কৌশিক দু’হাত তুলে সবার সঙ্গে হাতে হাত চাপড়ে হাই ফাইভ করায় ব্যস্ত যখন তখন জহর বললেন, ”আনন্দ করছ বটে, কিন্তু মাণ্টু সিং যতক্ষণ আছে ততক্ষণ কিন্তু বিপদও রয়ে গেছে। আরও দুটো উইকেট কুড়ি ওভারের আগে চাই।”
দুটো নয়, আর একটা উইকেট পড়ল ঠিক কুড়ি ওভারেই। বরকতউল্লা এসে শর্ট রান নিতে শুরু করল। বল করছে কৌশিক মিডিয়াম পেসে। সাদামাঠা বল, মাঝে—মাঝে অফ কাট করে। বরকত ঝুঁকে একটা বল আস্তে ঠেলতে গেল মিড উইকেটে। প্রথম স্লিপে নিচু হয়ে বলটাকে আসতে দেখে জহর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ডান হাতে ক্যাচটা ধরে তিনি চিত হয়ে। বিশ্বাস করতে পারছেন না এমন একটা ব্যাপার করে ফেলেছেন। দুটো ছেলে দুটো হাতে টেনে তাঁকে দাঁড় করাতেই তিনি প্রথম কথা বললেন, ”তা হলে কি আমরা জিতব?” প্রত্যেকের সঙ্গে হাই ফাইভ করলেন। জীবনে এই প্রথম। একশো দু’রানে চার উইকেট। ওম আর বরকত চলে গেছে।
মাণ্টুও চলে গেল জয়দেবকে স্কোয়ার কাট করে। বলটা একটু উঠে গেছল। পয়েন্টে শুভ্র ঝাঁপিয়ে আগুনে গোলার মতো ক্যাচটাকে ধরল। মাণ্টু সাতাত্তর রান করেছে। শুভ্র ব্যর্থ হল বোলিংয়ে। সাত ওভার বল করে চল্লিশ রান দিয়ে উইকেট পায়নি। ব্রাদার্স পাঁচ উইকেটে একশো পঁয়ষট্টি। সৌগত এসেছে। মুখে উপেক্ষার ভাব। গার্ড নিল আম্পায়ারের কাছ থেকে। ব্যাট দিয়ে সযত্নে ক্রিজে আঁচড় টানল। কোমর বাঁকিয়ে সামনে ঝুঁকল, শরীর ঝাঁকিয়ে জোড়াপায়ে লাফাল তারপর স্টান্স নিল। জয়দেব একটু ওভারপিচ করে সোজা একটা আর্মার দিল। সৌগত পিছিয়ে গিয়ে ব্যাট পাতল। বল লাগল প্যাডে। লাফিয়ে উঠে অ্যাপিল করল জয়দেব, তার সঙ্গে কিঙ্কর এবং জহরও। সিদ্ধান্ত নিতে আম্পায়ার পলক ফেলার সময় নিলেন।
”ব্যাড লাক সৌগতদা।” কিঙ্কর সমবেদনা জানাল।
এর পর ব্রাদার্সের ব্যাটসম্যানরা কাণ্ডজ্ঞানবর্জিত ব্যাটিং শুরু করল। নুরু এসেই আক্রমণ শুরু করল। সিদ্ধার্থর বলে দুটো চার নিল গ্লান্স আর কভারে তুলে মেরে। অলোকও তুলে তুলে মারতে শুরু করল। একশো নব্বইয়ে নুরুর ক্যাচ নিজের বলেই ধরল সিদ্ধার্থ, দু’রান পরে অলোককে সে বোল্ড করল। জয়দেবের বলে কিঙ্কর শেষ দু’জনকে স্টাম্পড করল। ব্রাদার্স অল আউট ঠিক দুশো রানে।
দুশো এক রান তোলা ফুলবাগানের পক্ষে সম্ভব, আবার অসম্ভবও। ওমকিশোর আর বরকত দুটো ঝানু বোলারের সামনে অনভিজ্ঞ ছেলেরা দাঁড়াতে পারবে কি না সে ব্যাপারে জহর নিশ্চিত নন। লিগ ম্যাচে যা দেখেছেন তাতে ভরসা কমই পাচ্ছেন। হেমন্ত গুহ শুকনো মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, জহর বললেন, ”ভয় পাচ্ছেন নাকি? আরে না না, আমরা হারব কি, ছেলেরা সেদিন বলল না—জিতব।”
