”দেখলেন তো …. পানু পোদ্দার তা হলে ভালই দিয়েছে। এই ক্যাচ কখনও ওর হাত থেকে পড়বে? বিশ্বাস করতে হবে?” বলতে বলতে লোকটি গ্যালারি থেকে নেমে গেল। ”আর দেখে কী হবে, ম্যাচ তো খতম। এভাবে যে হারবে—।”
জহর শেষপর্যন্ত বসে রইলেন। ব্রাদার্স আট উইকেটে জিতে বদলা নিল। ফুলবাগান টেন্টের সামনে একটা হইচই হচ্ছে। জহর গ্যালারি থেকে নেমে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। বিক্ষোভ দেখাচ্ছে যারা, তাদের মূল বক্তব্য, এত নতুন ছেলে দিয়ে কেন টিম করা হয়েছে? তারপর তাদের রাগ জয়প্রকাশের ওপর।
”ওর মত ভেটারেন, ওইরকম সময়ে কিনা ওইভাবে মারতে গেল!”
”অনেকদিন তো খেলা হয়ে গেল, আর কেন! এবার বিদেয় হোক।”
”বিদেয় করে কাকে খেলাবেন, নতুনদের? দেখলেন তো, ওই সমর দত্ত ছাড়া আর একজনও তো দাঁড়াতে পারল না।”
জহর যে ফুলবাগানে এই বছর এসেছেন, সমর্থকদের কেউই তা জানে না বা জানলেও খেয়াল রাখেনি। তাঁকে কেউ চিনলও না। তিনি ভিড়ের মধ্যে সবারই কথা শুনছেন। এখন যারা জয়প্রকাশের মুণ্ডু চাইছে, কালই তারা ওকে মাথায় তুলবে যদি একটা সেঞ্চুরি করে। ব্রাদার্স না হয়ে অন্য কোনও টিমের কাছে হারলে এদের দুঃখ এতটা হত না। জহরকে ভাবাল একটা ব্যাপার, ফুলবাগান ভুল করেছে এত নতুন অনভিজ্ঞ ছেলেকে একসঙ্গে নিয়ে। শুভ্র রান আউট না হলে ফুলবাগান এমনভাবে বসে যেত না। সমু তো যথেষ্টই ভাল। কিন্তু বাকিরা? ওমকিশোরের মারের মুখে বোলাররা ছন্নছাড়া হয়ে গেল ভয় পেয়ে। পালাতে গিয়ে আরও এলোমেলো বল ফেলে ওম—কে সুবিধেই করে দিল। জহর দাঁড়িয়ে যখন এইসব ভাবছেন তখন তাঁর পিঠে টোকা পড়ল। চমকে ঘুরে দাঁড়ালেন।
”জহরদা, সেই পঞ্চাশ টাকাটা।” মনোজের হাতে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট।
”ওটা তুমি রেখে দাও, আজ শোধ হয়ে গেল।”
মনোজ একগাল হেসে নোটটা পকেটে রাখল। ”পানুদা বলেছিল কলকাতার সব ট্রফি নেবে। এবার তা হলে নেবেই।”
”না নিয়ে তো উপায় নেই, যা সব প্লেয়ার এনেছে!”
”আপনি ব্রাদার্স ছাড়লেন এই বছরই।” মনোজের স্বরে খেদ ফুটে উঠল। ”থেকে গেলে পারতেন। এতবড় একটা গ্লোরি ক্লাবের জীবনে তো আগে আসেনি।”
”এখনই এসব বলছ কেন, গ্লোরি আগে আসুক।”
”আপনার মতো ঝানু একটা ক্রিকেটার এ—কথা বলছেন! আজ দেখেও বুঝতে পারছেন না? মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে লিগ, নক আউট, জে সি মুখার্জি আর—” মনোজ চোখ পিটপিট করল, ”পি সেন ট্রফি ব্রাদার্সের টেন্টে চলে এল বলে। আর তিনটে মাস।”
”আরে জহরদা আপনি এখানে! টেন্টে চলুন।” ফুলবাগানের এক অল্পবয়সী ক্রিকেট—কর্তা জহরকে দেখে এগিয়ে এল।
”এই তো বেশ আছ … ওখানে তো দেখছি ঝামেলা চলছে।”
”আর বলবেন না, কতকগুলো চ্যাংড়া জয়প্রকাশকে যা—তা বলেছে, তাইতে—”
”কী বলেছে? টাকা খেয়েছে?”
