শিবার মাথার মধ্যে এখন কিছু নেই। একদম খালি। বাতাস ছাড়া ভারী আর কোনো জিনিস নেই। ঘরের মেঝেয় তিনটি দেহ। ভবানী স্যার কুঁজো হয়ে বসে, দেবু দেয়ালে ঠেস দিয়ে নেতিয়ে আছে ; সাধু মেঝেয় দু—হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ঘরের এক কোণে ছোরা, অন্য দিকে ব্যাটনটা পড়ে। শিবা বুঝতেই পারছে না গত দু—মিনিটের মধ্যে প্রায় নিঃশব্দে এখানে কি ঘটে গেল! কি ভাবে ঘটল, কে ঘটাল, কেন ঘটাল? তার শূন্য মাথার মধ্যে এখন শুধু সোঁ সোঁ বাতাসের শব্দ।
‘হারামজাদা, কখন থেকে ডেকে ডেকে মরছি আর তুই—।’
চেঁচাতে চেঁচাতে বটকেষ্ট রাস্তা থেকে এগিয়ে আসছিল। ঘরের দরজা দিয়ে ভিতরে চোখ পড়তেই চমকে তার জিভটা অবশ হয়ে গেল। সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে অবশেষে শিবার ভয়ঙ্কর মুখ ও ভঙ্গিটা অবাক হয়ে দেখতে দেখতে বটকেষ্ট এক—পা এক—পা করে পিছিয়ে গিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘এসব কি! য়্যাঁ, এমন কাণ্ড হল কি করে….য়্যাঁ কে করল রে শিবা, তুই?’
শিবা কথা না বলে দুটো হাত মুঠো করে চোখ ঢাকল শুধু। বটকেষ্টর চোয়াল তার ফলে বিস্ময়ে দু—ইঞ্চি ঝুলে পড়ল এবং দেবদাস পাঠক রোডকে সন্ত্রস্ত করে তারপর চীৎকার করল—’সব্বোনাশ হয়েছে গো। এবার আমরা মারা পড়ব, আর আমাদের রক্ষে নেই। শিবাটা সব্বোনাশ করেছে।’
এতক্ষণ যে চাপা কৌতূহল আর উত্তেজনাটা আশপাশের দোকানে, রাস্তায় বসা ফিরিওয়ালা, রিক্সাওয়ালাদের মধ্যে থম থম করছিল, নিমেষে তা খান খান হয়ে গেল। ছুটতে ছুটতে ওরা এল ভবানী স্যারের কোচিং—এর দরজায়। ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন সুপ্রভা—স্যারের স্ত্রী। রান্না করতে করতে তিনি কয়েক মিনিটের ব্যাপারটার কিছুই টের পান নি।
‘কি হল বটকেষ্ট, চেঁচাচ্চেচা কেন গো?’
‘বটদা কিসের, সব্বোনাশ?’
‘বটুবাবু কে মারা গেল?’
‘ওগো আমি কোথায় যাব গো।’
সব শেষে হাউ হাউ করে উঠলেন সুপ্রভা। জোড়া জোড়া চোখ ঘরের মধ্যে অবিশ্বাস্য দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে। সাধু উঠে দাঁড়িয়েছে। একটা হাত বাঁ কানের নীচে চোয়ালের উপর বুলিয়ে সে কাতরে উঠল। বিড়বিড় করে গালাগাল দিয়ে এগিয়ে এসে পা দিয়ে দেবুর মাথায় ঠোক্কর দিল। মাথাটা নড় নড় করল কাঁদিতে ঝোলা ডাবের মতো।
কে একজন ফিসফিস করল, ‘দুটোকে দেখছি মেরে পাট করে দিয়েছে।’
‘শিবা!’
‘শিবা করেছে?’
‘আমাদের শিবা?’
