রিং—এর পিছনে ছাঁচা বাঁশের প্রায় ছ—ফুট উঁচু বেড়া। ওধারে আর একটি ক্লাব। জমিতে দাঁড়ালে দু—ধারের কেউ কাউকে দেখতে পায় না। হঠাৎ শিবা দেখল একটি মেয়ে বেড়ার ওধারে কিছু একটার উপর উঠে দাঁড়াল। মেয়েটির কোমর পর্যন্ত সে দেখতে পাচ্ছে। দেহের সঙ্গে সেঁটে থাকা টকটকে লালজামা, ‘ভি’ গলা, কনুই ও কব্জির মাঝামাঝি নেমেছে জামাটার হাতাদুটো। শিবা মুখটি দেখতে পাচ্ছে না। ঘাড় পর্যন্ত কাটা চুল ফিতে দিয়ে বাঁধা।
ডানার মতো দুটো হাত ছড়িয়ে মেয়েটি সন্তর্পণে এগল, যেন সরু কিছুর উপর দিয়ে ব্যালান্স করে যাচ্ছে। ছ—সাত পা গিয়েই ঘুরে দাঁড়াল। শিবা তখন ওর মুখটি দেখতে পেল। এই বার দুটি হাত মাথার উপর তুলে মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে ঝাঁপ দিল দেহটিকে চাকার মতো ঘুরিয়ে। কোমর থেকে মাথা অদৃশ্য হবার সঙ্গে সঙ্গেই কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অনাবৃত নিটোল একজোড়া পা আকাশমুখো হল। একটু কেঁপে স্থির হয়ে জোড়া হল পা দুটি। তারপরই অদৃশ্য এবং ভুস করে পানকৌড়ির মতো আবার কোমর থেকে মাথা। দু—পাশে ডানার মতো হাত। এক—পা, দু—পা, তিন—পা গিয়ে দ্রুত পাক খেয়ে ঘুরেই টলমল করে, নৌকা থেকে প্রতিমার জলে বিসর্জনের মতো পড়ে গেল। মুখটি শিবার চেনা—চেনা মনে হল।
”ওদিকে কি দেখছ?”
শিবা চমকে লজ্জা পেয়ে পিছনে তাকাল।
”এখানে কেউ আশেপাশে তাকায় না। এটা ঘাম আর রক্ত ঝরিয়ে সাধনার জায়গা।”
লোকটির কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপ বা রুক্ষতা নেই। ঈষৎ ক্লান্ত, কিছুটা নিস্পৃহ গলার স্বর।
তাড়াতাড়ি শিবা বলল, ”আশ্চর্যদার সঙ্গে দেখা করব।”
”আমিই আশ্চর্য ঘটক।”
”গোমস আমাকে আসতে বলেছে।”
”ওহ।”
মাত্র এইটুকু বলেই আশ্চর্য ঘটক একবার দৃষ্টিটা তীক্ষ্ন করে শিবার দিকে তাকাল। শিবাও তাকাল। মিশমিশে কালো বিরাট একটা কাঠামো। একটু কুঁজো, অনেকটা যেন ভল্লুকের মতো। সাদা ধুতি ও সাদা শার্ট। চিবুকে ও ঘাড়ে দু—থাক চর্বি। চোখদুটি আয়ত এবং কোমল।
‘গোমসের আজ আসার দিন নয়, পরশু আসবে। তুমি বরং লক্ষ করে যাও আজ এরা কি করছে। কাল একটা স্কিপিং রোপ নিয়ে এস। আর কেডস, গেঞ্চি, হাফ প্যান্ট চাই।’
শিবা মাথা হেলিয়ে জানাল সে রাজি।
‘তোমার নাম? কি পড়?’
‘আমি পড়ি না, চায়ের দোকানে কাজ করি। শিবা, শিবাজী আইচ আমার নাম।’
‘বাড়িতে কে আছে?’
‘মা আর দাদা। আর কেউ নেই।’
‘তুমি এখন লক্ষ কর, এদের দ্যাখ।’
আশ্চর্য ঘটক রিং—এর দিকে এগিয়ে গেল। শিবা কৌতূহলভরে দেখে যাচ্ছে, যা কিছু তার চোখে পড়ছে। বক্সিং তার কাছে অদ্ভুত নতুন এক অভিজ্ঞতা। রাস্তার মারামারি সে দূর থেকে দেখেছে, সেখানে যেভাবে ঘুসোঘুসি হয়, তা থেকে এখানকার ঘুসিগুলোর কোনোই মিল নেই। ঘুসি মারাও কি শিখতে হয়!