ড্রেসিংরুমের সবাই জহরের কথা শুনে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকাল। জহরের মনে হল ছেলেরা যেন কুঁকড়ে গেছে। ম্যাচ জেতার জন্য চাপটা এবার পেতে শুরু করেছে। কেউই তার মুখের দিকে তাকাতে চাইছে না।
”হল কী তোমাদের?” গম্ভীর স্বরে জহর প্রায় ধমকে উঠলেন। ”মনে হচ্ছে তোমাদের বাড়ি থেকে কারও মরার খবর এসে পৌঁছেছে! দুশোটা রান, কতক্ষণ লাগবে তুলতে? এই উইকেটে ওম, বরকত, সৌগতকে খেলতে পারবে না? গত বছর এই ফাইনালেই শুভ্র হিরো হয়েছিল, সাপোর্টাররা কাঁধে তুলেছিল, আজও তুমি কাঁধে চেপে মাঠ থেকে ফিরবে… পারবে না ফিরতে?”
শুভ্র ফ্যাকাসে হাসি হেসে বলল, ”আগের বছর ওমকিশোর, বরকত ছিল না জহরদা।”
”এ—বছরও নেই। ধরে নাও নেই। গত বছর সেঞ্চুরি করা হয়নি, আজ সেটা করে এসো। … যাও।” জহর অন্য ছেলেদের দিকে তাকালেন। ”সারা সিজন কিছুই করে দেখাতে পারোনি, বছরের আজই শেষ ম্যাচ, … করে দেখাও।”
ফুলবাগান যা করতে শুরু করল তাতে জহরের মুখ কালো হয়ে গেল। ড্রেসিংরুমের বাইরে চেয়ারে বসে দেখতে পাচ্ছিলেন, স্ক্রিনের ধারে ফেন্সিং ঘেঁষে চেয়ারে বসে পানু পোদ্দার, কানু ভটচায আর সুবল মুখুজ্যেকে। তিনজনে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছে, হাসছে। ফুলবাগানের তিনটে উইকেট পড়ে গেছে সতেরো রানে, পেয়েছে ওমকিশোর, চার রান দিয়ে। দুটো উইকেট বাউন্সার থেকে আর একটা বোল্ড। জহরকে অবাক করেছে শুভ্র। প্রথম বলেই সে বোল্ড হয়েছে। ওমের বলে সে ফরওয়ার্ড খেলেছিল, ব্যাট আর প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে আসে। হেলমেট বগলে নিয়ে শুভ্র জহরের পাশ দিয়ে ড্রেসিংরুমে যায়। চোখে জল, জহর মুখ ঘুরিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকেন।
এর পর কৌশিক। বলটা বাউন্স করিয়েছিল ওম। মাথা নামিয়ে ব্যাটটা তাড়াতাড়ি মাথার ওপর তুলে ধরে সে। গ্লাভসে লেগে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ যায়। তারপর কিঙ্কর। বাউন্সারে চোখ বুজে হুক করে। বল উঠে যায় বোলারের মাথার ওপর। সমু আর জয়দেব এখন ক্রিজে। পঞ্চম ওভার শেষ হল।
দু’জনেই গুটিয়ে গেছে। সীমায়িত ওভারের খেলা সিকেয় তুলে ওরা পাঁচদিনের খেলার মতো ব্যাট করে যাচ্ছে। ব্রাদার্সের টাইট বোলিংয়ে রান তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সৌগত দুটো মেডেন নিয়ে পাঁচ ওভারে মাত্র সাত রান দিয়েছে। বরকতের বলে জয়দীপ দুটো চার মারলেও সে স্বচ্ছন্দ নয়। একস্ট্রা হয়েছে এগারো, বাই ও লেগবাই থেকে। ব্রাদার্স গত বছরের জেতা ম্যাচ হেরে যাওয়ার কথা ভোলেনি। এবার তারা হুঁশিয়ার।
