গ্লাসটা নিয়ে দোকানে আসতেই খিঁচিয়ে উঠল বটকেষ্ট।
‘অ্যাতক্ষণ কি তুইও মাস্টারের কাছে অঙ্ক পড়ছিলি নাকি। খদ্দের এসে কি বসে থাকবে তোর জন্য? তিন কাপ চেয়ে গেছে গ্যারেজে। বাইরে গেলে আর ফেরার নাম করে না। নিজে হাতে চা দেব বলে কি লোক রেখেছি?’
বটকেষ্ট গজগজ করে যাচ্ছে। শিবার চোখ তখন টেবিলে বসা দুটি লোকের দিকে। বি টি রোডের ওপারে দুই বাস স্টপ দূরে মিলনপল্লীতে থাকে ওরা। শিবা ওদের একজনকে শুধু জানে, সাধন। সবাই ডাকে সাধু। দলবল নিয়ে ছিনতাই ওর পেশা। বোমা, ছোরা, পাইপগান, জামা—প্যান্ট খোলা ও পরার মতো স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করে। কন্ট্রাক্ট নিয়ে দাঙ্গা বাধায়, ভাড়াটে তোলে, পরীক্ষায় টোকার ব্যবস্থা করে দেয়।
নির্মম নিষ্ঠুর ওর আচরণ। ওকে দেখলেই গৃহস্থরা সিঁটিয়ে তফাতে সরে যায়। সাধু রেস্তোরাঁয় খাবে, লন্ড্রিতে কাপড় কাচাবে, রিক্সায় চড়বে, দোকান থেকে সিগারেট নেবে বিনা পয়সায়। একবার প্রতিবাদ করেছিল রিক্সাওয়ালা রাধেশ্যাম। রাস্তার উপরই বহুলোকের সামনে সাধুর দলের ছেলেরা রিক্সার একটি চাকা খুলে নিয়ে যায়। বাধা দিতে কেউই এগিয়ে আসে নি। না দেখার ভান করে তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠে অনাবশ্যক কাজে। কেউ কেউ রাধেশ্যামের বোকামির জন্য ক্ষুব্ধও হয়। পনেরো টাকা জরিমানা দিয়ে রাধেশ্যাম চাকাটি ফেরত পায়। সেজন্য সাতদিন সে পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করেছে, আর সেই কটা দিন তার আধপেটার সংসারটিকে সিকিপেটা থাকতে হয়েছে।
সাধুর কালীপুজোয় প্রত্যেক গৃহস্থ, দোকানি, ফেরিওয়ালা, ব্যবসায়ীর জন্য চাঁদা ধরা আছে। বিনা প্রতিবাদে তারা চাঁদা দিয়ে দেয়। একশ টাকা লিখে বিলটা ওরা সামনে ছুঁড়ে দিতেই মিষ্টির দোকানের তারাদাস বিনীত আপত্তি করেছিল। তাকে দেড়শ টাকা খরচ করে ভাঙা শো—কেসের কাচ বদলাতে হয়। রাস্তার বাজারে ডিম নিয়ে বসে বৃদ্ধ গায়েবুল্লা। তার বরাদ্দ দু—টাকা চাঁদা সে দিতে পারে নি। সাধুর ছেলেরা গুটি দশেক ডিম ঝুড়ি থেকে তুলে নেয়। হাত জোড় করে গায়েবুল্লা উঠে দাঁড়াতেই সাধুর হাতের মোটা বেতের ব্যাটনটি খট করে বৃদ্ধের মুখের ওপর পড়ে। মুখ চেপে গায়েবুল্লা যখন বসে পড়ছে, সাধু ধীরকণ্ঠে তার ছেলেদের একজনকে নির্দেশ দেয়, ‘রোজ দুটো ডিম এর কাছ থেকে নিবি, একবছর।’ গায়েবুল্লা সেদিনের পর থেকেই ডান চোখে ঝাপসা দেখছে। সম্ভবত কানা হয়ে যাবে।
