শুভ্র ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ট্রাউজার্সের মধ্যে শার্টটা গুঁজতে—গুঁজতে। দু’পায়ে প্যাড। যে ছেলেটি ব্যাট করছিল সে গ্লাভস খুলে দিল, নেটের ভেতর ঢুকে শুভ্র গার্ড চাইল বেজার কাছে, ”ওয়ান লেগ।”
জহর দাঁড়ালেন নেটের পেছনে। তিনজন বল করছে। বেজার প্রথম বলটা পেয়ে শুভ্র পিছিয়ে এসে আলতো ঠেলে দিল কভারে। পরের বোলারের বলটাকেও তাই করল। তৃতীয় বোলারের বলটা গ্লান্স করল অলসভাবে। বেজার দ্বিতীয় বল শর্ট পিচ, প্রচণ্ডভাবে স্কোয়ার কাট করল সে। নেট ঝাঁকিয়ে উঠল। পেছন থেকে জহর বললেন, ”পারফেক্ট।” বেজার তৃতীয় বলটা হাফ ভলি অফস্টাম্পের বাইরে, পা বাড়িয়ে ড্রাইভ করল শুভ্র। নেটে না আটকালে একস্ট্রা কভার বাউন্ডারিতে যেত। ওর মুখে প্রশান্তি ফুটে উঠল। বেজা পঞ্চম বলটা ফ্লাইট করাল, মন্থরগতিতে ভেসে এল লেগ স্টাম্পের উপর, একটু শর্ট পিচ। শুভ্র এগোতে গিয়েও পিছিয়ে এসে পুল করল। জহর মনে—মনে হাসলেন। বেজার ষষ্ঠ বলটা দৃশ্যত একই রকমের। তবে ফ্লাইট আগেরটার থেকে সামান্য বেশি। শুভ্র এক—পা বেরিয়ে ব্যাট নামাতে গিয়ে থামিয়ে ফেলল। আগের থেকে শর্ট পিচে বল পড়ছে। বেরিয়ে আসার ভুলটার মাসুল দিল বেজার হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে।
ফরসা মুখটা লালচে হয়ে গেল। আড়চোখে শুভ্র পেছনে তাকাল। জহর হাসছেন। থমথমে হয়ে গেল শুভ্রর মুখ। বেজার পরের চারটে বলে হুঁশিয়ার হয়ে সে পা বাড়িয়ে ঠেলে দিয়ে পরপর স্কোয়ার কাট, পুল আর ড্রাইভ করল এবং তারপরের বলটায় বেরিয়ে এসে অন—এ ঠেলে দিতে গিয়ে ক্রিজ থেকে একহাত বাইরে দাঁড়িয়ে চকিতে সে পেছনে তাকিয়ে দেখল লেগস্টাম্প ঘেঁষে বলটা বেরিয়ে গেল।
”স্টাম্পড!” জহর নির্বিকার মুখে বললেন, ”চোদ্দো বলে দু’বার আউট।”
শুভ্র একটা কথাও না বলে নেট থেকে বেরিযে এসে প্যাড খুলতে লাগল। সমু বলল, ”কী হল, আর খেলবি না?”
শুভ্র মুখ তুলে নিচু স্বরে বলল, ”বুড়োটা একটা হাড়বজ্জাত। ঘোল খাওয়াবে বলে আমাকেই কিনা বেছে নিল।”
”সমু এবার তুমি যাও।” জহর কাছে এসে বললেন।
‘না জহরদা, আমার আঙুলে একটা চোট রয়েছে, ভাল করে ব্যাট ধরতে পারছি না।” মুখ কাঁচুমাচু করল সমু।
জহর বুঝলেন। বেজাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বুঝলি?”
”ভালই তো।”
”হবে?”
”হবে না কেন! প্র্যাকটিস করুক, খেলুক, খাটুক, ঠিক হবে। … তবে ডিসিপ্লিনড থাকতে হবে।”
”যেন তেলেভাজা না খায়।” জহর এক চোখ বন্ধ করে তাকালেন।
”বাচ্চচা ছেলেদের সামনে বেইজ্জত করিসনি। … শোনো তোমরা, আমাকে যদি তোমাদের কাজে লাগে তা হলে বোলো।”
”বলবে মানে? ওরা বলবে? ওরা কে? … আমি বলছি। শুভ্র, সমু আমি নিজে দেখেছি বরকতকে সাতটা উইকেট পেতে। পুরো ফুলবাগান টিম এখানে এই স্কুলে ভর্তি হয়ে শুধু ব্রজেন হালদার, ওই বুড়োটার কাছে প্র্যাকটিস নাও। ওকে টাকা দিতে হবে সেজন্য।”
”না, না, জহর, ও কী কথা বলছিস, টাকা নেব কী!”
