শিব গ্রোগ্রাসে গিলছিল শুধু কথাই নয়, সারা পরিবেশটাকেও। এটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক নতুন জগৎ। এখানকার ঘাম আর ভারী নিশ্বাস জড়ানো গন্ধটা তার চায়ের দোকানের গন্ধের থেকে আলাদা। এখানকার শরীরগুলো নড়াচড়া করছে ক্ষিপ্র, জোরালো, উদ্ধত ভঙ্গিতে। দিনের পর দিন চায়ের দোকানে সে দেখেছে অলস, মন্থর, কুঁজো, হয়ে বসা দেহ। এখানকার কথাবার্তায় যেসব শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে তা আগে কখনো শোনে নি। চায়ের দোকানে একবারই সে ‘নক আউট’ কথাটা শুনেছে যখন বাজি ধরা হয়েছিল ক্লে—র সঙ্গে লিস্টনের লড়াই নিয়ে। আর একবার ‘নক আউট’ কথাটা তার মনে এসেছিল যখন সাধুকে উবু হয়ে মেঝেয় দু—হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে দেখে। সেই মুহূর্তে ‘নক আউট’ জিনিসটার অর্থ সে খুঁজে পায়। বেচুর কর্কশ, তাচ্ছিল্যকারী ভঙ্গিটা পর্যন্ত তার কাছে অপরিচিত, আগে কখনো দেখে নি।
”কিরে, তোকে ত কখনো দেখি নি।” কান্তি এগিয়ে এসে শিবার আপাদমস্তক দেখল।
”আমাকে আসতে বলেছিল।”
”কে, গোমস নিশ্চয়।”
শিবা মাথাটা হেলালো।
”বুঝলে বেচুদা, এই নিয়ে এক ডজন হল দু—মাসে। আঁদাড়—পাঁদাড় থেকে ধরে আনে, একদিন বড় জোর দু—দিন তারপর আর আসে না।”
বেচুর ঠোঁটে পাতলা একটা বিদ্রূপ ফুটে উঠল। ”বক্সিংটাকে খুব সোজা জিনিস ভাবে। পাড়ায় মাস্তানি করবে বলে শিখতে আসে আর কি। তুই কি করিস?”
”চায়ের দোকানে কাজ করি।”
বেচু আর কান্তির মধ্যে চোখাচোখি হল। দুজনেই নিঃশব্দে হাসল।
”কখনো লড়েছিস?” কান্তি বলল।
”না।”
”ঘুসি খেয়েছিস কখনো?” বেচু বলল।
”না।”
বেচু চোখের ইসারা করল কান্তিকে। সে এগিয়ে গেল শিবার দিকে।
”বক্সিং শিখতে এসেছিস, তাই ত?”
”হ্যাঁ।”
”শিখতে গেলে প্রথমেই ঘুসি হজম করতে হয় কি করে তার ট্রেনিং নিতে হয়।”
কান্তি আর এক পা এগিয়ে শিবার এক হাতের মধ্যে এসে দাঁড়াল। পিট পিট করে শিবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। শিবা আড়চোখে দেখল বেচুর মুখ হাসিতে ভরে গিয়ে বুলডগের মতো দেখাচ্ছে।
”এটা কি বল ত?”
