”এবার আর ওরকম হবে না রে। বলেছিলিস চাবকাব, মনে আছে?’
”আছে।”
”এবার আমরা চাবকাব তোদের। ম্যাচ কী করে জিততে হয় এবার সেটা দেখাব। ফুলবাগানের এখন এমনই হাল যে, তোর মতো বুড়োকেও খেলতে হচ্ছে। কী করে যে ফাইনালে উঠলি!…. যাকগে, ওসব কথা। পি সেন জেতার পর পানু পার্টি দেবে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে, কার্ড পাঠিয়ে দোব, তুই আসিস কিন্তু। অনেক বছর ব্রাদার্সে ছিলিস তো।”
”নিশ্চয় যাব। অনেকদিন ভালমন্দ খাইনি। তবে ফাইনালে আগে ওঠো তো।”
”ওঠা হয়ে গেছে। শালিমার সেমিফাইনালে খেলছে না, পাকা খবর। এবার তোরা রেডি থাকিস—”
”চাবুক খাওয়ার জন্য?” জহর চওড়া করে হাসলেন।
.
ইডেনে প্রায় চার হাজার দর্শকের সামনে নুরুর সঙ্গে জহর টস করলেন। জিতল নুরু।
”জহরদা, আমরা ব্যাট করব।”
”গত বছরও তোরা ব্যাট করেছিলি।”
”গত বছর তোমাদের জয়প্রকাশ ছিল, এবার নেই।” নুরু মুচকে হাসল। জহরও হাসলেন। মনে—মনে তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন জিতলে ফিল্ড করবেন। সকালে উইকেট কিছুটা তাজা থাকে। তখনই তাড়াতাড়ি প্রথম দিকের উইকেট যদি কয়েকটা পাওয়া যায়। বেলা বাড়লে উইকেট নির্জীব হয়ে পড়বে, ফুলবাগানের যা বোলিং—ক্ষমতা তাতে কচুকাটা হবে মাণ্টু সিংদের হাতে। নুরু ব্যাট করতে চাওয়ায় তিনি হেসে ছিলেন।
সিদ্ধার্থ বল নিয়ে ওপেন করে, তারপর অভিরূপ। সিদ্ধার্থর প্রথম দুটো বল ওয়াইড হল। তৃতীয় বলে ওমকিশোর পয়েন্ট থেকে চার নিল। চতুর্থ বলেও একই জায়গা থেকে আবার চার। প্রবল উৎসাহে সে প্রাণপণ জোরে বল দেওয়া চেষ্টা করছে। তার আউট সুইংগুলো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হয়ে বড় বাঁক নিয়ে ঘুরে যাচ্ছে অফস্টাম্পের বাইরে দিয়ে, তার ওপর বলের লেংথও ওভারপিচ হচ্ছে। প্রথম স্লিপ থেকে জহর এগিয়ে গেলেন সিদ্ধার্থর কাছে।
”অত জোরে নয় সিদ্ধার্থ, আগে লেংথে ফেলো। নতুন বল, অত বড়—বড় সুইং করালে তোর মার খেয়ে মরবে… পেস কমিয়ে আগে লেংথ ঠিক করো।” মাথা নিচু করে সিদ্ধার্থ শুনে গেল জহরের কথা।
সিদ্ধার্থর পিঠ চাপড়ে দিয়ে জহর বল তুলে দিলেন অভিরূপের হাতে। ”অফ স্টাম্পের ওপর রাখবে, দেখে নাও তোমার ফিল্ড।”
দুটো সিঙ্গল আর একটা দুই হল অভিরূপের বলে। চারটে রানের জায়গায় হতে পারত বারো রান। কিন্তু সমু আর কৌশিক শিকারি চিতার মতো বল তাড়া করে কভার আর পয়েন্টে অবধারিত বাউন্ডারিতে যাওয়া বলকে এক আর দুই রানে দাঁড় করায়। ওদের আন্তরিক প্রাণপণ চেষ্টা দেখে ফুলবাগান দলটার নড়াচড়ায় যেন বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগল। জহরের মনে হল, জলপোকার মতো ছুটোছুটি করা ছেলেদের মাঝে তিনি যেন একটা বক।
