শান্ত নির্বিরোধী গম্ভীর মানুষ। চেহারা শীর্ণ এবং ছোটখাটো। মাথায় টাক। কাচের গ্লাসের তলার মতো পুরু চশমার লেন্সটি। চশমা ছাড়া প্রায় অন্ধ। খদ্দর ছাড়া পরেন না। যখন হাঁটেন মিলিটারির মতো থুতনি তুলে, সটান দেহে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সকাল সন্ধ্যায় সাত—আটটি ছেলে এবং একটি মেয়ে পড়তে আসে। দেয়ালে ঝোলানো একটা বোর্ড অঙ্ক কষে বুঝিয়ে দেবার জন্য। তার উপর বিবেকানন্দের ছবি। ছাত্ররা বসে মেঝের শতরঞ্জে। পঁচিশ বছর তিনি যতীন্দ্রকিশোর হাইস্কুলে নাইন ও টেন—এর অঙ্কের শিক্ষক। প্রয়োজনে ভূগোল এবং ইংরাজি গ্রামার পড়ান। শিবা ওর কাছে স্কুলে কখনো পড়ে নি। উনিও জানেন না শিবা তাঁর স্কুলেরই ছাত্র ছিল।
হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা চলছে। সিট পড়েছে যতীন্দ্রকিশোরে। আজ কোনো পরীক্ষা নেই, আগামীকাল ইংরাজি। গত দিন অঙ্ক পরীক্ষায় একটা গোলমাল হয়েছে। দোকানে চা খেতে আসা দুটি ছেলের কথা শিবা ভাসা ভাসা শুনেছে—একতলায় পরীক্ষা ঘরের জানালা দিয়ে সাদা খাতা পাচার হয়ে বেরিয়ে যায়। খাতাটা উত্তরে ভরা হয়ে যখন জানালা দিয়ে ঢুকছিল তখন স্কুলেরই একজন শিক্ষক—গার্ড সেটা ধরে ফেলেন। কিছুতেই তিনি ছেলেটাকে ছাড়তে রাজি হন নি। কয়েকটি ছেলে স্কুলে ঢুকে শাসিয়েছে হেডমাস্টারকে। বোমা মেরে স্কুল বন্ধ করে দেবে আর সেই গার্ডেরও হাত ভেঙে দেবে যদি তাদের কাজে বাগড়া দেয়।
সন্ধ্যায় শিবা যথারীতি সঙ্কেত পেয়ে চা দিতে যায়। তাকে দেখেই ভবানী স্যার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললেন, ”একটু মুশকিল হয়ে গেছে শিবা।”
ধক করে ওঠে শিবার বুক। তাহলে কি ভবানী স্যারই স্কুলে গণ্ডগোল পাকিয়েছেন? সে ত দেখেছে, কত ছেলে স্যারের হাত—পা ধরেছে অঙ্কে পাশ করিয়ে দেবার জন্য। উনি আধটা নম্বর বাড়িয়েও পাশ করান নি। অসম্ভব কড়া আর অসম্ভব ধৈর্য পরিশ্রমে ছেলেদের অঙ্ক বোঝান। কোনোদিন কামাই করেন নি, এক মিনিটও দেরি করেন না ক্লাসে ঢুকতে।
”কিসের মুশকিল! হাত ভেঙে দেবে বলেছে?”
শোনা—মাত্র ভবানী স্যারের চোখ জোড়া পুরু লেন্সের ওপারে তীক্ষ্ন হয়ে উঠল মুহূর্তের জন্য। সেকেন্ড চারেক মৃদু হেসে নিয়ে বললেন, ”নাহ ওটা কোনো ব্যাপার নয়। ভয়ের কাছে মাথা নুইয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার কথা আমি কোনোদিনই চিন্তায় রাখি নি। আসলে ভেতর থেকে বোধ হয় কিছু একটা আঁচ পেয়েছে। কেউ বোধ হয় বলে দিয়েছে।”
‘কিন্তু আমি ত, স্যার সাবধানেই দি।’
‘না না, তোমায় আমি কিছু বলছি না। তবে পারিবারিক সম্প্রীতিটা ত বজায় রাখা উচিত, সর্বাগ্রে উচিত। আমার মনে হয় এই নিয়ে হয়তো জিজ্ঞাসা করবে, তখন কি বলব বল ত?’