‘হ্যাঁ গো চায়ের দোকানের শিবা।’
সব চোখ শিবার উপর এসে পড়ল। এখনো একটু কুঁজো ওর কাঁধ দুটো। হাত দুটো মুঠো করা। ওৎ পাতা বাঘের মতো শিবা লক্ষ্য করে যাচ্ছে সাধুকে।
দু—হাতে দেবুকে বসিয়ে সাধু কথা বলতে গিয়ে ”উঃ” বলে গাল চেপে ধরল। তারপর ইশারায় জানাল, সাইকেল রিক্সা চাই।
ভিড়ের মধ্য দিয়ে রাধেশ্যাম এগিয়ে এল। বোতাম ছেঁড়া শার্টের ফাঁকে জিরজিরে বুকটা চিতিয়ে তুলে ধরে দুটো হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চীৎকার করল, ‘ভগমান আছে অহনো, ভগমান আছে অহনো, দীন—দুঃখীর ডাকে অহনো সাড়া দেন। আমার পোলাপানগুলার সেই শুকনো মুখে, অহন আমি হাসি দেইখত্যাছি। শিবা রে, ভগমান তোর রূপ লইয়্যা দেখা দিছে রে।’
বলতে বলতে রাধেশ্যামের গালের কুঞ্চিত শুকনো চামড়ার উপর দিয়ে জল ঝরতে শুরু করল। ঢ্যাঙা, লিকলিকে, বছর ষোল বয়সী ননী রাধেশ্যামের হাত ধরে শান্ত স্বরে বলল, ‘বাবা তুমি যাও। রিক্সায় আমি এই দুটারে পৌঁছায়ে দেব।’ তারপর সে আরও ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘দুটারে রিক্সায় বসায়ে সোজা রিক্সাটারে বনোয়ারির গর্তের মধ্যে নিয়ে ফ্যালাবো।’ বনোয়ারি সাউয়ের তেরটি গরু—মোষের খাটালের গায়ে চার হাত গভীর ডোবার মতো একটি গর্ত আছে। সেখানে গোবর জমানো হয় মাসে একদিন বিক্রির জন্য।
ইতিমধ্যে ভবানী স্যার উঠে দাঁড়িয়েছেন। সুপ্রভা তার দুটো কাঁধ ধরে বারবার ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে চলেছেন—’হয়েছে কি, বল না? ঘরে এসব কি কাণ্ড? কি হয়েছে?’
ভবানী স্যার ডানহাতটা তুলতে গিয়েও পারলেন না। তারপর মৃদু হেসে সাধুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বোধ হয় ভেঙেছে। কিন্তু একটা জিনিস তুমি বোধ হয় স্বীকার করবে, আমার আত্মা মোটেই বলে নি হাতটাকে আস্ত রাখার জন্য তোমার কাছে নত হতে। সে বলেছিল যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠতে। আমি তা পেরেছি।’ বলতে বলতে ওর সারা মুখ হাসিতে ভরে গেল।
সাধু কিছুক্ষণ স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে দিয়ে দরজার দিকে এগতেই চার পাঁচজন দরজা জুড়ে দাঁড়াল।
‘আজ তোমার গুণ্ডামি চিরকালের মতো ঘোচাব’, একজন বলল মেঝে থেকে ব্যাটনটা তুলে নিয়ে।
‘অনেক উৎপাত সহ্য করেছে এলাকার মানুষ। এবার পিটিয়ে লাস করব।’
কাতরাতে কাতরাতে উঠে বসেছে দেবু। সাধু ওর দিকে একবার তাকিয়ে, হাতজোড় করে কি বলতে গিয়ে চোয়ালে হাত দিয়ে কাতরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়ে ঠোঁটজোড়া অল্প ফাঁক করে, চোয়াল যতটা সম্ভব কম নাড়িয়ে ধীরে ধীরে বলল, ‘এ পাড়ায় আর কখনো আসব না। এ পাড়ার লোকের সঙ্গে কোনোদিন আর হুজ্জত হবে না।’
তখনো কেউ বুঝতে পারে নি সাধুর চোয়াল ভেঙে গেছে।
ভীড় ঠেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল শিবা। কোনো নিরালা জায়গায় গিয়ে সে এখন চুপ করে বসে থাকতে চায়। কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না, দুটো ভয়ঙ্কর লোককে সে মাত্র কয়েকটা ঘুসিতেই ধ্বংস করে ফেলল কিভাবে! কি করে সে ঘুসিগুলো চালাল! কোনোদিন ত ঘুসি মারতে শেখে নি। কোনোদিন সে মারপিট করে নি। সাধুর কথাবার্তা, স্যারের হাত মুচড়ে ধরা, এসব হয়তো তাকে উত্তেজিত করেছিল। তার থেকেও বেশি, স্যারের অবিচল ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দেওয়া আর ‘নুইব না…নুইব না’ শব্দগুলো তাকে যেন অন্য এক জগতের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টেনে নিয়ে গেছল। সেখানে গিয়ে সে জানতে পারে তার মধ্যে সাহস আছে, তার দেহে শক্তি আছে। কাউকে সে ভয় পায় না, কেননা হারাবার মতো তার কিছুই নেই, একমাত্র নিজের প্রাণটা ছাড়া।
