কানু ভটচায সিঁড়ি দিয়ে উঠে ড্রেসিংরুমে যাচ্ছিল, জহরকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এল।
‘এ কী রে, এখনও প্যাড পরিসনি?” খুব অবাক দেখাল কানুকে। ”ক’ নম্বরে ব্যাট করবি, এগারোয়?’
”হ্যাঁ।”
”ব্রাদার্সকে কীরকম চাবকাচ্ছে দেখেছিস।”
”দেখছি।”
”পানুকে বললুম তোর বাকি টাকাটা দিয়ে দিতে, ‘জহর বুড়ো হয়ে গেছে আর কদ্দিন মাঠে নামবে। ঘোড়া তো অনেক বছর দৌড়ল এবার জিরোক। চাবুক মারার শখটা মিটোতে গিয়ে নিজেই চাবুক খেল। মানুষের সব আশা কি পূরণ হয়!’ পানু বলল, ‘কাল সকালেই জহরদার বাড়িতে টাকাটা পাঠিয়ে দোব।’ আর শোন, কার্ড পাঠিয়ে দেব, আসিস কিন্তু।”
জহর কোনও জবাব না দিয়ে অপমান হজম করলেন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন ফুলবাগান হারছে। সমু আর জয়দেব চেষ্টা করছে উইকেট যাতে না পড়ে, কিন্তু জিততে হলে রান চাই, রান কোথায়? ছাব্বিশ ওভারে একষট্টি রান উঠেছে। এখনও তুলতে হবে একশো চল্লিশ রান চব্বিশ ওভারে, তোলা কি যায় না? যায়, তবে দুটো শচীন টেন্ডুলকর চাই।
জহর চোখ বুজে ছিলেন। বিকট একটা ‘হাউজদ্যাট’ শুনে চোখ খুললেন। ফিল্ডাররা হাই ফাইভ করছে সৌগতর সঙ্গে। জয়দেব ক্রিজ ছেড়ে আসছে।
”কী হল?” জহর জানতে চাইলেন, ব্যাট করতে নামার জন্য তৈরি পার্থর কাছে।
”এল বি হয়েছে।”
সাতষট্টি রানে চার উইকেট গেল। জহর উঠলেন প্যাড পরার জন্য। জয়দেব ড্রেসিংরুমে এসে বলতে শুরু করল, ”ব্যাকফুটে খেলতে গেলুম, কিন্তু হঠাৎ এমন লো হয়ে বলটা—”
”থাক ওসব কথা।” জহর ওকে থামিয়ে দিলেন, ”অভিরূপ রানের রেটটা এবার বাড়াতে হবে, শর্ট রান নিয়ে ফিল্ডিংটা আলগা করে দেওয়ার চেষ্টা করবে। … এ ম্যাচ হারা চলবে না। উইকেট অনেক ইজি হয়ে গেছে।”
বাইরে আবার একটা চিৎকার। জহরের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। কে গেল, সমু নয় তো? এখন ব্যাটসম্যান বলতে ওই একটা ছেলেই, যদি আউট হয়ে গিয়ে থাকে তা হলে আর আশা নেই। গ্লাভস আর ব্যাট হাতে অভিরূপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, হেমন্ত গুহ ঢুকলেন, মুখে কথা নেই। করুণ চোখে শুধু তাকিয়ে রইলেন জহরের দিকে। ব্যাটটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরোবার সময় জহর শুকনো হাসি হাসলেন। ভরসা দেওয়ার মতো কথা মুখে জোগাল না।
মাথা নিচু করে ফিরে—আসা অভিরূপের পাশ দিয়ে জহর মাঠে নামলেন। সেই সময় শুনলেন, ”বুড়ো এবার চাবকাতে যাচ্ছে।” শুনেই তাঁর মাথাগরম হয়ে গেল। স্কোরবোর্ডটা দেখে নিলেন। সমু ঊনপঞ্চাশ রানে। টোটাল তিয়াত্তর ছয় উইকেটে। এখনও দরকার একশো আটাশ কুড়ি ওভারে। জহর মন্থর পায়ে ক্রিজের দিকে যেতে যেতে আকাশের দিকে মুখ তুললেন। হাবলার সেই ইনিংসটা কি এখন খেলে দেওয়া যায় না? সমু সেট হয়ে গেছে। ও স্ট্যান্ড দিক, একটা শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক।