শিবা এ রকম সমস্যার সামনে কখনো পড়ে নি। পারিবারিক সম্প্রীতি ব্যাপারটা যে কি, তাও জানে না। ইতস্তত করে বলল, ‘শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছিল তাই দু—চার কাপ খেয়েছি, এই রকম একটা কিছু—।’
‘না না, শরীর খারাপের অজুহাত একদম নয়। শরীর খারাপ হওয়াটাই লজ্জার ব্যাপার। শিক্ষিত মানুষের শরীর কেন খারাপ হবে, অ্যাঁ? যারা লেখাপড়া শিখেছে, তাদের অবশ্যই জানা উচিত শরীর কিভাবে ফাংশন করে। শরীরই ত মানুষের একমাত্র নিজস্ব, সব থেকে দুর্লভ সম্পদ, তাই না? শরীরকে ভাল করে জানলে সেটা খারাপ হবে কেন? তোমার যে এত ভাল স্বাস্থ্য, তুমি যত্ন নাও বলেই ত?’
শিবা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে শুনে যাচ্ছিল। শেষ কথাটিতে হেসে ফেলল।
‘আমি আর কি যত্ন করব। দিনে একবেলা ভাত—ডাল, আর রাতে রুটি—ঘ্যাঁট। তাও পেটভরে পাই না।’
‘ওহ, তাই বুঝি।’ অপ্রতিভ হয়ে ভবানী স্যার পিছন ফিরে ঘরের দিকে তাকালেন। ছাত্ররা মাথা নিচু করে অঙ্ক কষে যাচ্ছে। গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘তাহলে কি বলা যায়?’
‘বলুন বাজিতে জিতেছি তাই বটকেষ্ট চা খাওয়াল।’
‘বটকেষ্ট কি সেরকম লোক?’
‘না হলেই—বা। দোকানে খদ্দেররা কতরকম ব্যাপারেই ত বাজি ধরে। এক ঘণ্টার মধ্যে কোনো রিক্সার টায়ার পাংচার হবে কি হবে না—দু—কাপ চা তাই নিয়ে বাজি ধরা হয়ে গেল কালকেই ত?’
‘আমি কি নিয়ে বাজি ধরব?’
শিবা বিন্দুমাত্র ভাবল না। বলল, ‘কদিন আগেই দশ কাপ বাজি ধরা হয়েছিল—কত রাউন্ডে ক্লে নক আউট করবে লিস্টনকে। কেউ বলল চার, কেউ সাত, কেউ বলল তেরো। সবাইকে বোকা বানিয়ে প্রথম রাউন্ডেই করল নক আউট। আপনি বলেছিলেন, প্রথম রাউন্ড, তাই বাজি জিতেছেন।’
‘ক্লে! সে আবার কে?’
‘ওয়ার্লডের চ্যাম্পিয়ন।’
‘কিসের?’
‘বক্সিং—এ।’
‘নক আউট কি জিনিস?’
‘ঘুসি মেরে শুইয়ে দেওয়া।’
‘বিশ্রী ব্যাপার। ঘুসোঘুসি আমি একদমই পছন্দ করি না। এর উপর বাজি ধরা কি উচিত?’
ভবানী স্যার পিছন ফিরে তাকালেন, কয়েকজন ছাত্র দরজার দিকে তাকিয়ে এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে শিবার হাতে দিয়ে বললেন, ‘পরে এই নিয়ে কথা হবে।’
‘স্যার একটা কথা বলব?’ অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই শিবা বলল, ‘যদি আপনি হাত ভেঙে দেবার কথা শুনে ভয় না পান, তাহলে এটাতেই বা পাচ্ছেন কেন?’
ভবানী স্যার হেসে ফেললেন।
‘ওটাকে আমি ন্যায়ের পক্ষে তাই, আর এটাতে আমি কারচুপি করছি, মিথ্যার পথ নিয়েছি—তাই। ন্যায়—অন্যায় মানুষমাত্রেই করে, না হলে ত দেবতা হয়ে যেত। তবে দুটোর মধ্যে ডিগ্রির তফাত রাখতে হয়। আমি চাই ন্যায়ের ডিগ্রি মানে মাত্রাটা বেশি রাখতে, এই আর কি।’
