ছোটখাটো রোগা ভবানী স্যার ডান হাতটা বাড়িয়ে, মুখে পাতলা হাসি। পুরু লেন্সটায় ইলেকট্রিক আলো, বরফ কুচির উপর সূর্যরশ্মির মতো ঝকঝক করছে।
‘হাত আমার দরকার নেই, এটা তুমি নিতে পার কিন্তু স্কুলে আমি যাবই।’
‘যাবেনই।’
‘হ্যাঁ।’
কোনো দ্বিধা নেই একফোঁটা শব্দটিতে। স্বচ্ছ স্বাভাবিক অনুত্তেজিত। বাড়ানো হাতটা আর একটু তুলে বিবেকানন্দর ছবিটার দিকে নিবদ্ধ করলেন।
‘ওই মানুষটি একটা কথা বলেছেন।’
সাধু চোখ তুলল ছবির দিকে।
‘বলেছেন, সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনো কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।’
হাতটা নামিয়ে ভবানী স্যার হাসলেন।
‘পরীক্ষার কটা দিন আমি স্কুলে যাব। অন্যায় হচ্ছে দেখলে বাধা দেব।’
সাধু এক পা এগিয়ে ভবানী স্যারের ডান হাতটা মুঠোয় ধরল। শিবা দেখল, সাধুর হাতটার যাবতীয় পেশী দপ করে লাফিয়েই পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। স্যারের মুখের হাসিটা ক্রমশ মিলিয়ে যন্ত্রণার কুঞ্চন একবার ফুটে উঠেই স্বাভাবিক হয়ে গেল। সাধু স্থির দৃষ্টিতে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে, শরীরের সব রক্ত মুখে জমা হয়ে টকটকে দেখাচ্ছে। কপালে বিন্দু—বিন্দু ঘাম। চোয়াল এবং সারা বাহুর পেশীগুলো কঠিন থেকে আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
ভবানী স্যারের মাথাটি এবার ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে পড়ছে। ঠোঁট দুটি ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। শরীরটা থরথর কাঁপতে কাঁপতে কুঁজো হয়ে গেল।
‘আহ, আহ…..আমি নুইব না, নুইব না। ওহ…ওঃ।’
এরপর শিবা নিজেও জানে না কখন সে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাধু দ্রুত মুখটা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। তখনো মুঠোর মধ্যে ভবানী স্যারের কব্জিটা ধরা।
‘ছেড়ে দাও স্যারকে।’
‘তুই কে রে?’
শিবার ঘাড়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠেছে! একটা বাঘ যেন তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরটা চাটছে। আর ক্রমশ সে নিজেই বাঘ হয়ে যাচ্ছে। মাথার মধ্যে গরগর করছে খ্যাপানো রাগ। দমকে দমকে সেই রাগটা তাকে ফুলিয়ে, প্রচণ্ড বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিল। দ্রুত এগিয়ে সে সাধুর ঘাড়টা পাঁচ আঙুলে চেপে ধরেই টান দিয়ে ঘুরিয়ে দিল। সাধু কোনোক্রমে টাল সামলাল। ওর সঙ্গী দেবুর হাতে ততক্ষণে একটা ছোরা ঝলসে উঠেছে। বাঁ হাত দিয়ে ডান কব্জিটা ধরে স্যার উবু বসে পড়ছেন।
