স্তম্ভিত জহর নির্বাক রইলেন।
তারপর যা ঘটতে শুরু করল, পরদিন আনন্দবাজারে হেডিংয়ে সেটাই উঠে এল, ‘নন্দন কাননে দক্ষযজ্ঞ’ ; আজকালের হেডিং হল, ‘ইডেন সমরাঙ্গন’। সমু তাণ্ডব নাচ নাচল ব্যাট হাতে। চোদ্দো ওভারে একশো রান উঠে এল। এই একশোর মধ্যে একস্ট্রা চার রান, জহরের অবদান পাঁচ রান, সমুর একানব্বই। ন’টা ছয় আর সাতটা চার আছে তার একশো একচল্লিশ রানে। জহর যখন ফাইন লেগ থেকে একটা রান নিয়ে ম্যাচ শেষ করে দিলেন তখনও ফুলবাগানের খেলার জন্য একত্রিশ বল রয়েছে। ড্রেসিংরুমে প্যাড পরে অপেক্ষায় রয়েছে তিনজন।
এক রানটা নেওয়ার পরই জহর হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন। ব্যাটে ভর রেখে ঝুঁকে পড়ে তাঁর দেহ। বুকের মধ্যে একটা টর্নাডো তাঁর পাঁজরাগুলোকে খুলে ফেলছে মেরুদণ্ড থেকে। পিঠে একটা হাত পড়ল।
”জহরদা, আমরা পেরেছি।”
হইহই করে মাঠের মধ্যে লোক ছুটে আসছে। উন্মত্তের মতো তারা চেঁচাচ্ছে। সমুকে নিয়ে লোফালুফি শুরু হল। হাততালি দিচ্ছে মাণ্টু, ওম, বদর। জহরের দিকে কেউ দৃকপাতও করল না। সবাই ব্যস্ত সমুকে নিয়ে। এই ভাল, জহর ভাবলেন, আমার কাজ আমি করেছি। এইভাবেই একষট্টি বছরে পৌঁছতে পারলে আমার ক্রিকেটজীবন সার্থক হবে। বুড়ো ঘোড়াটাকে আরও কটা বছর কি ছোটাতে পারব না?
ফেন্সিংয়ের ধারে তিনটে চেয়ার খালি। তিনটে লোকের বদলে জহরের সঙ্গে দেখা হল একটা লোকের—বেজা।
”তুই!”
”অফিস কেটে চলে এলুম। জহর রে, আজ পেট ভরে ফিরপোর খাবার খেলুম, কী ভাল যে লাগল?” জহরের দুই মুঠো বেজা নিজের বুকে চেপে ধরল।
শিবা
শিবা – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
এক
কলকাতার উত্তর শহরতলিতে বি টি রোড বা দমদম রোড বাদ দিলে আর যে কয়টি চওড়া রাস্তা আছে, যেমন বরাহনগরের গোপাল লাল ঠাকুর রোড বা কাশী দত্ত রোড, সিঁথির কালীচরণ ঘোষ রোড—এদের থেকে মাত্র কয়েক গজ সঙ্কীর্ণ এই দেবদাস পাঠক রোড বি টি রোড থেকে বেরিয়ে পুবদিকে চলে গেছে ক্রমশ সরু হতে হতে। দু—ধারে কাঁচা ড্রেন, থকথকে পাঁক। ড্রেনের উপর কাঠের খুঁটিতে ভর দিয়ে নানাবিধ দোকান। একতলা কয়েকটা বাড়ির সামনের দিকেও আছে দোকান—দর্জির, মিষ্টির, ওষুধের, স্টেশনারির, জামা—কাপড়ের। ড্রেনকে পিছনে রেখে রাস্তায় বসে কাঁচা—বাজার। সারি দিয়ে অপেক্ষা করে সাইকেল রিক্সা। কাঁচা—রাস্তাটার বেশির ভাগই গর্তে ভরা এবং খোয়া ছড়ানো। খোয়াগুলোর তিন—চতুর্থাংশ মাটির নীচে, শুধু মাথাগুলি, পথিকদের পায়ে ঠোক্কর এবং সাইকেল রিক্সায় টায়ার ফুটো করে দেবার জন্যই যেন অপেক্ষা করে থাকে। বি টি রোডের মোড় থেকে দুশ গজ পর্যন্ত দেবদাস পাঠক রোডে ভীড় থাকে রাত নটা পর্যন্ত। তারপর দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে স্তিমিত হয়ে আসে আলো এবং কলরব।
