কাঠের মতো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সে ভাবে। রঞ্জুর ভাত খাওয়ার আনন্দকে নিজের আনন্দ করে নেবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে আবার গুলিয়ে ওঠে পাকস্থলীটা। মুখে জল জমে। সাবধানে মুখ থেকে ফেলে দেয় যাতে শব্দ না হয়। তারপর কান খাড়া করে থাকে, কখন মা ফিসফিসিয়ে বলবে, শিবু হাত বাড়া। সে তখন দ্রুত জানালার সামনে এসে হাত পাতবে। কাগজে কি শালপাতায় মোড়া একটা দলা চটপট তার হাতের উপরে এসে যাবে। বিদ্যুৎবেগে সে জানালা থেকে সরে গিয়ে পাঁচিল টপকে ছুটবে বাড়ির দিকে। দলাটা থেকে গরম ভাপ তখন তার হাত বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সে পথে কোথাও দাঁড়ায় না। দিলু আর নিলু ঘরের কাছাকাছিই এতক্ষণ অপেক্ষা করছে। তাকে দেখে হয়তো একজন চেঁচিয়ে উঠবে ‘মেজদা এসে গেছে।’ ঘরের মধ্যে ওরা তাকে ঘিরে উবু হয়ে বসবে। ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকবে তার হাতের দলাটার ওপর। ম্যাজিসিয়ান যেন টুপির মধ্য থেকে অবাক করা কিছু বার করছে এমন ভঙ্গিতে সে শালপাতা কিংবা কাগজের মোড়কটা খুলবে। একটু ভাত, লাল শাকের চচ্চচড়ি, বা চাপধরা সেদ্ধ ডাল—কিছু একটা বেরিয়ে আসে। দিলু বা নিলু, কেউ একজন, আওয়াজ করবে: ‘ই—ই—ই—ই’।
‘শিবা আছিস?’
চটকা ভেঙে সে তাড়াতাড়ি জানালাটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেদিন।
একটা ঠোঙার মতো জিনিস জানালার গরাদের মধ্যে দিয়ে মা এগিয়ে দেয়। সেটা হাতে নিতে নিতেই সে দেখতে পেয়েছিল রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গিন্নিমা একদৃষ্টে তাকিয়ে। তার বুকটা কেঁপে ওঠে। ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে পালাতে যাবে, আচমকা চুলের মুঠি ধরে হরিহর ‘অ্যাই’ বলে উঠল। এতক্ষণ নিশ্চয় ঘাপটি দিয়ে অপেক্ষা করছিল।
চুলের মুঠি ধরে হরিহর টানতে টানতে তাকে যখন ভিতরে আনল, তখন বাড়ির মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। ও দেখতে পেল গিন্নিমার পা জড়িয়ে ধরে মা কি একটা বলার চেষ্টা করছে। গিন্নিমা মাথা নাড়ছে। গিন্নিমা মাথা নাড়ছে। শুধু শুনতে পেল, ‘এগার বছর বয়স, বল কি, মনে হয় ষোল—সতের।’
‘না মা সত্যি বলছি। ওকে মারবেন না, বাচ্চচা ছেলে। আমারই দোষ, আমিই চুরি করে ওকে দিয়েছি, ওর কোনো দোষ নেই মা। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা মা। মাথার ঠিক থাকে না ছেলেগুলোর উপোসী মুখের দিকে তাকালে।’
এই সময় সে মায়ের চোখ দুটি দেখতে পেয়েছিল। ভয়, অসম্ভব রকমের একটা ভয় সেই চোখে। চাকরিটা চলে যাবে? ষোল বছরের বড়ছেলে নিতুর পঞ্চান্ন টাকার লোহার কারখানার চাকরির উপর পাঁচজনের সংসার ভর দিয়ে থাকা মানে একবেলা দু—মুঠো ভাতও নয়। হয়তো সেইজন্যই এই ভয়। কিংবা হয়তো এগার বছরের ছেলে হরিহরের হাতে মার খাবে বা তাকে পুলিশে দেবে, সেই জন্যও।
