”তিন নম্বরে কে যাবে?’ জহর সবার মুখের দিকে তাকালেন।
সমু আর কিঙ্কর একসঙ্গে বলে উঠল, ”আমি।”
‘পঞ্চাশের মধ্যে উইকেট পড়লে সমু, আর পরে পড়লে কিঙ্কর, তারপর এই বুড়ো—প্যাড আপ।”
বুড়োকে আর নামতে হয়নি। উইনিং স্ট্রোকটা ছিল শুভ্ররই—সুইপ করে সে পৌঁছয় আটাত্তরে। সত্তর রানে প্রথম উইকেট পড়ায় কিঙ্কর ব্যাট করতে নেমেছিল। প্যাড খুলতে—খুলতে সমু বলে, ”শুভ্রই দেখছি ম্যান অব দ্য ম্যাচ! জহরদা ওকে বোলারও বানিয়ে দিলেন।”
”পরের ম্যাচে তুমি হওয়ার চেষ্টা কোরো।”
জহরও প্যাড খুলছিলেন। নিচু স্বরে কথাটা বলে আঙুলের ইশারায় অভিরূপ আর সিদ্ধার্থকে ডাকলেন।
”দুজনে দু’ওভার বল করেছ, একটা করে উইকেট পেয়েছ। দু’জনেই একটা করে মেডেনও পেয়েছ। অভিরূপ চার আর সিদ্ধার্থ দুটো রান দিয়েছ সুতরাং দারুণ বল করেছ অথচ তোমাদের আর বল দিলুম না—কেন?”
দু’জনে এমন একটা প্রশ্নে বিভ্রান্ত এবং অবাক চোখে শুধু তাকিয়ে রইল।
”বলগুলো ফেলছিলে কোথায়? বারোটা করে বল করলে তার আদ্ধেকই তো স্টাম্পের দু’হাত বাইরে দিয়ে গেল। অতটা দৌড়ে এসে বল করো কেন? রান—আপ ছোট করো, জোরে বল করার চেষ্টাটা কমাও, বল ডেলিভারি দেওয়ার আগে থমকে যাচ্ছিলে। কপিলদেবের বোলিং অ্যাকশন ভাল করে লক্ষ করোনি?… পরের ম্যাচটা কবে?…. কাল অবশ্যই রাজনারায়ণ পার্কে এদের দু’জনকে নিয়ে আসবে সমু।” জহর নির্দেশ দিলেন।
পরের ম্যাচই ইস্টার্ন রেলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠা গড়িয়া অগ্রগামীর সঙ্গে তিনদিন পরে। অন্য সেমিফাইনালে ব্রাদার্স ইউনিয়ন উঠেছে রাজস্থানকে হারিয়ে। মাণ্টু সিং সেঞ্চুরি করেছে, ওমকিশোর নিয়েছে সাতটা উইকেট। এবার ওরা খেলবে শালিমার স্পোর্টিংয়ের সঙ্গে।
গড়িয়ার সঙ্গে ম্যাচটায় ফুলবাগান স্বচ্ছন্দে জিততে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। একশো তিয়াত্তর রান তুললে জিতবে, এমন অবস্থায় ইনিংস শুরু করে ফুলবাগানের তিন উইকেটে দেড়শো, বত্রিশ ওভার খেলে। শুভ্র ব্যাট করছিল আশি রানে। সেঞ্চুরি প্রায় অবধারিত। একটা ফুলটস বল অবহেলাভরে লং অন বাউন্ডারির ওপর দিয়ে তুলতে গিয়ে ধরা পড়ল বাউন্ডারির কিনারে। তারপর পাঁচজন ব্যাটসম্যান ফিরে এল ষোলো রান যোগ করে। ফুলবাগানের হাতে দুই উইকেট, দরকার তেরো রান। জহর তখন খেলতে নামেন কপালে ভাঁজ তুলে।
”একটা একটা করে রান… ম্যাচ জিতে যাব। আঁকুপাকু কোরো না। কল না করলে শর্ট রান নিয়ো না।” জহর ক্রিজে এসে জয়দেবকে বলে দেন। এই মরসুমে জয়দেবের সর্বোচ্চচ রান আট। ”আর এই অফব্রেক বোলারটাকে ফরওয়ার্ড খেলো না।” বাধ্য ছেলের মতো জয়দেব ঘাড় নাড়ল।
