যে লোকটি ব্রেক শু্য নিয়ে ব্যস্ত, সেও বলল, ‘আমারটাও নিয়ে যা।’
শিবা গ্লাস দুটি নিয়ে দোকানে ফিরে এসে দেখল সাধু এবং তার সঙ্গীটি নেই। কি যেন তার মনে হল, ভবানী স্যারের কোচিং—এর দিকে তাকিয়ে রাস্তায় বা দরজার সামনে কাউকে সে দেখতে পেল না। তাহলে ওরা গেল কোথায়? কোচিং—এর ভিতর ঢুকেছে। কিন্তু শচীন বা বটকেষ্টর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করতে ভরসা পেল না।
চা আবার গরম করে গ্যারেজে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় শিবার মনে হল কোচিংটা একবার ঘুরে দেখে আসা যাক।
দরজার পাশে ঘরটার দক্ষিণে পাকা নর্দমার ধারে জানালাটায় শিবা এসে দাঁড়াল। জানালার একটা পাল্লা এমনভাবে ভেজানো যে এখান থেকে ঘরের একটা কোণ শুধু দেখা যায়। সেটা খুলে দিতে তার সাহস হল না। সে দেখতে পেল পাঁচজন ছাত্র দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। প্রত্যেকের শরীর কাঠের মতো নিস্পন্দ। কেউ নড়ছে না, শুধু সামনে তাকিয়ে। চোখের পাতা নড়ছে না। ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটিও। পেন্সিল দাঁতে কামড়াচ্ছে, মুখের চামড়ার নীচে রক্ত নেই, শরীরটা থর থর করছে।
ভয় ভয় ভয়। প্রত্যেকের চোখের মধ্যে যেন একটা করে জুজু ঢুকে রয়েছে। শিবা ওদের কারুরই নাম জানে না। এই মুহূর্তে তার মনে হল, সে শ্মশানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘরের আর এক কোণে, জানালার পাশেই সে একটি কণ্ঠস্বর শুনল, ধীর মৃদু স্বরের।
‘যদি হাতটা ভেঙে দি।’
শান্ত, স্বাভাবিক, উচ্চচারণ একটু টেনে টেনে। শিবার মনে হল সাধুর গলা।
‘কি, কথা নেই কেন মুখে? হাতটা যদি মুচড়ে ভেঙে দি তাহলে অঙ্ক কষাবেন কি করে?’
‘বাঁ হাত দিয়ে।’
‘ওরে বাপ্পস! দেবু শুনলি?’
বাঁ হাতটাও তাহলে ভেঙে দাও, গুরু।’
‘ভাঙাভাঙির দরকার হবে না। শুনুন পরীক্ষার কটা দিন আপনি স্কুলে যাবেন না। চুপটি করে এই ঘরে যত খুশি অঙ্ক কষান, কিন্তু স্কুলে যাবেন না।’
‘তার মানে অন্যায়ের কাছে আমাকে মাথা নোয়াতে হবে, অধর্ম আমাকে মেনে নিতে হবে?’
ভবানী স্যারের গলা, গম্ভীর অনুত্তেজিত, অদ্ভুত রকমের কঠিন। শিবার হাত—পা শক্ত হয়ে উঠল উত্তেজনায়। পাঁচটি ছেলে আর একটি মেয়ে একইভাবে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে।
‘অত শত জানি না। মোট কথা যা বললুম তাই করবেন। বাড়ির বাইরে যাবেন না। পরীক্ষা হয়ে গেলে চুটিয়ে তখন মাস্টারি করবেন। কাল আপনি তিনটে ছেলের ক্ষতি করতে গেছলেন, অবশ্য ম্যানেজ করে নিয়েছি।’
‘আমি সত্যিই দুঃখিত যে ওদের ক্ষতি করতে পারি নি। একটা কথা শুনে রাখ, হাতই ভাঙো আর পা—ই ভাঙো, অন্যায়ের প্রশ্রয় আমি দেব না। আমার হাতের থেকেও বড় ব্যাপার এই ছেলেদের চরিত্র, তাদের ভবিষ্যৎ। সেটা আমাকে বাঁচাতেই হবে। এভাবে পরীক্ষায় পাশ করেও, জীবনের পরীক্ষায় ত এরা বরাবরই ফেল করবে। ঘুণ ধরে ঝাঁঝরা হওয়া মানুষ, কি পরিবারের কি সমাজের কোনো দায়িত্বই নিতে পারবে না, ভেঙে পড়বেই।’
‘এসব আদর্শ—ফাদর্শর কথা থাক। পাস করলে চাকরি জুটবে, পরিবারকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচাতে পারবে। এটাই সব থেকে জরুরি।’
‘না না পারবে না। মানুষ শুধু খাওয়া—পরাতেই বাঁচে না। তার আত্মা আছে।’
‘গুরু, কথাবার্তা একটু কি বেশি হয়ে যাচ্ছে না?’
