”অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেন ওয়ারউইক আর্মস্ট্রং, বোধ হয় নাম শোনোনি। সত্তর—বাহাত্তর বছর আগের কথা। ব্র্যাডম্যান তখন বাচ্চচা ছেলে। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে টেস্ট সিরিজে ৫—০ দুরমুশ করে পরের বার ইংল্যান্ড ট্যুরে এসে পর—পর তিনটে টেস্টে আবার দুরমুশ করল আর্মস্ট্রংয়ের দল। ইঁদুরকে নিয়ে বেড়াল যেভাবে খেলে, তাই। বাকি দুটো টেস্ট করুণা করে ড্র করল। সারা ট্যুরে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ হারেনি… শুধু একটা ছাড়া। আর সেটার কথাই বলব।” জহর হাত বাড়ালেন সন্দেশের বাক্সের দিকে। হেমন্ত গুহ শশব্যস্তে বাক্সটার ঢাকনা খুলে এগিয়ে ধরলেন। বাক্সে সন্দেশ নেই। জয়দেবের মুঠোয় গোটাকয়েক সন্দেশ, কিঙ্কর হাতটা ধরে জহরের সামনে তুলল। জয়দেব মুঠো খুলে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ”ছয় মেরেছি তাই ছ’টা নিয়েছি।”
”তোকে আমি আরও ছ’টা কিনে দেব।” হেমন্ত গুহর সস্নেহ প্রতিশ্রুতি।
”আর ওই উইনিং রানটার জন্য আমি একটা।” বলে জহর জয়দেবের মুঠো থেকে একটা সন্দেশ তুলে নিলেন।
”জহরদা, তারপর কী হল?” শুভ্রর অধৈর্য স্বর।
”বলছি, বলছি। ইংল্যান্ডের তখন শোচনীয় অবস্থা চলছে। পর—পর তিনটে সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরেছে বারোটা ম্যাচ, জিতেছে একটা। আর্মস্ট্রংয়ের রথ হুড়মুড়িয়ে চলেছে, সামনে যা পড়ছে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। সেইসময় ইস্টবোর্নে তাদের একটা তিনদিনের ম্যাচ পড়ল, অ্যামেচার তরুণদের নিয়ে গড়া ‘জেন্টলমেন অব ইংল্যান্ড’ নামে একটা দলের সঙ্গে। সবাই অবশ্য তরুণ নয়, দুটো বুড়োও ছিল সেই দলে। ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেন আর্চি ম্যাকলারেন, ল্যাঙ্কশায়ারে খেলতেন, বছর বারো আগে শেষ টেস্ট খেলেন। এর আন্ডারে রনজি টেস্ট খেলেছেন। তিনিই ছিলেন জেন্টলমেন দলের ক্যাপ্টেন। তখন বয়স পঞ্চাশ।
”জহরদা, এই ম্যাকলারেনের হায়েস্ট রানের কাউন্টি রেকর্ড কি গ্রেম হিক সেদিন ভাঙল?”
”হ্যাঁ, ম্যাকলারেনের ছিল চারশো চব্বিশ রান। যাকগে, ওসব কথা… দলে আর একটা বুড়ো ছিল, সাউথ আফ্রিকার অলরাউন্ডার অব্রে ফকনার, এর বয়স তখন চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। বাকি ন’জন ইউনিভার্সিটির ছেলে, বাইশ—তেইশ বয়স। মজার কথা কী জানিস, এই ম্যাচ রিপোর্ট করতে লন্ডন থেকে একজন ছাড়া আর কোনও রিপোর্টারই যায়নি। তারা ধরেই নিয়েছিল আর্মস্ট্রংয়ের দল একদিনেই ম্যাচ শেষ করে দেবে, ওখানে গিয়ে কী লাভ!”