এই রাস্তাতেই একটু ভিতর দিকে বটকেষ্টর চায়ের দোকানে কাজ করে শিবা। আর একটু এগলে রাস্তাটা যেখানে ইংরাজি ‘এস’—এর মতো এবং বছর ষাটেকের পুরনো একটি তেঁতুলগাছ অন্ধকার নিয়ে অপেক্ষমান, তাই সামনেই ভবানী স্যারের বাসাবাড়ি। এই চায়ের দোকানেই সে রাত্রে ঘুমোয় টেবল জোড়া দিয়ে। ভোরে উনুন ধরায় এবং রাত এগারোটায় দোকান বন্ধের আগে পর্যন্ত সারাদিন উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে শচীনকাকু, গ্লাসে, কাপে বা ভাঁড়ে ধূমায়মান যে তরল পদার্থটি তৈরি করে ঢেলে দেয় তা টেবিলে খদ্দেরদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ। টোস্ট, ওমলেট, বিস্কুট এবং বিকেল থেকে আলুর দম সরবরাহও তার এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। তার আর একটি কাজ, দেবদাস পাঠক রোডের দোকানে দোকানে চা দিয়ে আসা, প্রধানত গ্রেট বেঙ্গল অটো—রিপেয়ারিং গ্যারেজ এবং ভবানী স্যারের কোচিং ক্লাসে। চায়ের দোকান থেকে দুটোই প্রায় চল্লিশ গজ দূরে। কিন্তু দুদিকে।
ওর পুরো নাম শিবাজী আদিত্য। জিজ্ঞাসা করলে বলে শিবা আইচ। যতীন্দ্রকিশোর হাইস্কুলে দু—বছর আগে ক্লাস সেভেনের ‘সি’ সেকশনের খাতায় প্রথম চার মাস পর্যন্ত ওর নাম লেখা ছিল। নাম কাটা গেছে মাইনে দিতে না পারায়। শচীন ওরই পাড়ার লোক, বাবার বন্ধু ছিল। এই চায়ের দোকানের কাজটি শচীনই করিয়ে দিয়েছে। বেতন কুড়ি টাকা, অবশ্য দু—বেলা ভাত পায়। রাত্রে সে বাড়িই ফিরে যেত মা আর দাদার কাছে। মাস ছয়েক আর যাচ্ছে না। এখন সে যায় মাইনে পেলে দাদার হাতে টাকাটা দিতে। নিতু অর্থাৎ নেতাজি, তখন ওর হাতে দুটো টাকা তুলে দিয়ে শুধু বলে, ‘দরকার হলে খরচ করিস।’ ওদের বাবা ৪২—এ জেল খেটেছিলেন। ছেলেদের নামকরণ এখনো তাঁর জ্বলন্ত দেশানুরাগের সাক্ষ্য দিচ্ছে। প্রায় ভিখারি অবস্থায় যক্ষ্মায় মারা যান চারটি শিশুপুত্র ও বৌকে রেখে।
কাজ করার সময় শিবাকে চোখ এবং কান দুটোই সজাগ রাখতে হয়। সামনের দর্জির দোকান এবং ডাক্তারখানা থেকে প্রায়ই হাঁক আসে চায়ের বরাদ্দ নিয়ে। বুক—সমান উঁচু টেবিলে মৌরির বাটি আর একটা খাতা নিয়ে বসে থাকে বটকেষ্ট। কোথায় কটা চা যাচ্ছে দেখে আর খাতায় টোকে। চা দিয়ে আসতে দেরি হলে খদ্দেরেরও আগে বটকেষ্টই ব্যস্ত হয়ে ওঠে : ”অ শিবা আধ ঘণ্টা আগে যে দুটো চা পাঠাতে বলেছে ডাক্তারবাবু।” বটকেষ্টর আধ ঘণ্টা হল তিন মিনিট।
শিবাকে নজর রাখতে হয় ভবানী স্যারের কোচিং—এর দরজার দিকে। আধ ঘণ্টা অন্তর উনি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ডান হাতটা শুধু তুলবেন—যেভাবে আম্পায়াররা আউটের সঙ্কেত জানায়। যতক্ষণ না শিবা হাত তুলে সেই সঙ্কেত গ্রহণ করছে ততক্ষণ উনি হাত নামাবেন না। কোচিং—এর পিছনের ঘরে আছে সুপ্রভা, ওঁর স্ত্রী। মাঝে দরজা নেই। কোচিং ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের গলি দিয়ে পিছনে যেতে হয়। এই দম্পতি নিঃসন্তান। সুপ্রভা যতটা কৃপণ তার থেকেও বেশি দজ্জাল কিনা, সেটা চায়ের দোকানে নিয়মিত খদ্দেরদের মধ্যে বিতর্কের অন্যতম বিষয়। সারাদিন স্বামীর জন্য তার বরাদ্দ তিন কাপ চা। ভবানী স্যার নীরবে স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে চলেছেন, দিনে ও রাতে বার দশেক হাত তুলে।