”বলেছে সামনের বছর নাকি ব্রাদার্সে যাবে বলে তাই ওদের এগেনস্টে খেলছে না। শুনে তো জয়প্রকাশ একটার মুখে ঘুসি মেরেছে। তাই নিয়ে আবার ঝামেলা। ওকে ক্ষমা চাইতে হবে। জয়প্রকাশ গোঁ ধরে আছে ক্ষমাটমা চাইবে না।”
জহর শুকনো হাসলেন। ”সাপোর্টারদের চরিত্র আর বদলাল না। আমার এখন আর টেন্টে যাওয়ার ইচ্ছে নেই।” বলেই হনহনিয়ে তিনি ফুলবাগান ক্লাবের গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন।
”ব্রাদার্স জিতলেই দেখছি জহরদার মন খারাপ হয়ে যায়।” মনোজ স্বগতোক্তি করল।
দু’দিন পর সমু আর শুভ্র একসঙ্গে এল রাজনারায়ণ পার্কে। জহর তখন বড় ছেলেদের জন্য নেটে একজনকে, পুল করার সময় নীচের হাতের কবজি কীভাবে ঘুরিয়ে জমির দিকে বল রাখবে সেটাই দেখাচ্ছিলেন। বল করছে বেজা এবং আরও তিনজন ছেলে।
”খবর কী তোমাদের?” জহর বললেন, দু’জনকে দেখে তিনি অবাকও হলেন।
”খবর ভাল নয় জহরদা,” সমু বলল।
”একটু মুশকিলে পড়েই আপনার কছে আসা।” শুভ্র বলল, ”ক্লাবে আসেন না কেন, এবার আসুন।”
”গিয়ে কী করব? আড্ডা মেরে, চা খেয়ে বাড়ি চলে আসব। আড্ডা আমি ভালবাসি না।”
”না, না, আড্ডা নয়”, সমু ব্যস্ত হয়ে বলল, ”সিরিয়াস ব্যাপার। আমরা, নতুন ছেলেরা খুব মুশকিলে পড়ে গেছি। শুভ্রর তবু পজিশনটা ভাল রানটান পাচ্ছে বলে, কিন্তু বাকিদের অবস্থা খুব খারাপ, সেই ব্রাদার্সের ম্যাচের পর থেকে প্রকাশদা আর ক্লাবে আসেননি। বলেছেন, যে দুর্নাম তাঁর নামে রটানো হয়েছে তারপর আর ফুলবাগানে থাকা সম্ভব নয়। টিমে হাল ধরার কেউ নেই।”
”আমি ক্লাবে গিয়ে কী করব, হাল ধরব?” জহরের গলায় ঈষৎ বিরক্তি। ”নিজেরা চেষ্টা করো, ব্যাট করাটা ভাল করে শেখো। বরকতের মতো বোলারদের কী করে খেলতে হয়, সে সম্পর্কে তো কোনও ধারণাই তোমাদের নেই। ধারণা হবেই বা কী করে, খেলেছ তো জয়দেব, নুরু, অনুপদের মতো বোলারদের। যাও তো ওই বুড়োটাকে খেলো তো। … যাও, ওই ঘরে প্যাডফ্যাড আছে, পরে এসো।”
দু’জনে অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে একবার তাকাল। তারপর নেটে বল করা বেজার দিকে, তারপর জহরের দিকে। সত্যি—সত্যিই কি বলছেন ব্যাট করতে নাকি শুধু কথার কথা!
”কী হল দাঁড়িয়ে রইলে যে?”
কী ভেবে শুভ্র ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সমু বলল, ”উনি কে?”
”দেখতেই তো পাচ্ছ একজন স্পিন বোলার, ব্রজেন হালদার। তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস কোরো কেমন বোলার ছিল।” কথাটা বলে জহর এগিয়ে গেলেন বেজার দিকে। নিচু স্বরে দুটো কথা বলে ফিরে এলেন।