সমু এগিয়ে এল, মুখে উত্তেজনা নেই, নির্বিকার।
”হাবলা মনে আছে? একদিকটা ধরে রাখ, আমি দেখছি।” জহর বললেন, ”আগে পঞ্চাশটা করে নাও।”
সমু বাধ্য ছেলের মতো মাথা হেলাল। বরকতের প্রথম বলটা জহর ছেড়ে দিলেন। দ্বিতীয় বলটা ঠেললেন কভারে : ”রাইট।” একটা রান। সমু ব্যাট করবে। প্রথম বলটা সে কভারেই হালকাভাবে ড্রাইভ করল। ফিল্ডার কোথায় দেখে নিয়েই জহর ছুটে বেরোলেন। সমু ছোটার জন্য তৈরি ছিল না। যখন ছুটল তখন ফিল্ডার বল তুলছে। বোলারের গা ঘেঁষে ছোড়া বলটা যখন বেরিয়ে গেল সমু তখন পপিং ক্রিক থেকে তিন গজ দূরে। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলে যা হয়, ওর মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল, তারপরই রক্ত ছুটে এল। চোখে ফুটে উঠল অতিরিক্ত জীবন পাওয়ার দুর্জয় আত্মপ্রত্যয়। হঠাৎ পাওয়া একটা সাহস তাকে বেপরোয়া হতে উসকে দিল।
তার হাফসেঞ্চুরি হল। কিছু হাততালি উঠল। সমু ব্যাটটা একটু তুলল। ওভার শেষ, এবার তাকে বল করতে এল সৌগত। জহর তৈরি হলেন শর্ট রান নেওয়ার জন্য। এখন তিনি স্ট্রাইক চান, এখন তিনি চালিয়ে খেলবেন। আবার হাবলার ইনিংসটা এখন তাঁকে খেলতে হবে। পারবেন, যদি সমু ওদিকে টিকে থাকতে পারে।
সৌগতর প্রথম বলটা তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বাউন্ডারির বাইরে পড়ল। চোখ পিটপিট করে ভ্রূ কুঁচকে সমুর দিকে তাকিয়ে সে ঠোঁট মুচড়ে হাসল। ভাবখানা, এইবার তোমাকে পেয়েছি। কতক্ষণ আর নিজেকে সামলে রাখবে! লং অন আর লং অফে নুরু ফিল্ডার রাখল। পরের বলটাও সৌগতর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আগের জায়গাতেই পড়ল। সৌগত হাসল, তার তৃতীয় বলটা একইভাবে উড়ে আর একটু দূরে কংক্রিট গ্যালারিতে পড়ে ‘ঠকাস’ শব্দ তুলল। সৌগত আর হাসল না, বরং জহরের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। করছে কী সমু! চতুর্থ বলটা শর্ট লেংথে, সমু বিদ্যুৎগতিতে পুল করল, স্কোয়ার লেগ বাউন্ডারিতে বল গেল। চার বলে বাইশ রান!
সৌগতর চোখে বিভ্রান্তি, এবার কোথায় বল ফেলা যায়? অফস্টাম্পের অনেক বাইরে সে বল ফেলল, ছেড়ে দিলে আম্পায়ার নির্ঘাত ওয়াইড দেখাতেন। সমু ছাড়েনি। কাট করা বলটা পয়েন্ট বাউন্ডারির ফেন্সে লেগে মাঠে ফিরে এল। নুরু ছুটে এসে সৌগতর সঙ্গে কথা বলে গেল। জহর শুনলেন উত্তেজিত নুরু বলছে, ”আর কটা লোক বাউন্ডারিতে রাখব?” ষষ্ঠ বলটা সমু ফরওয়ার্ড খেলল অনেকটা ঝুঁকে। বোলারের কাছে বল গেল। রান হল না।
জহর কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলেন। তিনি কিছু বলার আগেই সমু উত্তেজনায় থরথর স্বরে বলল, ”হাবলায় আমি যে খেলাটা খেলেছিলাম, এখন আপনি সেইটে খেলুন। আরও একশো রান দরকার, তুলে নিতে হবে।”