পঞ্চম ওভারের শেষ বলটা সিদ্ধার্থ ঠুকে দিল। ওমকিশোর বোধ হয় ঢিলে দিয়েছিল মনোনিবেশে, বলটাকে হঠাৎ মুখের সামনে দেখে সে হুক করল বলের লাইন থেকে সরে না গিয়ে। লং লেগ বাউন্ডারিতে দাঁড়ানো জয়দেব গজদশেক ছুটে এসে থমকে পিছু হটতে শুরু করল। বলটা ওভার বাউন্ডারি হওয়ার জন্য উড়ে যাচ্ছে। লাইনের এক হাত ভেতরে দাঁড়িয়ে জয়দেব এক হাত তুলে লাফ দিল। বল তার তালুতে জমে গেল।
দু’হাত তুলে পাগলের মতো ছুটে আসছে জয়দেব, আর চারটে ছেলে ছুটে যাচ্ছে তার দিকে। দৃশ্যটা দেখে জহরের বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল একটা ক্ষীণ আশা। এই ওমকিশোরই লিগে সেঞ্চুরি করেছিল। পঁচাশি বলে একশো চব্বিশ! এমন একটা অসম্ভব ক্যাচ নিতে পারলে, ম্যাচটাও তা হলে নেওয়া যেতে পারে। ক্যাচই তো ম্যাচ জেতায়।
মাণ্টু সিং নেমেছে। মুখে সহজ একটা ছেলেমানুষি হাসি। বাসুদেবের স্ট্রাইক। অভিরূপের বল গ্লান্স করে সে দুটো রান নিল। দ্বিতীয় বলটা ড্রাইভ করতেই ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বলটা লেগের দিকে উড়ে গেল। কিঙ্কর অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় বাঁ হাত বাড়িয়ে বাঁ দিকে ঝাঁপ দিল। বাঁ তালুতে বলটা ধরে জমিতে দু’বার গড়িয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। আম্পায়ার আঙুল তুলে দিলেন। বত্রিশ বল খেলে দুটো উইকেট হারিয়ে ব্রাদার্সের ছত্রিশ রান। তার মধ্যে ওমকিশোরও আউট! ফুলবাগানের ছেলেদের চোখ জ্বলজ্বল করছে। এখন ওদের চলাফেরা খাঁচার বুনো বাঘের মতো। গরাদ ভেঙে বেরোবার জন্য ছটফটাচ্ছে।
‘জহরদা, এই মাণ্টু সিংটাকে তাড়াতাড়ি নিতে হবে।” কিঙ্কর তার পাশে দাঁড়ানো জহরকে বলল, ”অভিরূপ কী বল করছে দেখেছেন? প্রত্যেকটা বল অফস্টাম্পের ওপর দিয়ে বের করছে।”
তাড়াতাড়ি আর নেওয়া হল না। হুঁশিয়ার হয়ে গোটাদশেক বল খেলে হঠাৎ অভিরূপকে সোজা ড্রাইভ করে চার, পরের বলে লং অনেক ওপর দিয়ে ছয় মারল। জহর তাকে সরিয়ে অনুপকে এবং সিদ্ধার্থর জায়গায় জয়দেবকে আনলেন। তৃতীয় উইকেট পার্টনারশিপে একান্ন রান উঠল আট ওভারে। তার মধ্যে মাণ্টুরই চল্লিশ রান। ছেলেদের মুখে হালকা হতাশার ছায়া, ফিল্ডিংয়ে অবশ্য ঢিলেমি পড়েনি। জহর কিন্তু বিব্রত নন। চোদ্দো ওভারে পঁচাশি রান। অনুপ টেনে বল করে যাচ্ছে, রান বেশি দেয়নি। জয়দেব ফ্লাইটে একবার মাণ্টুকে টেনে বের করেছিল, কিঙ্কর স্টাম্প করার চেষ্টা করেও পারেনি। ডিপ পয়েন্ট থেকে শুভ্র সোজা উইকেটে বল মেরেছিল, রান আউট হয়নি। এছাড়া আর কোনও ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনা ঘটল পনেরো ওভারের পর ফিল্ডারদের ছড়িয়ে দিতে। মাণ্টুর পার্টনার রান তোলায় পিছিয়ে পড়েছে, এবার তার খেয়াল হল রান তোলার গতি বাড়াতে হবে। জয়দেবের বলে দুটো পুল করে দুটো চার নেওয়ার পর কভারে বল পাঠিয়ে একটা রান নিয়ে দ্বিতীয় রান নেওয়ার জন্য দৌড়ল। মাণ্টু ”নো, নো” বলে চিৎকার করে উঠতে সে দৌড়ের মাঝপথে থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টার আগেই কৌশিক বল ছুড়ে দিয়েছে জয়দেবকে। রান আউট।