কান্তি বাঁ হাতের গ্লাভস তুলে ধরল শিবার মুখের কাছে।
”ঘুসি।”
”বাঃ, তুই ত জানিস দেখছি। এটা এবার তোকে হজম করতে হবে।”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ঢপ’ শব্দ হল। ডান পাঁজরে হাত দিয়ে কুঁজো হয়ে পড়ার আগেই শিবার চোখের সামনে যাবতীয় বস্তু কালো হয়ে গেল। নিঃশ্বাস নেবার জন্য হাঁ করেও বাতাস টানতে পারল না, বুকে তীক্ষ্ন ব্যথা বোধ করল। মাথার মধ্যেটা এলোমেলো হতে লাগল। ভোমরা ডাকার মতো একটা গুঞ্জন সে শুনতে পাচ্ছে।
‘ঢপ।’
শিবার মাথাটা ঝাঁকুনি দিয়ে উপর দিকে উঠল। কষ্ট নেই, যন্ত্রণা নেই। শুধু অসাড় হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তার সাধুকে মনে পড়ল। সাধুর মুখ, অবাক হওয়া চাহনি, জমাট হয়ে যাওয়া ভঙ্গি। সাবানের বুদবুদের মতো তার চোখের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে সাধু।
‘ঢপ।’
দেয়ালে ছিটকে পড়ল শিবা এবং ঠেস দিয়ে কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে থেকে শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল।
‘আর নয়, আর নয়।’
বেচুর কথাগুলো সে শুনতে পেল না।
‘দেখো, কাল থেকে আর আসবে না, আজই পালাবে।’
সত্যিই শিবা পালাচ্ছে। মরীয়া হয়ে ভয়ে পালাচ্ছে। আধ জাগরণ আধো স্বপ্নের মতো তখন তার অবস্থা। তার মনে হল, পালাতে পালাতে সে একটা বাড়িতে ঢুকল। সারা বাড়িটা ভোমরার ডাকে ভরে রয়েছে। সামনেই একটা ঘর, আপনা থেকেই তার দরজাটা খুলে যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে দপদপ করছে গাঢ় হলুদ আর সবুজ আলো। বামনাকৃতি কতকগুলো লোক বেলুন ফুলিয়ে যাচ্ছে। তাদের চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে বোধ হয়। একটা বিরাট ঘুসি ফোলানো বেলুনগুলোকে ফাটিয়ে দিচ্ছে। দেয়ালে পেরেকে ঝুলছে বিবেকানন্দের ছবি আর একটা রামদা, সেটা থেকে টপ টপ রক্ত পড়ছে। দেয়াল ঘেঁষে সার দিয়ে বসা কয়েকজন ন্যাড়া মাথা লোক একঘেয়ে সুরে মন্ত্র পড়ে চলেছে। তার মধ্যে রয়েছে বটকেষ্টও।
এসব কি! স্বপ্ন দেখছি? শিবা মাথা ঝাঁকাল। হাসার চেষ্টা করল। ভোমরার ডাকটা বন্ধ হয়ে গেল মাথার মধ্যে।
‘এবার তুই বাইরে গিয়ে বাঁ দিকে যাবি। ওখানে রিং—এর পাশে একটা বুড়ো লোককে দেখবি বেঞ্চিতে বসে আছে, নাম আশ্চর্যদা। এই লালবাগান জিমন্যাসিয়ামের সেক্রেটারি। তাকে গিয়ে বলবি কান্তি সরকার আশীর্বাদ করে দিয়েছে এবার আমি বক্সিং শিখব।’
খিক খিক করে হাসির শব্দে শিবা তাকাল বেচুর দিকে।
‘কান্তি তুই বেশ রগড় করতে পারিস ত।’
বুকের দু—পাশটা টিপটিপ করছে শিবার। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিদঘুটে কয়েকটা দৃশ্য সিনেমার মতো চোখে ভেসে উঠছিল। তার প্রতিক্রিয়া তখনো স্নায়ুতে ছড়িয়ে। বেচুর কথাগুলো শুনে হঠাৎ গরম হয়ে উঠল শরীর। যখন ঘর থেকে সে বেরিয়ে এল তার মধ্যে তার প্রবল বিতৃষ্ণা আর রাগ। মাথার মধ্যে এলোমেলো ভাবটা আর নেই। সে বাঁ দিকে এগিয়ে ঘরটার পিছনেই একটা সিমেন্টের চৌকো বেদী দেখতে পেল। প্রায় তিন হাত উঁচু। বেদীটা আকারে একটা বড় ঘরের মেঝের সমান। চার কোণে চারটি খুঁটি। মোটা তিনটি দড়ি বেদীটা ঘিরে খুঁটির মধ্য দিয়ে টানা রয়েছে। শিবার মনে হল এটাই সম্ভবত রিং।
পাঁচটি ছেলে তার উপরে। তাদের মধ্যে একজন দড়ি নিয়ে স্কিপ করছে। দড়িটা এত দ্রুত ঘুরছে যে দেখা প্রায় যাচ্ছেই না। একপায়ে লাফাচ্ছে, দুটো পা পাশে পাশে পরপর তুলে দুলেদুলে লাফাচ্ছে, একটার পর আর একটা পা সামনে তুলে লাফাচ্ছে। কত বিচিত্র ভাবে স্কিপ করে যাচ্ছে! শিবা হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। অন্য ছেলেরা খালিহাতে ব্যায়াম করে যাচ্ছে। কেউ কেউ ঘুসি পাকিয়ে শুধু সামনে দু—পা এগচ্ছে আর সমানভাবে দু—পা পিছচ্ছে কলের পুতুলের মতো। ঘুসি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পাক দিয়ে রিং—এর মধ্যে ছোট্ট জায়গাটাতেই একজন দৌড়চ্ছে। তাকে লক্ষ করতে করতে শিবা আর একটা জিনিস দেখতে পেল।