সে তার জীবনের প্রথম ভয়কে সেইদিনই দেখেছিল মা—র চোখে। তখন বয়স এগার। এবং প্রথম সে শুনল, তার শরীরের আকারটি বড়, অন্তত পাঁচটি বছরকে টপকে তার শরীর এগিয়ে রয়েছে। মায়ের সেই চাহনি হিমধরা একজোড়া লোহার শিকের মতো তার বুকে গেঁথে যায়। বুক থেকে সেটা আরো গভীরে, শিরা—উপশিরা দিয়ে তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। হরিহর একটা প্রচণ্ড থাপ্পড়ে তাকে যখন উঠোনে ফেলে দিয়েছিল, সে টের পায় নি। অসাড় হয়ে গেছল সর্বাঙ্গ। সে তখনই জেনে যায়, ভয় একটা অদ্ভুত জিনিস। ভয়ের মধ্যে ডুবে থাকার সময় খুব জোরে আঘাত এলে শরীর তা নিঃশব্দে নিয়ে নেয়।
এর কিছুদিন পরই বিয়েবাড়ির বাসি খাবার খেয়েছিল ওরা তিনজন। সকালে চাকরে ফেলে দিচ্ছিল। শিবাই চেয়ে এনেছিল, দিলু—নিলুকেও সে ভাগ দেয়। দুপুরে ওদের ভেদবমি শুরু হতেই সে ভয়ে সিঁটিয়ে গেছল। কাউকে বলতে পারে নি, পচা বাসি খাবার তারই আনা। ভয়ে। ওরা মারা গেল রাত্রে, বিনা চিকিৎসায়। কলেরাকে তার শরীর হজম করে নিয়েছিল।
তাহলে কি আজ সাধু আর দেবু আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল?
অনেকক্ষণ ছটফট করে শিবা উঠে বসল। ভ্যাপসা গুমোট গরম শুধু উনুনটার জন্যই নয়। তার মনের মধ্যে উত্তাপ। একটা অসম্ভব কাণ্ড সে করে ফেলেছে। জনে জনে তাকে বাহবা দিয়ে পিঠ চাপড়ে গেছে। একজন তাকে গেঞ্জি কিনে দেবে বলল, দর্জির দোকান বলল প্যান্ট বানিয়ে দেবে, ডাক্তারখানা বলল, ‘কাঁধে ব্যথা হলে আসিস,’ বটকেষ্ট বলল : ‘একটা ডিম সেদ্ধ করে খা,’ আর রাধেশ্যাম বলল, ‘ভগবান’! সারা, ব্যাপারটাই এখন তার কাছে অবাস্তব অসম্ভব অলীক মনে হচ্ছে।
ভবানী স্যারের সঙ্গে তারপর আর দেখা হয় নি। হাসপাতালে ওকে নিয়ে গেছে কব্জিটা দেখাবার জন্য, সম্ভবত ভেঙেছে। হঠাৎ শির শির করে উঠল শিবার সারা শরীর। সে কি পারবে ঐভাবে হাতটা তুলে বলতে : ভাঙো, হাত আমার দরকার নেই, এটা তুমি নিতে পার কিন্তু আমি স্কুলে যাবই।
শিবার ঘাড়ের কাছেই রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। মনের মধ্যে গুরগুর করে জমে উঠল অদ্ভুত একটা ভয়। অসম্ভব একটা সাহস চোখ মেলে দেখার ভয়। তার অভিজ্ঞতা বোধ—বুদ্ধি—অনুভূতির বাইরে থেকে আসা একটি শক্তি তাকে গ্রাস করেছে, সেটাই ভয় পাইয়ে তাকে মরীয়া করে দিয়েছিল। মায়ের ভীত চোখের চাহনি তৈরি করে দিয়েছিল তার শরীরকে মার নেবার জন্য, ভবানী স্যারের শান্ত সাহস তাকে এগিয়ে দেয় মার দেবার জন্য।
দুই
কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো মোটা ভারী পাশ বালিশের খোলের মতো থলিটা আকারে প্রায় একটা পাঁচ—ছ—বছরের ছেলে। একটি যুবক হাঁফাচ্ছে আর ফোঁস ফোঁস নিশ্বাসের শব্দের সঙ্গে থলিটায় ঘুসি মেরে চলেছে। শব্দ হচ্ছে ”ঢপ…ঢপ…ঢপ।” একটি ছেলে দু—হাতে থলিটা ধরে রেখেছে যাতে না দোলে।
