কোনি কথা বলছে আর মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে ক্ষিতীশের দিকে। তখন চোখ সরিয়ে নিচ্ছে ক্ষিতীশ।
”মাদ্রাজ একেবারে সমুদ্রের ওপর। তবে নামিসনি যেন। গঙ্গা আর সমুদ্রে অনেক তফাত। সমুদ্রের তলায় কারেন্ট আছে।” ভাদু সাবধান করে দিল।
”কোনি মুশকিলে পড়বি খাবার নিয়ে। ইডলি ধোসা যা জিনিস, খেলেই মালুম পাবি। বাঙালীদের পেটে ওসব ঠিক সহ্য হবে না। ওখানে পৌঁছেই খোঁজ করবি বাঙালী হোটেল—ফোটেল কোথায় আছে।” কান্তি পরামর্শ দিল।
”না রে আমাদের সঙ্গে রান্নার জিনিসপত্তর, ঠাকুর সব যাচ্ছে।”
”তোর ভয় কচ্ছে?” ভাদু জিজ্ঞেস করল।
কোনি ছল ছল চোখে তাকাল।
”আরে ধেৎ তোর থেকেও কতো ছোট ছোট মেয়ে ওয়ার্ল্ড ঘুরছে একা। আর তুই তো অ্যাতোগুলো লোকের সঙ্গে যাচ্ছিস। ঘাবড়াসনি।” চণ্ডু হাত ধরল কোনির।
ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা পড়ল। ক্ষিতীশ কথা বলছিল একজনের সঙ্গে। মুখ ফিরিয়ে দেখল। কোনি তার দিকে তাকিয়ে, দু’গাল বেয়ে জল পড়ছে।
”ক্ষিদ্দা।” কোনি ধরা গলায় ডাকল।
ক্ষিতীশ না শোনার ভান করল।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে।
”আমার ভয় করছে ক্ষিদ্দা।”
ট্রেনের সঙ্গে হাঁটছে কান্তিরা। মুখ কাত করে কোনি জানলার শিকের ফাঁক দিয়ে দেখতে চেষ্টা করল ক্ষিতীশকে, দেখতে পেল না।
ঘণ্টা দুয়েক পর খড়্গপুর স্টেশনে ট্রেন থামল। কৌতূহলে কোনি প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ পাশ থেকে জানলার সামনে এসে দাঁড়াল ক্ষিতীশ।
”ক্ষিদ্দা!” কোনির চীৎকারে শুধু কামরারই নয়, প্ল্যাটফর্মেরও অনেকে ফিরে তাকাল।
”মনে আছে তো ঠিক দশটায় ঘুমোবি।”
”না।” অবাধ্য গোঁয়ারের মতো কোনি ঘনঘন মাথা দোলাল। টপ টপ করে চোখ থেকে জল ঝরছে। ”আমি কিচ্ছু শুনবো না, করবোও না। তুমি মাদ্রাজ যাবে, এটা আমার কাছে লুকিয়েছিলে কেন?”
একজন টিকিট চেকারকে এগিয়ে আসতে দেখে ক্ষিতীশ আড়ষ্ট হয়ে গেল। লোকটি তার পিছন দিয়ে চলে যাবার পর কোন কামরায় ওঠে, সেদিকে আড়চোখে নজর রাখতে রাখতে সে বলল, ”যাচ্ছি কে বলল, এখান থেকেই আমি কলকাতায় ফিরে যাব।”
”ইসস।” কোনি দু হাতে আঁকড়ে ধরল ক্ষিতীশের পাঞ্জাবির হাতা। ”যাও তো দেখি।”
”কেন আমি যাব! তুই কি কখনো আমার কথা ভাবিস?”
”ভাবি কি না ভাবি, তুমি তা জানো?”