ছোরা ধরা হাতটা সাপের ফণার মতো দোলাতে দোলাতে দেবু এক—পা দু—পা এগল। শিবা একদৃষ্টে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে। এক—পা দু—পা পিছিয়ে গিয়ে শিবা দেয়ালে বাধা পেল। আর তার পিছু হটার উপায় নেই। ডাইনে দেওয়াল। বাঁয়ে খোলা দরজা। ছুটে পালানো যায়। পালাবে? তার মাথার মধ্যে শুধু একটা কথাই ঝিমঝিম করে বাজছে—’বাঁচতে হবে, বাঁচতে হবে।’ এবং হঠাৎ ওর মনে হল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে বাঁচা যাবে না, কিছু একটা করতেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে ওর মন থেকে একটা সংকেত বিদ্যুৎগতিতে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। ‘বাঁচব, বাঁচব, বাঁচতে হবেই।’
এইবার সে পরিষ্কার দেখতে পেল ছোরাটা তার তলপেট লক্ষ্য করে আসছে। ছ—ইঞ্চি একটা শীতল ইস্পাতের ফলা এগিয়ে আসছে, আসছে, আসছে—এক সেকেন্ডও নয়, সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় নিল এক গজ বাতাস কেটে ছোরাটা এগিয়ে আসতে। শিবা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় নিল না ছোরাটার পথ থেকে একবিঘৎ সরে যেতে।
ঝোঁক সামলাতে না পেরে বেটাল দেবুর মুখটা শিবার কাঁধের কাছে এগিয়ে এল। তখুনি শিবার স্নায়ুকেন্দ্র থেকে একটা খবর ওর বাঁ হাতে পৌঁছে গেল—মারো। দেবুর বুক আর পেট ওর বাঁ হাতের সব থেকে কাছের বস্তু, মাত্র এক ফুট দূরে। কনুইটা সামান্য পিছনে টেনে প্রায় এক হাত দূরত্ব তৈরি করে নিয়ে পলকে সে দেবুর পেট লক্ষ্য করে বাঁ হাতের মুঠোটাকে স্প্রিং—এর মতো ছেড়ে দিল।
‘ঢপ’। একটা শব্দ। প্রায় একই সময়ে শিবার ডান হাতের মুঠো নীচে থেকে উপরে উঠল দেবুর থুতনি লক্ষ্য করে।
মেঝে থেকে আধ হাত শূন্যে উঠে দেবু দেয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়ল। তারপর দেয়ালে পিঠ লাগানো অবস্থায় খালি বস্তার মতো ঝরে পড়ল মেঝেয়। ঠোঁটের কষ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।
অবাক হয়ে সাধু এতক্ষণ দেখছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কাণ্ডটা ঘটেছে। এইবার সে দু—হাত ছড়িয়ে একটা খ্যাপা গোরিলার মতো এগিয়ে গেল শিবার দিকে। এক—পা পিছিয়ে গিয়ে সরে যাবার জন্য শিবা জলপোকার মতো নড়াচড়া করল ডাইনে—বাঁয়ে। ঘরে আর জায়গা নেই। সাধুর হাত দুটো থামের মতো উঁচু হয়ে সজোরে নেমে এল শিবার দুই কাঁধের দিকে। সে বিদ্যুৎগতিতে হাঁটু ভেঙে শরীরটা নিচু করে ধাক্কাটা কমিয়ে নিল এবং একই ঝোঁকে পাশে সরে গেল। তার বাঁ কাঁধটা এড়াতে পারে নি সাধুর ডান হাতের হাতুড়ি। অসাড় হয়ে আসছে। সাধু আবার জোড়া হাত তুলেছে।
‘মারো’। —নিমেষে সঙ্কেতটা ওর ডান হাতে পৌঁছানো মাত্র ঘুসিটা বেরিয়ে এসে সাধুর বাঁ কানের নীচে চোয়ালে আঘাত করল। পাটকাঠি ভাঙার মতো মড়াৎ একটা শব্দ হল। সাধুর চোখ দুটো কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে হয়তো বিস্ময়ে কিংবা আঘাতের ধাক্কায়। তার উত্তোলিত হাতদুটো আস্তে আস্তে নীচে নেমে এল। পাঁজরের দু—ধারে দু—হাতে পরপর দুটো ঘুসি শিবা বসিয়ে দিয়েছে। ‘ঢপ….ঢপ’ দুটো শব্দ হল। সাধু দু—হাতে বুকের দু—পাশ চেপে ধরল। হাঁটু দুটো থরথর কাঁপছে। ধীরে ধীরে হাঁটু দুমড়ে সে বসে পড়ল।
