”হিয়া না আসা পর্যন্ত তোমাদের অপেক্ষা করা উচিত ছিল।” প্রণতি ভাদুড়ি ঘরের সবাইকে লক্ষ করে বলল। ”যাও, খেয়ে রেস্ট নাও।”
”অমিয়া, কাল সকালে তোর ফোর আর টু হানড্রেড হীট। যোশি ছাড়া আর কেউ তোর কম্পিটিটার নেই। তা হলেও হীটে টাইম ভাল করতে হবে। বেলা শুনে রাখ, যোশি পড়েছে তোর গ্রুপে। চেষ্টা করবি, পাঞ্জাবের কাউর বলে একটা মেয়ে শুনলাম ভাল টাইম করে এসেছে।”
ধীরেন ঘোষ প্রত্যেককে নির্দেশ দিতে দিতে শেষকালে কোনির দিকে তাকাল। ”তোর নাম যে কেন বাদ গেল বুঝছি না। বলছে তো পাঠানোই নাকি হয়নি। সব বাজে কথা, নিজেদের দোষ ঢাকতে এখন এইসব বলছে। আমি অবশ্য প্রোটেস্ট করেছি, দেখি কি হয়। তবে প্র্যাকটিসে ঢিলে দিলে চলবে না, ওটা রেগুলার করতেই হবে। মন খারাপ করিসনি, ন্যাশনাল তো বছর বছরই হয়, সামনের বছর আবার আসবি।”
মেয়েরা খাওয়া সেরে এসে বিছানায় শুয়েছে, এমন সময় হিয়া ফিরল। কোনি না খেয়েই শুয়েছিল, হিয়াকে দেখা মাত্র উঠে বসে চেঁচিয়ে বলল, ”এই তো হিয়া এসেছে।”
বেলা হাত ধরে হিয়াকে নিজের বিছানায় বসিয়ে বলল, ”আজ একটা ব্যাপার ঘটেছে। কোনি তোমাকে চোর বলেছে।”
”হোয়াট!” ঝটকা দিয়ে হিয়া উঠে দাঁড়াল দু’চোখে আগুন নিয়ে।
”বোসো বোসো, আগে আমার কথাটা শুনে নাও।” বেলা হাত ধরে টেনে হিয়াকে বসাল আবার।
”আমি জানি আমার প্রতি ও জেলাস। কিন্তু এমন নোংরা অপবাদ দেবে ভাবিনি।”
”আমরাও ভেবেছি নাকি! ক্রিম চুরি করে মুখে মেখে ধরা পড়ে গিয়ে বলেছে তুমি নাকি মাখিয়ে দিয়েছ। এমন বোকার মতো মিথ্যে কথা কেউ বলে!”
হিয়া থতমত খেয়ে গেল। প্রচণ্ড রাগটা মাথা থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে যে ধাক্কাটা দিচ্ছে তা সামলে উঠে সে বলল, ”ক্রিম তো আমিই ওর মুখে লাগিয়ে দিয়েছি।”
”য়্যা!”
”হ্যাঁ তোমার কৌটোটা থেকে আমি মাখলাম, কোনির মুখেও লাগিয়ে দিলাম। কি করব বলো, তোমার পারমিশন নেবার সময় তখন ছিল না। কালও মেখেছিলাম।”
হিয়া ব্যাপারটা সেখানেই শেষ করে দিয়ে, পোশাক বদলাতে ব্যস্ত হল। সারা ঘর চুপ। আড়চোখে পরস্পরকে দেখে নিয়ে অনেকেই ঘুমের ভান করল। কোনি একদৃষ্টে হিয়ার দিকে তাকিয়ে। মনে মনে সে বলল, ‘তোমার খেয়ালখুশির জন্য আজ আমি চড় খেয়েছি, খারাপ কথা শুনেছি।’
বেলা অপ্রতিভ হয়ে চুপ করে গেছল। এখন তার রাগটা পড়ল হিয়ার উপর। বিরক্ত স্বরে সে বলল, ”পরের জিনিস না বলে ব্যবহারটা খুব অন্যায়। তোমার নয় অনেক টাকা আছে, আমার এই একটুখানি ক্রিম থেকে যদি সবাই মাখে…”
”আচ্ছা আচ্ছা, নয় তোমায় একটা কিনে দেব, হয়েছে তো।” হিয়া হেসে অপরাধীর মতো মুখ করে হাতজোড় করল। ঠিক সেই সময়ই কোনি ছুটে এসে ওকে চড় মারল।
