শিবা অবাক চোখে কিছুক্ষণ দেখে অবশেষে এগিয়ে এল। আকারে ঘরটা বটকেষ্টর দোকানের সমানই। মেঝে সিমেন্টের, উপরে অ্যাসবেস্টসের চাল। চারধারে পাকা দেয়াল, তাতে কয়েকটা জানালা। ঘরটার মধ্যে ঢুকবে কিনা, ইতঃস্তত করে শেষ পর্যন্ত কৌতূহলই শিবাকে ঠেলে দিল। দরজা থেকে সে দু—পা ভিতরে এসে দাঁড়াল এবং তখনই তার সারা দেহ অযথা একবার কেঁপে উঠল বিদ্যুতের ধাক্কা লাগার মতো।
তেলো হাঁড়ির মতো একটা রবারের বলে অনবরত দু—হাতে ঘুসি মেরে চলেছে একজন। বলটা শূন্যে রয়েছে উপরে—নীচে দু—দিকে স্প্রিংয়ের টানে। ঘুসি খেয়ে বলটা পিছিয়ে গিয়ে ছিটকে ফিরে আসতেই আবার ঘুসি। শিবা অবাক হয়ে যাচ্ছে। দু—হাতে কি চটপট ঘুসি চালাতে হচ্ছে বলটাকে ব্যস্ত রাখতে! থলিতে ঘুসি মারছিল যে যুবকটি সে হাঁফাতে হাঁফাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বাইরের বাতাস নেবার জন্য।
ঘরের একদিকের দেয়ালে চার হাত লম্বা, তিন হাত চওড়া একটা আয়না। সারা ঘরটাই তাতে ধরা পড়ছে। তার সামনে বছর পঁচিশের এক যুবক, একাকী লড়াই করছে নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে। ঘুসি মারছে, ঘুসি কাটাচ্ছে, নেচে নেচে সরে যাচ্ছে। হঠাৎ মাথা নামিয়ে ডুব দিচ্ছে, পিছনে হেলছে, পাশে কাত হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ তার দিকে ঘুসি ছুঁড়ছে আর সে ঘুসিগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে অসম্ভব দ্রুততায়। সঙ্গে সঙ্গে পালটা ঘুসিও ছুঁড়ছে। বাঁ হাতটা মুখ আড়াল করে তুলে ধরা। মাঝে মাঝে সেটা ছোবল দিচ্ছে, হঠাৎ ডান হাতটা প্রচণ্ড থাবার মতো সোজা এগিয়ে বাতাসে গর্ত করে কারুর মুখে গিয়ে পৌঁছচ্ছে। শিবা অবাক হয়ে দেখছিল অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে এই একাকী লড়াই। দেখতে দেখতে বুঁদ হয়ে কখন যেন এগিয়ে এসেছে। কখন যেন তারও মুঠো শক্ত হয়ে উঠেছে, শরীরটা দুলতে শুরু করেছে, মাথা ঝাঁকানি দিচ্ছে, আপনা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, পিছনে এক পা সরে যাচ্ছে ঘুসি কাটাতে।
”অ্যাই এখানে কি কচ্ছিস, ভাগ।”
রুক্ষ কর্কশ কণ্ঠস্বরে চমকে শিবা পিছনে তাকিয়ে বুঝল তাকেই বলা হয়েছে। কুঁকড়ে গিয়ে সে দরজা ছেড়ে পাশে সরে দাঁড়াল। বলেছে যে, সে দরদর ঘাম নিয়ে বাইরে থেকে এল। শিবা ইতিমধ্যেই লক্ষ করেছে, এখানে সকলেই ঘামছে, সকলেই হাঁফাচ্ছে।
লোকটির বয়স ত্রিশের উপরে। ভারী কাঠামো, থ্যাবড়া মোটা নাক, মুখটা চৌকো। চোখ জোড়া কুতকুতে। ভ্রূতে চুল প্রায় নেইই, মাথায় কদম ছাঁট। দু—হাতের তালু ও আঙুলে জড়ানো কাপড়ের পাড় খুলতে খুলতে চেঁচিয়ে বলল, ”দূর দূর, একটাও ছেলে নেই যার সঙ্গে স্পার করা যায়। পাঞ্চের জোর নেই ডিফেন্স করতে পারে না। বল ত কান্তি আজকালকার ছেলেগুলোর হয়েছে কি? পাঞ্চ নিতেও পারে না, দিতেও পারে না। তড়িৎ না ফড়িৎ কি যেন নাম ছেলেটার, স্রেফ চোখ উলটে শুয়ে পড়ল একটা জ্যাব ছোঁয়াবা মাত্র।”