শুধু শিবা কেন, এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই এইসব কাহিনী শুনেছে। দিনে দিনে সেগুলি ভয়ের দ্বারা রঞ্জিত হয়ে অতিকায় বীভৎস রূপ নিলেও ঘটনাগুলি অনেকটাই সত্য। সেই ভয়ঙ্কর সাধু এখন দোকানে বসে চা খাচ্ছে। টেবলের উপর তার নিত্য সাথী ব্যাটনটি। সাধু রীতিমতো বেঁটে, সাড়ে পাঁচ ফুটেরও নীচে। কলেজে পড়েছে। ছাত্রনেতা হয়েছিল। একসময় ও বডিবিল্ডার হবার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করে তাল তাল পেশী সংগ্রহ করেছিল। অজগরের মতো পেশীগুলো ওর সারা দেহকে জড়িয়ে সব সময়ই যেন ফুঁসছে। ওর প্রতিটি গতিবিধির সঙ্গে সেগুলো নাড়াচাড়া করে। তাকিয়ে মুগ্ধ হতে হবেই। সাধুর গায়ের রং বাদামি, মাথার চুল ঝাঁকড়া সেকেলে ডাকাতদের মতো বাবরি করা। সব থেকে বেমানান ওর মুখটি। গ্রীক দেবতার মতো মুখের ছাঁচ। নিষ্পাপ শিশুর মতো সরল শান্ত, চাহনি। সাধু কখনো হাসে না এবং ওর ডান পা জন্ম থেকেই একটু ছোট। দোকানে যে কজন খদ্দের এই সময় নিয়মিত আড্ডা দেয়, তারা নিঃসাড়ে উঠে গেছে। বটকেষ্ট অত্যধিক ভয় পাওয়ার জন্যই বোধ হয় অত্যধিক স্বাভাবিক হবার চেষ্টায়, অর্থাৎ খাতা খুলে ঘাড় নিচু করে যোগ—বিয়োগে ব্যস্ত। সামনের দোকানগুলো থেকে জোড়া জোড়া চোখ তাকিয়ে রয়েছে। সাধু এই পাড়ায় আগে কখনো আসে নি। তাই আতঙ্কে ছমছম করছে দেবদাস পাঠক রোড। শিবার বুকের মধ্যে গুরগুর করে উঠল ড্রাম পেটানোর মতো শব্দ।
বটকেষ্ট যখন খিঁচিয়ে বলে, ‘মাস্টারের কাছে পড়ছিলি নাকি?’ তখন ঘাড় ফিরিয়ে শিবার দিকে তাকায়। শিবা চোখ সরিয়ে শচীনের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘গ্যারেজের চা দাও।’
সাধু আঙুল নেড়ে তাকে ডাকল, ‘অ্যাই শুনে যা।’
শিবা ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে শুধু।
‘শুনতে পাস নি নাকি?’ কোমরে চওড়া বেল্ট, লম্বা, শীর্ণকায় সাধুর সঙ্গীটি বিরক্ত হয়ে বলে। শিবা তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে।
‘মাস্টারটা কোথায় থাকে রে।’
খাতা থেকে মুখ তুলে বটকেষ্টই জবাব দিল, ‘এই ত একটুখানি গিয়ে ডাইনে তেঁতুল গাছ, লালবাড়ি। রাস্তার ওপরেই ঘর। দেখলেই বুঝতে পারবেন।’
‘এখন ঘরে কে আছে?’
শিবাকে জিজ্ঞাসা করেছে। কিন্তু সে জবাব দেবার আগেই বটকেষ্ট আবার বলল, ‘কেউ না, কেউ না। শুধু কতকগুলো ছাত্র—ছাত্রী ছাড়া কেউ না। ওরে শিবা গ্যারেজে অনেকক্ষণ আগে চা চেয়ে গেছে।’
তিনটে গ্লাসকে চারটে আঙুলের ডগা দিয়ে ধরে শিবা বেরিয়ে গেল। গ্রেট বেঙ্গল অটো—রিপেয়ারিং গ্যারেজের মেকানিক শ্রীকান্ত দাস ব্যাটারির খোলের উপর বসে একটা মোটরের পিছনের চাকায় ব্রেক শু্য লাগানোর তদারক করছে। গ্যারেজ মালিক দুর্লভ চক্রবর্তী আর একজন নীল গেঞ্জিপরা মাঝারি আকৃতির কুচকুচে কালো ছিপছিপে মাঝবয়সী লোক তার পাশে দাঁড়িয়ে। দড়িতে ঝোলানো একশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে, চাকার পাশে। নিশ্চয়ই জরুরি কাজ নয়ত গ্যারেজ সন্ধ্যার পর খোলা থাকে না। দুর্লভ একটি গ্লাস তার পাশের লোকটিকে দেবার জন্য শিবাকে ইশারা করল। শ্রীকান্ত গ্লাস হাতে নিয়েই বিরক্ত স্বরে বলল, ‘অ্যাতক্ষণ পরে ঠান্ডা চা। যা গরম করে নিয়ায়।’
