একটু অবাক হয়ে হিয়া প্রশ্ন করল, ”খাও না তুমি?’
”দিলেই খেতে হবে নাকি!” কোনি শুকনো স্বরে বলল।
চকোলেট টুকরোটা কুড়িয়ে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে হিয়া বলল, ”বুঝেছি কেন খাবেনা।’
”কি বুঝেছ?” স্প্রিংয়ের মতো কোনি ছিটকে উঠে বসল।
”যা বোঝার ঠিকই বুঝেছি। তুমি কমপ্লেক্সে ভুগছ, অযথা আমার ওপর রেগে আছ।”
হিয়া কথা বলতে বলতে বেলার টেবলের দিকে এগিয়ে গেল। ক্রিমের কৌটোটা খুলে আঙুল ডুবিয়ে খানিকটা ক্রীম তুলে গালে লাগাল। ”বাবা বলেছিলেন, রমা যোশি গতবারের মতো ছ’টা গোল্ড এবার পাবে না যদি স্টেট মীটে যেভাবে হানড্রেড ফিনিশ করেছিলে সেইভাবে তুমি কাটতে পারো। কিন্তু আমি বলছি তুমি তা পারবে না।”
হিয়া আর একটু ক্রিম তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে থমকে গেল। কোনির কাছে এসে, ওর মুখে সেটুকু লাগিয়ে দিয়েই হেসে উঠল সে এবং ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বলল, ”অত হিংসে ভাল নয়।”
কোনিকে বিভ্রান্ত করল হিয়ার এই কথাটা। আপন মনে সে বলল, ‘বয়ে গেছে আমার হিংসে করতে। বড়লোকমি দেখিয়ে চকলেট দেওয়া… কে চায় তোর ভিক্ষে, নিজের জিনিস অন্যকে দিতে হিয়া কার্পণ্য করে না, পরের জিনিস নেওয়াতেও কুণ্ঠা নেই। মুখে ক্রিমটুকু অন্যমনস্কের মতো বুলিয়ে নিয়ে কোনি আবার বলল, ‘এসব হচ্ছে বড়লোকি চাল। লোককে দেখানো আপন—পর জ্ঞান আমার নেই, বুঝি না যেন কিছু!”
ঘরে ঢুকল হরিচরণ।
”অঃ তুই একা রয়েছিস, ওরা গেল কোথায়? কি ঝামেলা দ্যাখতো, তোর নাম চারটে ইভেন্টে পাঠান হয়েছিল অথচ কোনটাতেই নাম দেখছি না। নিশ্চয় গোলমাল হয়েছে কোথাও। খোঁজ নিয়ে দেখব’খন। অমিয়া ফিরলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস তো।”
যেমন বেগে এসেছিল তেমনিভাবেই হরিচরণ বেরিয়ে গেল। আর থ হয়ে রইল কোনি। এতদূরে এসে চ্যাম্পিয়নশিপে সে নামতে পারবে না। আর কিছু সে ভাবতে পারল না। আস্তে আস্তে একটা কান্না তার সারা শরীরটাকে ঝাঁকাতে শুরু করল। ফাঁকা, বিরাট ঘরটা একটু একটু করে ভরে উঠতে লাগল মৃদু চাপা করুণ একটা স্বরে। আর তার মধ্যে একটা শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে—”ক্ষিদ্দা, ক্ষিদ্দা।”
মেয়েরা ফিরল তর্ক করতে করতে। এবারের ওলিম্পিককে মেক্সিকো না মেক্সিকো সিটি ওলিম্পিক, কোনটা বলা সঠিক হবে। ওরা লক্ষই করল না কোনিকে।
হঠাৎ তীক্ষ্ন চীৎকারে সবাই সচকিত হয়ে বেলার দিকে তাকাল। হাতে খোলা ক্রিমের কৌটো, বেলা ক্ষিপ্তের মতো বলে উঠল,”আমার ক্রিম! আবার কে নিয়েছে এখান থেকে। কে নিয়েছে? আমি আজ বার করবই, বেরিয়ে যাবার সময় যা ছিল, এখন তার থেকে অনেক কমে গেছে।”
