শিবার পিঠে কে টোকা দিল। সে চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল গ্যারেজে দুর্লভ চক্রবর্তীর পাশে নীল গেঞ্জি—পরা যার হাতে চায়ের গ্লাস তুলে দিয়েছিল, সেই লোকটি। ‘ইউ হ্যাভ এ বিউটিফুল লেফট হুক। কোন ক্লাবের ছেলে আছ? কে তোমার ট্রেনার?’
শিবা তেঁতুল গাছের নীচে দেবদাস পাঠক রোডের টিমটিমে ইলেকট্রিক বাতির আলোয় অবাক হয়ে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথার টান অবাঙালির মতো, কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে ওর কথাগুলোর কোনো মাথামুণ্ডুও সে বুঝতে পারছে না। ইংরেজিতে কি বলল? বিউটিফুল লেফট হুক কি জিনিস?
শিবা মাথা নাড়াল।
‘কখনো রিং—এ নামো নি?’
অসহায়ের মতো শিবা এধার—ওধার তাকাল। রিং কি জিনিস?
‘যখন লেফট হুকটা মারলে আমি এখান দিয়ে তখন যাচ্ছিলাম। টেরিবল। এ ডেডলি জেম অফ এ পাঞ্চ। কতদিন ট্রেনিং করছ?’
ট্রেনিং! এটা অবশ্য শিবার শোনা কথা। পাড়ায় যারা ফুটবল খেলে তাদের মুখে এই শব্দটা অনেকবার শুনেছে।
‘কিসের ট্রেনিং?’ শিবার পালটা প্রশ্ন।
‘বক্সিং? ইউ মাস্ট বী এ বক্সার। তুমি বক্সিং কর?’
‘না।’
‘মাই গড!’
লোকটি কয়েক সেকেন্ড শিবার মুখে চোখ রেখে ধীরে ধীরে বলল, ‘আমার নাম ফ্র্যাঙ্ক গোমস। তোমাদের এই দুর্লভ আমার দোস্ত। আমি একজন বক্সিং ট্রেনার, একসময় মিলিটারিতে ছিলুম, রেলে ছিলুম। রিটায়ার করে পুরনো মোটর কেনাবেচার ব্যবসা করি। আমার চেনা জিমন্যাসিয়াম আছে লালবাগানে। তুমি এস, আমি তোমাকে শেখাব।’
শিবা ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল।
‘দুর্লভ আমার জিম কোথায় জানে। চলে এস। পয়সা লাগবে না।’
গোমস চলে যাবার জন্য দু—পা এগিয়ে আবার দাঁড়াল।
‘তোমার নাম কি?’
‘শ্রী শিবাজী আইচ।’
‘বয়স কত?’
‘সতের।’
‘হোয়াট? ওনলি সেভেনটিন!’
‘হ্যাঁ।’
ফ্র্যাঙ্ক কাছে এসে তীক্ষ্ন চোখে শিবার দিকে তাকাল।
‘তুমি বড় আছ, স্ট্রং আছ, ফাস্ট আছ। কারেজিয়াস আছ। ভাল ফাইটার হবে। ইউ আর এ বিগ বয়….ভেরি ভেরি বিগ। তোমায় দেখলে মনেই হয় না সতের, বাট আই বিলিভ ইটস সো।’
গভীর রাতে চায়ের দোকানের বেঞ্চে শুয়ে বিনিদ্র শিবার চোখের উপর এলোমেলো হয়ে যখন সন্ধ্যার ঘটনাগুলো ভেসে উঠছিল তখন মনে পড়ল ওই কালো—সাহেবটার কথা : তোমায় দেখলে মনেই হয় না সতের। আশ্চর্য। সবাই এইভাবেই বলে। যে তার বয়স শোনে অবিশ্বাস করে। প্রথম সে যেদিন জানতে পারে তার বয়স আর শরীরের মধ্যে বিস্তর গরমিল সেই দিনটার কথা কোনোদিনই সে ভুলতে পারবে না।
বহুদিন তার মনে পড়েছে মায়ের তখনকার দু—চোখের চাহনিটা। আজ এই গভীর রাতে আবার সেই দিনটা হানা দিল তার স্মৃতিতে।
সন্তর্পণে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে বাইরের দালানের দিকে একবার তাকিয়েই, মা সেদিন ফিসফিস করে বলেছিল : ”শিবা হাত বাড়া।”