হিয়া গালে হাত দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। বিছানায় মুহূর্তে সবাই উঠে বসেছে। কোনি ধীর পায়ে নিজের খাটে ফিরে এসে বসল।
”এটা তোমার পাওনা ছিল। বেলাদিকে জিজ্ঞাসা করো, জানতে পারবে। তোমার জন্যই আমি আজ চড় খেয়েছি, চোর বদনাম পেয়েছি।” কোনি একটু থেমে আবার বলল, ”তোমাকে আমি একটুও হিংসে করি না। আমি বস্তির মেয়ে, লেখাপড়াও জানি না, তোমার সঙ্গে পারব কেন। তবে একবার কখনো যদি জলে পাই…” দাঁতে দাঁত চেপে বাকি কথাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় কিছু শোনা গেল না।
।। ১৪ ।।
চিপকে সমুদ্রতীরে সুইমিং পুল।
কোনি আগে কখনো এমন পুল দেখেনি। যন্ত্রের সাহায্যে অবিরাম পরিশোধিত স্বচ্ছ জলের মধ্য দিয়ে পুলের তলদেশ দেখা যায়। একটা পিন পড়ে থাকলেও নজরে আসে। কোনি শুনেছে কলকাতায় সাহেবদের ক্লাবে এমন পুল আছে।
তিনদিকে কাজুবাদাম গাছের ডাল দিয়ে তৈরী হয়েছে গ্যালারি, মাথায় নারকেল পাতার ছাউনি। পাশেই ডাইভিং পুল। পুলের জলে প্রথম নেমে কোনি অস্বস্তি বোধ করেছিল। জলের সঙ্গে পরিচয়ের অনুভব পেতে অবশ্য তার বেশি সময় লাগেনি। হাতে স্টপ ওয়াচ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ক্ষিতীশ দাঁড়িয়ে নেই অথচ সে সাঁতার কাটছে, কোনি গত একবছর আর তা ভাবতে পারে না। কিন্তু মাদ্রাজে সে জলে নামার আগে পিঠে পরিচিত একটা হাতের স্পর্শ অভ্যাস মত না পেয়ে মুষড়ে পড়ল। কি ট্রেনিং সে করবে, বুঝে উঠতে পারছে না। কেউ কিছু বলছে না, দেখিয়েও দিচ্ছে না। হিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত প্রণবেন্দু। হরিচরণের অধিকাংশ নির্দেশ অমিয়ার জন্য। তবু কোনি মোটামুটি জোরে ৪০০ মিটার ফ্রি স্টাইল,কয়েকটা ২৫ মিটার স্প্রিন্ট, আবার ৪০০ মিটার, মিনিট পাঁচেক টার্ন ও স্টার্ট, তারপর ২০০ মিটার মেডলি কাটলো।
স্টার্টিং ব্লকে বসে কস্ট্যুম পরা একটি মেয়ে ওদের ট্রেনিং দেখছিল। কোনি জল থেকে উঠে তার পাশ দিয়ে যাবার সময় মেয়েটি হাসল।
”হোয়াটস ইওর নেম?”
”মাই নেম ইজ কনকচাঁপা পাল।”
”ইউ হ্যাভ এ বিউটিফুল স্টাইল।”
কোনি এবার ফাঁপরে পড়ল। ইংরাজীতে জবাব দেওয়ার দায় এড়াবার জন্য সে শুধু হাসল। মেয়েটি আঙুল তুলে হিয়াকে দেখিয়ে বলল, ”ইজ শী এ ফ্রি স্টাইলার?”
”কেয়া বোলতা?”
”উও ফ্রি স্টাইলার হ্যায়?”
”হাম হ্যায়। ও হ্যায় ব্রেস্ট স্ট্রোককা, মেডলিকা। তোমার স্ট্রোক কেয়া?”
মেয়েটি হেসে বলল, ”রমা যোশি।”
কোনি এবার ভাল করে তাকাল। শ্যামলা মাজা রঙ, দোহারা গড়ন। চুল ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা। সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতোই দেখতে। হঠাৎ তার চোখে ভেসে উঠল ‘৭০’ সংখ্যাটা। কোনি দ্রুত ড্রেসিং রুমের দিকে পা চালাল।