কে একজন বলল, ”ঘরে তো কোনি ছাড়া আর কেউ ছিল না।”
অমিয়া হঠাৎ বলল, ”দ্যাখ তো কোনির ব্যাগটা, সরিয়ে—ফরিয়ে রেখেছে কিনা।”
বেলা ছুটে গিয়ে ক্যাম্বিসের ব্যাগটা খুলে উপুড় করল। সামান্য জিনিস ক’টা মেঝেয় পড়ল। কোনি বিস্ফারিত চোখে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে। কথা বলার ক্ষমতা যেন লোপ পেয়েছে, এই ঘটনার আকস্মিকতায়। বেলা পা দিয়ে কোনির কস্ট্যুমটা সরাতেই, ”আহ” বলে সে নিচু হল কস্ট্যুমটা তোলার জন্য। বেলা সেই মুহূর্তে ওর চুল মুঠোয় টেনে মুখ উঁচু করে ধরল।
”কি মেখেছিস? অ্যাঁ, কি মাখা রয়েছে তোর মুখে?” আবিষ্কারের উত্তেজনায় বেলার দম বন্ধ হয়ে এল।
মেয়েরা এগিয়ে এল কোনিকে ঘিরে। অমিয়া একটা আঙুল দিয়ে কোনির গাল ঘষে, আঙুলটা নাকের কাছে ধরে বিচারকের মতো গম্ভীর স্বরে রায় দিল, ”ক্রিম।”
”আমার ক্রিম।” বেলা চীৎকার করে উঠল।
তারপর ওরা সদ্য আবিষ্কৃত একটি দ্বীপের দিকে তাকিয়ে থাকা নাবিকদের মতো কোনিকে দেখতে লাগল। কোনি পা ঝুলিয়ে খাটে বসে। মুখের বিস্ময়ভাব কাটেনি তখনো, অসহায় চোখে সকলের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার জন্য তার ঠোঁট নড়ছে কিন্তু বলতে পারছে না।
”কোনি বোধহয় ফরসা হতে চায়।” একজন মন্তব্য করল।
”বাব্বা, আমি যা ভয়ে ছিলুম বেলাদি বোধহয় আমাকেই চোর সন্দেহ করছে।”
”আমার পেস্টও তাহলে কে কমিয়েছে এবার বোঝা গেল।”
কোনি এতক্ষণে কথা বলল, ”হিয়া ক্রিম বার করে আমার মুখে মাখিয়ে দিয়েছে। আমি কখনো ক্রিম মাখি না।”
”কি বললি? হিয়া?” বেলা ঠাস করে কোনিকে চড় মারল। ”হিয়ার নামে অপবাদ দিচিছস? জানিস ও কতো বড়লোক! তোর মতো দশটা মেয়েকে ও ঝি রাখতে পারে। শেষকালে কিনা হিয়াকেই চোর বানাচ্ছিস!”
”সত্যি বলছি বেলাদি। আমায় বিশ্বাস করো। হিয়া এসেছিল, আবার বেরিয়ে গেল ওর বাবার বন্ধুর বাড়িতে। চকলেটের আধখানা আমায় দিল আর তোমার কৌটো থেকে ক্রিম নিয়ে নিজে মাখল আর আমাকেও মাখিয়ে দিল।”
”গপ্পো লেখ কোনি, তুই মস্তো লেখক হবি।” বেলার ধীরস্বরে বিদ্রূপ চাবকে উঠল।
”তাহলে তো একটা দ্বিতীয় ভাগ আগে কিনে দিতে হবে।” অমিয়া তার খাটে শুয়ে মিটিমিটি হেসে বলল।
”আমি সত্যি বলছি।” কোনির স্বর দুমড়ে মুচড়ে গেল কান্নায়। ”তোমরা বিশ্বাস করো। হিয়া এলে ওকে জিজ্ঞেস কোরে দেখো।”
ওরা আর বেশি কথা বলল না। নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি, ফিসফাস করল কিছুক্ষণ। কোনি দেয়ালে ঠেস দিয়ে কাঠের মতো বসে। প্রণতি ভাদুড়ি আর ধীরেন ঘোষ ঘরে ঢুকল। ওরা যেভাবে কোনির দিকে তাকাল তাতে বোঝা যায় যে ব্যাপারটা ওদের কানেও ইতিমধ্যে কেউ পৌঁছে দিয়ে এসেছে।