”বেজা চুপ কর।” জহর ধমকে উঠলেন, ‘বিনি পয়সার শিক্ষা পেলে কেউ মানুষ হয় না। সব জায়গায় দেখেছি ফোকটসে পাওয়ার ধান্দা, তাই কিছু হল না এ—দেশটার।”
”জহর, আমাকে পয়সা নিতে বলিসনি। আমি অন্য জমানার প্লেয়ার, কোনওদিন টাকা নিয়ে খেলিনি। এইসব ছেলের যদি কোনও উপকারে লাগি, যদি একটা ছেলেও টেস্ট খেলে তা হলেই আমার ফিফটি হবে। … তোমরা ভাই আমাকে যতটা কাজে লাগাতে পারো লাগিয়ো।”
”লাগাব। শুধু আপনাকে নয়, জহরদাকেও। আমাদের জেনারেশনটাকে খুব বোকা ভাববেন না।” শুভ্র সপ্রতিভ সটান গলায় উদ্ধত ভঙ্গিতে বলল, ‘আপনাকে চোদ্দো বলে দু’বার আউট করতে দেব না।”
”জহরদা, আপনি তা হলে ক্লাবে আসছেন না!” সমু প্রসঙ্গ বদল করে আসল কথায় এল।
”যাওয়ার তো কোনও দরকার মনে করছি না। হেমন্ত গুহ কি তোমাদের পাঠিয়েছে?”
”না, আমরা নিজেরাই এসেছি।”
”আমার বয়স হয়েছে, একটা সম্মানও আছে। সেক্রেটারি নিজে বলুক যেতে, তা হলে ভেবে দেখব,” দৃঢ়স্বরে জহর জানিয়ে দিলেন। ওরা আর অনুরোধ করল না।
ফুলবাগানের চারজন ছেলে রাজনারায়ণ কোচিং স্কুলে ভর্তি হল টাকা দিয়ে। অনুপ, জয়দেব, সমু আর শুভ্র। ভীষণ খুশি বেজা হালদার। এখন সে দু’বেলা আসতে শুরু করেছে। বিকেলে তিনটের সময় অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে পৌনে চারটের মধ্যে নেটে হাজির হয়ে যায়। সব কোচই টাকা পায়। জহর প্রতাপকে বলেছিলেন বেজাকে টাকা দিয়ে রেখে দিতে। প্রতাপ রাজিও হয়েছিল। অনীশ সেনকে সে ছাড়িয়ে দিয়েছে তাকে দিয়ে কোনও কাজ পাওয়া যায় না বলে। প্রতাপ সেই জায়গায় বেজাকে মাইনে দিয়ে রাখার প্রস্তাব মেনে নেয়। বেজা সানন্দে রাজি হয় শুধু একটি শর্তে—টাকা নেব না।
অনুপ আর জয়দেবকে পেয়ে বেজা খুশি। প্রধানত এই দু’জনকে নিয়েই সে পড়ে থাকে। ওরাও ‘বেজাদা’র অনুগত চেলা হয়ে গেছে। নেটে যাকে পায় তাকেই বল করে যায় আর বেজার নির্দেশ—উপদেশ প্রতি বলে প্রয়োগ করে—করে বোলিংয়ে শান দেয়। সমু আর শুভ্র ব্যাট করার সময় জহর নেটের পেছনে দাঁড়ান। যদি কিছু বলার থাকে, বলেন, দুই উইকেটের মাঝে প্যাড পরে ব্যাট হাতে দৌড়নো, বল ধরে উইকেটে ছোড়া, ক্যাচ ধরা, এইসবও তিনি ওদের করান, সেইসঙ্গে ব্যায়ামও।
সি এ বি নক আউটে ফুলবাগানকে ব্রাদার্সের মুখোমুখি হতে হল না, প্রথম ম্যাচেই এক উইকেটে হেরে যায় মোহনবাগানের কাছে। বলার মতো পারফরম্যান্স—জয়দেব চারটে উইকেট পেয়েছিল, সমু করেছিল তেষট্টি রান। শুভ্র একচল্লিশ রান করে আঙুলে চোট পেয়ে রিটায়ার করে। ম্যাচটা মোহনবাগান কোনওক্রমে জেতে। ফাইনালে ব্রাদার্স মোহনবাগানকে পঁচাত্তর রানে হারিয়ে লিগ ও নকআউট দুটোই পেয়ে যায়। ওমকিশোর, মান্টু আর বরকতরা পানু পোদ্দারের অর্থব্যয় সার্থক করে দেয় দুর্দান্ত ফর্মে থেকে।