রবারের বলে যে ঘুসি মেরে যাচ্ছে, সে এসব কথায় কান না দিয়ে সমানে নিজের কাজ করে যেতে লাগল। যে ছেলেটি থলি ধরে ছিল, ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। যে আয়নার সামনে একাকী লড়ে যাচ্ছে সে থুতনিটা বুকের দিকে চেপে পরপর দু—বার বাঁ হাতটা ছুঁড়ে বলল, ”যা বলেছ বেচুদা।”
বেচু তখন প্রবল বিরক্তি নিয়ে গজ গজ করে যাচ্ছে, ”কিসসু হবে না। পুতু পুতু করে পাঞ্চ, এতে আমার হবেটা কী। বারবার বলছি মার, আমাকে মার, মুখটা ওপেন করে দিচ্ছি তবুও পারে না হিট করতে।”
কান্তি তার অদৃশ্য প্রতিপক্ষকে রেহাই দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ”তিন রাউন্ড দাঁড়াতেই সব জিভ বেরিয়ে যায় এখানকার ছেলেদের। খাটে না, খাটে না, সব ফাঁকিবাজি। মহাদেবদার ক্লাবে বরং দু—চারটে ছেলে আছে, ওয়েল্টার এমন কি মিডলও পাবে। তোমার মতো লাইট হেভির স্পার করতে কোনো অসুবিধে হবে না।”
”কান্তি তুই একটা পাঁঠা। ওয়েট থাকলেই কি ভেবেছিস বক্সার হওয়া যায়? তাহলে ত আমাদের কারখানার দারোয়ান শিউভজন ইন্ডিয়ার হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত। টেকনিক, স্পিড, সুইফটনেস এসবের আর দরকারই হত না।”
”না না, সেকথা আমি বলছি না।” কান্তি কাঁচুমাচু হয়ে গেল। টুলে বসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বেচু পা ছড়াল। কান্তি শশব্যস্তে বলল, ”বেচুদা জল খাবে?”
”দে।” চোখ বুজল বেচু। কি যেন ভাবছে। এক সময় চোখ খুলল। ”মহাদেবদার ওখানেই চলে যাব। মুশকিল হল সময় পাওয়া নিয়ে। এখানটা কাছে হয়, কারখানা থেকে ফেরার পথে নেমে প্র্যাকটিস করে যেতে পারি। এই সুবিধেটা তাহলে থাকবে না।”
”গোমসের ট্রেনিংটাও পাবে না।” জলের গ্লাস সামনে ধরে কান্তি বলল।
এক চুমুকে গ্লাস খালি করে বেচু মুখ বেঁকিয়ে বলল, ”রাখ তোর গোমস। ওই ট্যাসটা আমায় শেখাবে কি আর? এগার বছর হয়ে গেল আমার। ইন্ডিয়ার ফ্লাই ওয়েট রানার্স হয়েছি আট বছর আগে। ও ব্যাটা কখনো ন্যাশনালের ফাইনালে উঠেছে?”
”ওদের সময়ে ত ন্যাশনালই হয় নি।”
”তাই বলেছে বুঝি? পঞ্চাশ সালে ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে প্রথম ন্যাশনাল হয়েছিল। বোম্বের পিটার প্রিন্সের হাতে গোমস কি মারটা যে খেয়েছিল মহাদেবদার কাছে সে গপ্পো শুনিস। নক আউট হয়েছিল। তারপর আর ন্যাশনালে নামে নি। অ্যাকের নম্বরের গুলবাজ, খালি বড় বড় কথা আর—” বেচুর চোখ পড়ল শিবার উপর। ”তখন থেকে দেখছি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাই শুনছিস। তুই মেম্বার?”