একটি ছেলে স্কিপিং শেষ করে হাঁফাচ্ছে। একটু ইতস্তত করে শিবা তার কাছে গিয়ে দড়িটা চাইল। ছেলেটি ছুঁড়ে দিল দড়িটা। একটু সরে এসে দড়ি নিয়ে লাফাতেই পায়ে জড়িয়ে গেল। চট করে সে চারধারে তাকাল, কেউ তার আনাড়িপনা দেখেছে কিনা এবং নিজের অজান্তেই বেড়ার ওধারেও চোখটা একবার ঘুরে এল। কেউ তাকে লক্ষ করছে না। আশ্বস্ত হল ভেবে, এখানে সত্যিই কেউ আশেপাশে তাকায় না। ঘাম আর রক্ত ঝরিয়ে সাধনার জায়গা।
হঠাৎ শিবার মনে পড়ল তার ছুটি মাত্র দু—ঘণ্টার জন্য। বটকেষ্ট ব্যাজার মুখ করে বলেছিল, ‘সন্ধের খদ্দেররা আসার আগেই ফেরা চাই কিন্তু নয়ত আধবেলার মাইনে কাটব।’
স্কিপিং দড়িটা ফিরিয়ে দিয়ে, শিবা লালবাগান পার্কের লোহার গেট পেরিয়ে বেরনো মাত্র দেখল ঝালমুড়ি কিনছে মেয়েটি আরো দু—জনের সঙ্গে। এইবার সে চিনতে পারল। ভবানী স্যারের কোচিংয়ে—সাধু যখন ‘আত্মা আত্মা’ বলছিল তখন অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে এও ঢোঁক গিলছিল। ভবানী স্যারের ডান হাত এখন প্লাস্টারে মোড়া। হাতের হাড়ে চিড় খেয়েছে। এখন স্কুল ছুটি, রোজ সন্ধ্যাবেলা কোচিং ঘরে একা শুয়ে থাকেন, বই পড়েন, বাঁ হাত দিয়ে মাঝে মাঝে অঙ্ক কষেন বোর্ডে। চা আর দিতে বলেন না। দরজায় দাঁড়িয়ে একবার শিবা জিজ্ঞাসা করেছিল—’কেউ আর পড়তে আসে না।’
‘না। হয়তো ভয় পেয়েছে। পাবারই ত কথা।’
‘আপনাকে চা দিয়ে যাব?’
‘না। ছাত্র—ছাত্রী নেই, একটু অসুবিধায় আছি।’
শিবা বুঝে যায়, ভবানী স্যারের চা খাবার পয়সার টানাটানি পড়েছে। ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে বিশ্রী লেগেছিল। কোচিংটা বোধ হয় বন্ধই হয়ে গেল। এখন মেয়েটিকে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘তুমি ভবানী স্যারের কোচিং—এ পড়তে যেতে না?’
শিবার শস্তার জামা আর প্যান্ট এবং চটির দিকে এক নজর তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে মেয়েটি বলল, ‘হ্যাঁ। কেন, কি দরকার?’
‘আর যাও না কেন? স্যার একা বসে থাকেন, কেউই যায় না।’
‘বাব্বা, কে যাবে ওখানে যা গুণ্ডাদের জায়গা।’
মেয়েরা মুড়ির ঠোঙা নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। শিবার তখন ইচ্ছে করছে বলে, গুণ্ডারা আমার হাতে মার খেয়ে আর ওপাড়ায় আসবে না প্রতিজ্ঞা করে গেছে। আর আসেও নি। দেবদাস পাঠক রোডে আর কোনো অশান্তি হয় নি।
মেয়েটি বাস স্টপে দাঁড়াল। অন্য দু—জন বিদায় জানিয়ে চলে গেল। শিবাও বাসে উঠবে।
‘তুমি যা ভেবেছ তা নয়’, শিবা ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল। ‘গুণ্ডারা আর আসে নি, আসবেও না।’