”সেই একজন রিপোর্টার কে?” এবার কিঙ্কর জানতে চাইল।
”নেভিল কার্ডাস। তিনি গেছলেন, কেননা ম্যাকলারেন তাঁকে চিঠি দিয়ে ম্যাচটা দেখার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। চিঠিতে সেই বুড়ো পুনশ্চ দিয়ে তলায় লেখেন : ‘আমার মনে হয় আর্মস্ট্রংয়ের দলকে কী করে হারাতে হয় তা আমি জানি।’ … কী আত্মবিশ্বাস!” জহর জ্বলজ্বলে চোখে ছেলেদের মুখের দিকে তাকালেন। ”একদল টাটকা তরুণ আর একটা পাকা মাথা! আর বিরুদ্ধে রয়েছে জয়ের গর্বে উদ্ধত হয়ে—ওঠা একটা ভয়ঙ্কর দল।
”খেলা ঘণ্টাখানেক চলার পরই কার্ডাস বুঝে গেলেন এখানে এসে খুবই ভুল করেছেন। লাঞ্চের মধ্যেই ম্যাকলারেনের দল তেতাল্লিশ অল আউট! নেহাতই লন্ডনে ফেরার ট্রেন তখন আর নেই, নয়তো তিনি ফিরে আসতেন। এর পর অস্ট্রেলিয়ানরা পিকনিকের মেজাজে ব্যাট করে দিনের শেষে দুশো রানেরও কমে সবাই আউট হয়ে গেল। কার্ডাস ধরে নিলেন ম্যাচ ওখানেই শেষ হয়ে গেছে। পরের সকালে অস্ট্রেলিয়া লাঞ্চের আগেই জিতে যাবে ধরে নিয়ে কার্ডাস তো তাঁর ব্যাগ রেলস্টেশনে আগেভাগে পাঠিয়ে দিলেন। মাঠ থেকে সোজা গিয়ে একটার ট্রেন ধরবেন। ম্যাকলারেন প্রথম বলেই বোল্ড হলেন। কার্ডাস মাঠ থেকে বেরোবার উদ্যোগ করলেন। ধীরে—ধীরে হেঁটে গেটের দিকে এগোচ্ছেন আর দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ ঘুরিয়ে মাঠের খেলার দিকে তাকাচ্ছেন। দেখলেন ফকনার ব্যাট করছেন, সঙ্গে এক তরুণ। ফাঁকা মাঠে শুধু শোনা যাচ্ছে স্ট্রোকের আওয়াজ। তাঁদের ব্যাটিং দেখতে—দেখতে কার্ডাস আর মাঠ থেকে বেরোতে পারলেন না, ফিরে এলেন। সেদিন আর তাঁর লন্ডন যাওয়া হল না, পরের দিনও নয়। ফকনার তাঁর জীবনের শেষ ইনিংসে দুর্দান্ত ব্যাট করে গেলেন। থার্ড ডে—তে কেমব্রিজের বোলার গিবসন শেষ করে দিল অস্ট্রেলিয়ানদের। আটাশ রানে ম্যাচটা জিতে নেয় ম্যাকলারেনের জেন্টলম্যানরা।” জহর ছেলেদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া আর অবাক হওয়া দেখলেন।
”ক্রিকেটে অনেক কিছুই ঘটে, শুনলে মনে হয় বানানো কথা।….. এমন গল্প ফাইনালে আমরাও তো বানিয়ে দিতে পারি … পারি না? … পারব না? বল তোরা পারবি না?” জহর বাঁ হাতের তালুতে ঘুসি মারলেন। তাঁর চোখ দিয়ে হলকা বেরোচ্ছে। ঠোঁট কেঁপে উঠল। সবাই চুপ।
নিস্তব্ধতা ভেঙে সমুই প্রথম বলল, ”পারব।”
কিঙ্কর বলে উঠল, ”পারব।”
শুভ্র আর অনুপ বলল, ”পারব।”
এবার সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ”জিতব।”
ফুলবাগান টেন্টের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল কানু ভটচায। জহরকে দেখে একগাল হাসতেই জিভটা বেরিয়ে এল।
”খেলা দেখতে এসেছিলে বুঝি?” জহরও একগাল হেসে উৎসাহ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
”দেখলুম, হেরে তো বসেছিলি। তোর টিমের কোমরে একদম জোর নেই। পাঁচটা উইকেট কীভাবে পড়ে গেল!”
”যেভাবে গত বছর ফুলবাগানের পড়ে গেছল, তবুও তোমরা ম্যাচ জিততে পারোনি।”