গড়িয়ার পাঁচজন ঘিরে ধরল জহরকে। ওভারের বাকি পাঁচটি বল জহর আটকালেন। এবার উৎকণ্ঠিত হয়ে বোলার প্রান্ত থকে জয়দেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে—মনে ভগবানকে ডাকলেন: ছেলেটাকে ছ’টা বল পার করে দাও।
অফস্পিনারের প্রথম বলটাতেই জয়দেব লাফিয়ে বেরিয়ে এসে ব্যাট চালাল। জহর ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। দর্শকদের হর্ষধ্বনি শেষ হতে চোখ খুললেন। জয়দেবের মুখ হাসিতে ভরা। জহর কড়াচোখে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতেই, জয়দেবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। পরের চারটে বল সে পিছিয়ে এসে কোনওরকমে আটকাল। জহর খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, এইভাবে খেলো। ষষ্ঠ বলটায় জয়দেব আবার লাফিয়ে বেরোল। জহর চোখ বন্ধ করলেন। আবার হর্ষধ্বনি তিনি শুনলেন। ওভার শেষ, জিততে দরকার আর—একটা রান। দুটো বল থেকে এসেছে বারো রান।
”এটা কী হল?” জয়দেবকে ডেকে জহর বললেন, ”পই—পই করে বললুম—।”
”কী করব জহরদা, উইকেটকিপারটা অনেকক্ষণ ধরে পেছনে লেগেছে, খালি কানের কাছে বলে যাচ্ছে, ‘এইবার ব্যাটা ক্যাচ দেবে, এইবার স্টাম্প করব। … ব্যাট করতে জানে না, এক বলের খদ্দের’, শুনলে মাথা গরম হবে না? বলুন?”
জহর ঢোক গিলে বললেন, ”তা হলে তো হবেই।”
প্রথম বলটাতেই জহর পা বাড়িয়ে জোরে ঠেলে দিলেন। একস্ট্রা কভারে লোক নেই। ‘রাইট’ বলে চেঁচিয়ে ছুটলেন রান নিতে। ছোটবেলায় তিনি শুনেছিলেন, ব্র্যাডম্যান রান নেবার জন্য কল করেন ‘রাইট’ বলে। অভ্যাসটা তখন থেকেই তৈরি করেন।
ড্রেসিংরুমে ফিরে জহর দেখলেন রামবাবুকে। ”এতক্ষণ ওপরের গ্যালারিতে বসে ছিলুম। ঠিক করেছিলুম না জিতলে চুপচাপ বাড়ি চলে যাব।” রামবাবু খুশিতে জহরের কাঁধ ধরে ঝাঁকালেন। ”যেরকম ঝপঝপ পাঁচটা উইকেট পড়ে গেল, ভাবলুম ম্যাচ বুঝি এইখানেই খতম হয়ে গেল। ছেলেটা যে অমন দু’খানা ছক্কা হাঁকাবে কে জানত! আপনি নিশ্চয় মারতে না বললে কি মারত?”
”এজন্য যাবতীয় ক্রেডিট ওদের উইকেটকিপারের। আমি কিছুই বলিনি।” ধীর গলায় জহর জানিয়ে দিয়ে জয়দেবকে ডেকে বললেন, ”এবার থেকে পকেটে তুলো নিয়ে ব্যাট করতে নামবে, কানে দেওয়ার জন্য।”
”আবার তা হলে আমরা ফাইনালে উঠলুম জহর।” হেমন্ত গুহ বললেন, সন্দেশের বাক্স সামনে ধরে। তাঁর কণ্ঠস্বরে অনিশ্চয়তার আভাস। জহর একটা তুলে নিলেন। ”বোধহয় ব্রাদার্সের সঙ্গেই আবার খেলাটা হবে, শুনছি শালিমার নাকি খেলবে না। কীসব গণ্ডগোল হচ্ছে, পেমেন্ট নিয়ে, ছ’জন খেলবে না বলেছে।”
”আপনি কি ভয় পাচ্ছেন ফাইনাল নিয়ে?” সন্দেশ চিবোতে—চিবোতে জহর বলেন। ”তা হলে একটা গল্প বলি। গল্প হলেও কিন্তু সত্যি ঘটনা… ওহে তোমরা এদিকে এসো, একটা গল্প বলব।” জহরের ডাক শুনে পাঁচ—ছ’টি ছেলে এগিয়ে এল।
