জে সি মুখার্জি ট্রফির খেলায়ও ফুলবাগান ব্রাদার্সের সামনে পড়েনি। এরিয়ানের কাছে বাইশ রানে হারে। লো স্কোরিং ম্যাচ, কোনও ব্যাটসম্যানই পঞ্চাশে পৌঁছতে পারেনি, তবে জয়দেব হ্যাটট্রিক করে পাঁচটা উইকেট পায়, অনুপ দুটো। ফুলবাগানের আক্রমণ বলতে এখন শুধু দুই স্পিনার, অনুপ আর জয়দেব। ব্রাদার্স ইউনিয়ন জে সি মুখার্জি ট্রফিও জিতে নিল ইস্টবেঙ্গল এবং এরিয়ানকে হারিয়ে। ট্রফি জেতার হ্যাটট্রিক করে তারা শেষ মুকুটটা মাথায় তোলার জন্য খেলতে নামল পি সেন ট্রফির টুর্নামেন্টে।
মরসুমের একেবারে শেষে ক্রিকেটাররা ক্লান্ত, তার ওপর প্রচণ্ড গরম। কারও মাঠে নামার ইচ্ছা নেই। খেলা দেখিয়ে বাংলা বা পূর্বাঞ্চল দলে ঢোকার তাগিদও উবে গেছে, কেননা জাতীয় প্রতিযোগিতাগুলোও শেষ হয়ে গেছে। ফুলবাগান দলের পুরনোদের মধ্যেও উৎসাহ নেই। যারা টাকা নিয়ে খেলে তাদের খেলতেই হবে। তবে দু’জন জানিয়েছে তাদের চোট আছে, খেলা অনিশ্চিত। জয়প্রকাশ হায়দরাবাদে বদলি হওয়াটা আটকেছে তদ্বির করে। শোনা যায় পানু পোদ্দার নাকি এই ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছে। জয়প্রকাশ ক্লাবে আসছে না। নতুন ছেলেরা—সমু এবং কৌশিক, সিদ্ধার্থ, অভিরূপ—অবশ্য খেলার জন্য মুখিয়ে আছে।
রাজনারায়ণ পার্ক থেকে জহর সকালে দোকানে চলে আসে। সেদিন পার্ক থেকে বেরিয়ে দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে তখন একটা অ্যাম্বাসাডার তার পাশে এসে থামল।
”জহর… তোমার কাছেই যাচ্ছিলুম।” গাড়ির জানলায় হেমন্ত গুহর মুখ। জহর এগিয়ে এল।
”কী ব্যাপার?”
”গাড়িতে বসে কথা বলব। উঠে এসো।” দরজা খুললেন হেমন্ত গুহ। জহর উঠলেন।
”ক্লাবে আসো না কেন?”
”গিয়ে কী হবে! আমাকে খেলাবার জন্য তো আপনি নেননি। রামবাবুকে খুশি করতে আমায় নিয়েছিলেন।”
”রাগ করেছ। তা করতে পারো। কী জানো, দরকারে পড়লে তোমায় নামাব বলে নিয়েছিলুম। নিয়মিত যারা খেলে তারাই খেলুক, আমি তাই—ই চেয়েছি, তোমার তো আর বেঙ্গল টিমে ঢোকার অ্যাম্বিশন নেই যে পারফরম্যান্স দেখাতে হবে।”
”কে বলল আমার অ্যাম্বিশন নেই? নিশ্চয়ই আছে।” জহরের গলা হঠাৎ চড়ে গেল। ”আমি একষট্টি বছর পর্যন্ত খেলতে চাই।”
হেমন্ত গুহ বিভ্রান্ত মুখে বললেন, ”একষট্টি বছর কেন?”
জহরের উত্তেজনা চুপসে গেল হঠাৎ চড়ে ওঠার মতো। মৃদুস্বরে বললেন, ”সে আপনি বুঝতে পারবেন না।”
”কেন পারব না, একষট্টি বছর কেন?”
”ছোটবেলায় আমার আইডল ছিলেন সি কে নাইডু। তিনি ওই বয়স পর্যন্ত রনজি ট্রফি খেলেছিলেন।”
”অ, এই কথা!” হেমন্ত গুহ হেসে ফেললেন। ”বেশ তো তুমিও খেলবে। এ—বছর তো একটা ম্যাচও খেলোনি। তা হলে একবার মাঠে নামো। পি সেন ট্রফিতে খেলো, খেলবে?”