রান্নাঘরের জানালাটা উনুনের ঠিক পিছনে। জানালার বাইরেই আবর্জনার স্তূপ আর কাঁচা নর্দমা। শিবা সেখানে দাঁড়িয়েছিল চুপিসাড়ে দেওয়াল ঘেঁষে। মুখুজ্জেবাবুদের বিরাট পুরানো বাড়ি। এখানে তার মা রাঁধুনির কাজ করে। সামনে ফটক। পাঁচিলে ঘেরা বাগান, ঝোপ—ঝাড়ে ভরা। পাঁচিলের অধিকাংশই ধসে পড়েছে। তাতে সুবিধাই হয়েছে শিবার। ফটক দিয়ে ঢুকলে কারুর চোখে পড়ে যেতে পারে। বাগানের পিছনের দিকে রান্নাঘরের কাছাকাছি পাঁচিলের একটা ভাঙা জায়গা সে বেছে নিয়েছে। প্রতিদিন এই সময়ে সে পাঁচিল টপকে ঢোকে। নর্দমা আর দেয়ালের মাঝে এক বিঘৎ প্যাচপ্যাচে কাদা জায়গা। সেখানে পা জোড়া করে জানালাটার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কোনো কোনোদিন আধ ঘণ্টাও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যদি রান্নাঘরে বাড়ির গিন্নিমা কিংবা চাকর হরিহর হাজির থাকে। কাদায় পায়ের আঙুল ডুবিয়ে কাঠের মতন যখন সে অপেক্ষা করে তখন রান্নাঘর থেকে চমৎকার গন্ধ ভেসে আসে।
মায়ের রান্না সত্যিই দারুণ। গন্ধটা বুকের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে রাখার চেষ্টা করতে করতে মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। খালি পেটে মোচড় দিয়ে একটা ব্যথা তৈরি হয়। বুক থেকে গন্ধটা পেটের দিকে নামাবার জন্য সে বারবার ঢোঁক গেলে আর বড় বড় নিঃশ্বাস নেয়। কোনো কোনোদিন সে ফুটন্ত ঝোল বা ডালের বগবগ শব্দও পায়। বিরাট কড়া, আঠার জনের রান্না হয় ওটায়। মা নামাতে পারে না, হরিহর কড়া নামিয়ে দেয়। যখন ফোটে গন্ধটা ভসভসিয়ে জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসে। একটা বড় থালা দিয়ে কড়াইটা যখন মা চাপা দিয়ে দেয়, গন্ধটা কমে যায়। অনেকদিন ওর মনে হয়েছে, মাকে বারণ করে দেবে কড়াইটা ঢেকে না দিতে। লজ্জায় বলতে পারে নি। শব্দ শুনে সে বলে দিতে পারে এখন অম্বল, ঝোল, না ডাল, কি রান্না হচ্ছে।
এই সময় সে মনে মনে দেখতে পায় বাবুদের বাড়ির ছেলেরা সার দিয়ে বসে খাচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে তারই সমবয়সী রঞ্জু। লাল একটি চামড়ার বইয়ের ব্যাগ নিয়ে সাইকেল রিক্সায় হরিহরের পাশে বসে স্কুলে যায়। সাদা জামা, সাদা প্যান্ট, সাদা মোজা সবই ধবধবে—ওর গায়ের রঙের মতো। রঞ্জুকে দেখে তার গর্ব হয়। মা ওদের বাড়িতেই ত কাজ করে। সে রিক্সার কাছাকাছি এসে তাকিয়ে থাকে। রঞ্জু কিন্তু তাকে চেনে না। সেই রঞ্জু মায়ের তৈরি রান্না খাচ্ছে। ভাত দিয়ে ডাল মেখে এক একটা গ্রাস মুখে দিচ্ছে। চিবোচ্ছে আর হয়তো মাথা নাড়ছে। ভাত খাবার সময় আনন্দ হবেই। তারপর একটুখানি বেগুন কিংবা আলু ভাজা মুখে দিল। তারপর মাছের ঝোল। তাতে কাঁচকলা, আলু, বেগুন এইসব। ভাবতে ভাবতে ওর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। কি সুন্দর দেখতে লাগে কেউ যখন পেট ভরে ভাত খায়।
