস্তাদ—মাস্তান, গুরু—ফুরু ডাকলেই—’। ননীর পিঠে আলতো কিল পড়ল।
‘বললি না ত কোথা থেকে আসছিস।’
‘লালবাগান গেছলুম।’ একটু থেমে শিবা বলল, ‘আমি বক্সিং শিখব।’
‘কি শিখবি।’
‘বক্সিং। কাকে বলে জানিস?’
‘জানি না! ‘দিল কা দোস্তে’ ধর্মেন্দ্র আর বিনোদ যা ফাইট দেখিয়েছে না। ঠাঁই—ঠাঁই—ঠাঁই, ধর্মেন্দ্র উলটে পড়ল আবার তড়াক করে উঠল, আবার ঠাঁই—ঠাঁই, আবার পড়ল আবার উঠে—তিনবার দেখেছি শুধু ওই ফাইটটার জন্য, দেখবি আজ? তাহলে আবার যাব।’
‘না।’
‘না কেন? ফাইটিং পিকচার না দেখলে বক্সিং শিখবি কি করে। তুই একটা হাড়—কেপ্পন, সিনেমাও দেখিস না।’
‘দাদাকে টাকা দিতে হয়। ওমাসে এই চটিটা কিনেছি এখনো দু—টাকা ধার রয়েছে। এবার কিনতে হবে গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট, কেডস। শিখতে গেলে এসব লাগবে, কিন্তু কোথা থেকে যে পাই—এই এই এখানে রাখ।’
দেবদাস পাঠক রোডের মোড় দেখা যাচ্ছে। ননী ব্রেক কষতেই শিবা লাফিয়ে নেমে পড়ল।
‘সেদিন তোরে যে কত লোক কত জিনিস দেবে কইল। অনেক দিন ত হল, এবার চায়া নে।’
‘যাঃ, চাওয়া যায় নাকি।’
‘লজ্জার কি আছে? এই তোর এক রোগ, মেয়েমানষির মতো লজ্জা। অত লজ্জা করলি—’