জহর জানেন তাঁকে খেলাবার জন্য কেন এই লোকটির গরজ। ক্লাবে এখন এগারোজন নামাবার মতো প্লেয়ার হচ্ছে না। তিনি আগ্রহ না দেখিয়ে নিরাসক্ত স্বরে বললেন, ”প্রথম খেলা কার সঙ্গে?”
”শিলিগুড়ি ইলেভেনের সঙ্গে।”
”তারপর কার সঙ্গে পড়বে?”
”আগে জিতি, তারপর তো কার সঙ্গে পড়বে দেখা যাবে!”
”আচ্ছা, যাব।”
.
শিলিগুড়ির সঙ্গে ম্যাচটা ফুলবাগান জিতল ন’ উইকেটে। জহর অধিনায়ক। টস জিতে ফিল্ড করবেন ঠিক করেন। তাঁর দুই ওপেনিং বোলার, অভিরূপ আর সিদ্ধার্থ, প্রথম চার ওভারে ওপেনার দু’জনকে বোল্ড করে ছয় রান দিয়ে। শিলিগুড়ির তিন ও চার নম্বর বেপরোয়া ব্যাট চালিয়ে বত্রিশ রান তোলে। জহর দুই বোলারকেই বদল করে অনুপ ও জয়দেবকে আনেন দশ ওভার পর। উইকেটকিপার কিঙ্কর স্টাম্পড করল তিন নম্বরকে অনুপের বলে। চার ও পাঁচ নম্বর আটত্রিশ থেকে রান টেনে নিয়ে গেল ছিয়াশিতে। জহর অনুপের জায়গায় আনলেন শুভ্রকে। রাজনারায়ণ পার্কে তিনি ওকে নেটে বল করতে দেখেছেন। মিডিয়াম পেসে শুভ্রর বল লেগকাট করে। লেংথে বল রাখে, অবাক হয়ে গেছল যখন জহর তার হাতে বলটা দেন, ”আমি!”
”হ্যাঁ, যে বল নেটে করতে তাই করো।”
সীমায়িত ওভারের খেলায় যা দেখা যায় না এবার তাই দেখা গেল—স্লিপ ফিল্ডার। একজন নয়, দু’জন। শুভ্রর প্রথম দুটো বল শর্ট পিচ। প্রথমটায় চার, পরেরটায় তিন, মিড উইকেট থেকে। তৃতীয় বল লেগ স্টাম্পে ভাল লেংথে। ব্যাটসম্যান ঝুঁকে বলটা আটকাতে গেল। ব্যাটের কানা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল বল। স্লিপ থেকে জহর হাততালি দেন। পরেরটাও একই বল একই জায়গায়, একই ভাবে খেলতে গেল ব্যাটসম্যান। ব্যাট ছুঁয়ে বল এল জহরের ডান কাঁধের দিকে। লুফতে অসুবিধা হল না। চার উইকেটে চুরানব্বই। এর পর শিলিগুড়ির ব্যাটসম্যানরা আস্থা নিয়ে শুভ্রকে আর খেলতে পারল না। তেত্রিশ ওভারের মধ্যেই শিলিগুড়ি একশো পঁয়ত্রিশ রানে ইনিংস শেষ করে ফেলে। শুভ্র ছ’টা উইকেট নেয় বিয়াল্লিশ রানে।
শুভ্র ওপেনার নয় কিন্তু ওকেই জহর ওপেন করতে বললেন নিয়মিত ওপেনার কৌশিকের সঙ্গে।
”আমি! আমি তো কখনও নতুন বল ফেস করিনি!”
”ধরো প্রথম ওভারে তিনজন আউট হয়ে গেল। এবার তোমার নামার কথা। তখন কি তুমি বলবে, আমি তো নতুন বলে খেলতে পারব না!”
শুভ্র আর কথা না বলে প্যাড পরতে শুরু করে।
”কখনও খেলোনি বলেই খেলবে, আমি জীবনে কখনও ওপেন করিনি, কিন্তু ওড়িশার এগেনস্টে প্রথম ওপেন করে সেঞ্চুরি করেছি। সবরকম পরিস্থিতির জন্য নিজেকে তৈরি করে রাখবে। যাও… ধরে খেলো, ওয়ান ডে ম্যাচ বলে প্রথম থেকেই মারতে যেয়ো না।… আর—একটা কথা উইনিং স্ট্রোকটা তোমার কাছ থেকেই আশা করব।” জহর কথাগুলো বলে শুভ্রর কাঁধে চাপড় দিলেন। ড্রেসিংরুমের সবাই জহরের দিকে তাকিয়ে।