”জানিই তো। জলে ডাইভ দিয়ে পড়ার পরই তো আমাকে ভুলে যাস।”
টিকিট চেকারটি আবার আসছে। কোনি উত্তর দেবার আগেই ক্ষিতীশ, ”কাল সকালে বহরমপুরে আসব,” এই বলেই সরে গেল।
কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে হরিচরণ একজনকে বলল, ”আপদটা দেখছি সঙ্গে চলেছে।”
কিন্তু সকালে ক্ষিতীশকে দেখা গেল না। বিনা টিকিটে ভ্রমণের জন্য রাত্রেই চেকারের হাতে ধরা পড়ে সে তখন রেল পুলিশের হেফাজতে।
।। ১৩ ।।
ঘরের একধারে এককোণে খাটে কোনি শুয়েছিল। রঙ ওঠা শতরঞ্চি আর বালিশ, গায়ে দেবার সুতির চাদর, মাথার কাছে টেবলে ক্যাম্বিসের ছোট ব্যাগ। তাতে আছে গোটা দুয়েক ফ্রক, আর ওর সব থেকে মূল্যবান সম্পত্তি কস্ট্যুমটা। টেবলে মাজন, ব্রাশ আর অর্ধেক দাঁত পড়ে যাওয়া একটা চিরুনী। খাটের নীচে চটি।
দুই বাহুতে চোখ ঢেকে কোনি শুয়েছিল, আর অন্যান্য মেয়েরা তখন বাইরে থেকে ফিরল। ওরা মাদ্রাজ শহর দেখতে, বাজার করতে বেরিয়েছিল। কোনি যায়নি, হাতে মাত্র পনেরোটি টাকা, তাই নিয়ে বাজার করা যায় না। শহর দেখার ইচ্ছাও নেই। ওর সঙ্গে কেউ কথা বলে না, হাবেভাবে মেয়েরা বুঝিয়ে দেয় সে ওদের সমপর্যায়ভুক্ত নয়। কোনিও এড়িয়ে চলে ওদের।
আজ আবার সকালে বেরোবার সময়, বেলা হঠাৎ বলে, ”প্রণতিদি, আমাদের সঙ্গে কোনি যাবে না?”
”না বলেছে তো, শরীর খারাপ, জ্বর—জ্বর লাগছে।”
খাটে শুয়ে উৎকর্ণ হয়ে রইল কোনি।
”তা হলে ঘরে কি ও একা থাকবে! কাল আমার ক্রিমের কৌটোয় খাবলা দেওয়া দেখেছি।”
”ওম্মা, বেলাদি, আমারও যে পেস্টের টিউবটা অনেকখানি খালি। ভয়ে আমি বলিনি, কি জানি কে আবার কি মনে করবে!”
”ঘরে তালা দিয়ে যাওয়া উচিত প্রণতিদি।”
”তা হলে কোনি কোথায় থাকবে!” প্রণতি ভাদুড়ির কড়া স্বরে ওরা চুপ করে গেছল।
লজ্জায় আর ভয়ে খাটের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে কোনি শুয়েছিল। থেকে থেকে চাপা একটা অভিমান গুমরে উঠছিল বুকের মধ্যে। ক্ষিদ্দা তাহলে সত্যি সত্যিই খড়্গপুর থেকে কলকাতায় ফিরে গেল! যদি এখানে সঙ্গে আসত তাহলে কষ্ট অনেক কমে যেত। অনেকের সঙ্গেই তো বাবা—মা এসেছে। ক্ষিদ্দা তাহলে এল না কেন!
হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল হিয়া। ওর বাবা—মা হোটেলে রয়েছে। তারা সকালে এসে হিয়াকে নিয়ে বেরিয়েছিল। ঘরে কাউকে না দেখে হিয়া প্রথমে থমকে গেল। তারপর কোনিকে দেখতে পেয়ে বলল, ”বাবার বন্ধু মিস্টার সারঙ্গপানির বাড়িতে আমি যাচ্ছি, প্রণতিদিকে বলে দিও। ঘণ্টা দুই পরে ফিরব।”
ঘরের আর একদিকে হিয়ার খাট। সেখানে তার বিরাট স্যুটকেশে অজস্র রকমের জিনিস। ইংরাজি কমিকস, আর ট্রানজিস্টর রেডিও বিছানায়, খাটের নীচে তিন রকমের জুতো আর চকোলেটের মোড়ক ছড়ান। হিয়া চটপট ফ্রক বদল করে চুলে ব্রাশ বোলাল। হাত ব্যাগটার মধ্যে একটা চকোলেটের বার দেখতে পেয়ে আধখানা মুখে ঢুকিয়ে বাকিটুকু ভেঙ্গে কোনির দিকে ছুঁড়ে দিল।
টুকরোটা এসে পড়ল কোনির বুকের কাছে। সেটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল হিয়ার দিকে। হিয়ার গায়ে লাগল।