‘থাম। আমাকে আত্মা দেখাচ্ছে। আমারও ত তাহলে আত্মা আছে, কী জবাব দিন?’
সাধু বুকে হাত দিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াতেই শিবা ওকে দেখতে পেল। সাধুর সুন্দর মুখের পেশিগুলো কোঁকড়ানো, চোখ দুটো জ্বলজ্বলে, দেহটা ঈষৎ ঝোঁকানো। বাঁ হাতের ব্যাটনটা দিয়ে সে সামনে কাউকে খোঁচা মারল।
‘আমারও তাহলে আত্মা আছে। আমি বলছি আছে। এই ছেলেগুলোরও আছে। দেখবেন?’
সাধু তালুর উলটো পিঠ দিয়ে হঠাৎ একটি ছাত্রের গালে চড় মারল। ছেলেটি ‘আঃ’ শব্দ করেই গাল চেপে ধরে ফ্যালফ্যালিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। বিশ্বাস করতে পারছে না এভাবে একটা আঘাত পাবে। হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেল। সাধু হাসতে শুরু করল।
‘ওর আত্মা বলল, পালাও। তাই পালিয়ে গেল।’
সাধু আর একটি ছেলের সামনে দাঁড়াল। ডান হাতটা ধীরে ধীরে তুলতে শুরু করতেই, দু—হাতে মুখ ঢেকে ছেলেটি ফুঁপিয়ে উঠল।
‘এর আত্মা বলছে কাঁদো।’
সাধু ফিরে দাঁড়িয়ে ঘরের কোণের দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘এই হচ্ছে আত্মা। শরীরের জন্যই আত্মা। এই এলাকার সব আত্মা সুখের জন্য, সুবিধার জন্য আমাকে তোয়াজ করে, ভয় পায়, পায়ে এসে পড়ে।’ তারপর দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে চারটি ছেলে ও মেয়েটিকে মৃদুস্বরে বলল, ‘বাড়ি যাও।’
মেঝে থেকে বই—খাতা তুলে নিয়ে ওরা কাঠের পুতুলের মতই, ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেই হন হন করে এগিয়ে গেল বি টি রোডের দিকে। ওদের মধ্যে মেয়েটিই একবার থমকে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকিয়েছিল মাত্র।
সাধু পা পা এগিয়ে গেল ঘরের কোণের দিকে। সারা মুখ হাসিতে ভরা। হাসলে ওকে দেবতার মতো দেখায়।
‘আমার আত্মা বলছে রোজগার করে বাঁচতে হবে, আপনার আত্মা বলছে হাত দুটো আস্ত রাখতে হবে। দুটোই সম্ভব। ঠিক কিনা?’
চায়ের দোকান থেকে বটকেষ্টর চীৎকার শিবা শুনতে পাচ্ছে। তার নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু এখানে ঘরের মধ্যে যে অসম্ভব একটা ব্যাপার ঘটে চলেছে, সেটা ফেলে যাওয়ার সাধ্যিও তার নেই। বটকেষ্ট চীৎকার করতে থাকুক। জানালার কিনারে চোখ রেখে শিবা ঘরের অপর কোণটি দেখার চেষ্টা করল।
