একদিন তিনি কাগজে দেখলেন, ফুলবাগানের সঙ্গে লিগের খেলা পড়েছে ব্রাদার্স ইউনিয়নের। খেলাটা দেখতে গেলেন। খেলা ছিল ফুলবাগান মাঠে। দু’দলের সমর্থক ছিল হাজার দুই। গত বছর পি সেন ট্রফির ফাইনালের পর এটাই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ।
জহর সাইট ক্রিনের পেছনে অল্প লোক রয়েছে দেখে সেখানে গ্যালারিতে গিয়ে বসলেন। চেনা—পরিচিতদের সঙ্গে বসে আজেবাজে মন্তব্য শুনতে—শুনতে খেলা দেখতে চান না। ফুলবাগান টিমটাকে তিনি একটু দূর থেকে দেখতে চান। টস করল জয়প্রকাশ। সৌগত এবার ব্রাদার্সে চলে গেছে আট হাজার টাকা বেশি পেয়ে। ব্রাদার্সের ক্যাপ্টেন হয়েছে নুরু। টস জিতে নুরু ফিল্ড করার সিদ্ধান্ত নিল। বোধ হয় ওর মনে রয়েছে গতবার শেষ ব্যাট করে ফুলবাগানের ট্রফি জেতার কথাটা।
তৃতীয় ওভারে ওমকিশোরের বলে এল বি ডবলু হল সুপ্রকাশ। পরের ছেলেটি ওম—কেই হুক করতে গেল, দ্বিতীয় বলেই উইকেট কিপার ক্যাচ পেল। শুভ্র নামল। ষোলো ওভার কোনও উইকেট পড়ল না। রান তখন বিরাশি। শুভ্র অভিজ্ঞের মতো বল বেছে নিয়ে মারছে। ডিফেন্সও জমাট। জহর ওর কাছ থেকে একটা বড় রান আশা করছেন। সেই সময়ই সে কভার পয়েন্টে বরকতউল্লার একটা ফ্লাইট করানো অফ স্পিন ড্রাইভ করেই তিন চার গজ বেরিয়ে যায়। মান্টু সিং ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলটা তার হাতে লেগে ছিটকে সাত—আট গজ দূরে চলে গেল। ননস্ট্রাইকারও খানিকটা বেরিয়ে এসে ইতস্তত করে ফিরে যেতে গিয়ে দেখল শুভ্র মাঝপিচ পর্যন্ত চলে এসেছে। ”গো ব্যাক” বলে চেঁচিয়ে সে শুভ্রকে ফিরে যেতে বলল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। মান্টু সিং জমি থেকে প্যান্থারের মতো লাফিয়ে উঠে তাড়া করে বলটাকে তুলে নিয়ে ছুড়ে দিয়েছে উইকেটকিপারকে।
আটচল্লিশ রানে রান আউট হয়ে শুভ্র ফিরে এল। নামল জয়প্রকাশ। প্রথম বলটাকেই অলসভাবে মিড উইকেটে ঠেলে দিয়ে এক রান। এরপর সৌগতকে বল দিল নুরু। কিন্তু জয়প্রকাশ বা অনুপের ওপর কোনও চাপ না পড়লেও রান ওঠা বন্ধ হল। দশ ওভারে মাত্র আঠারো রান। সীমায়িত ওভারের খেলায় ছাব্বিশ ওভারে একশো রান হওয়ায় রান তোলার গতি একটু বাড়াতেই হয়। হাতে রয়েছে সাতটি উইকেট। জয়প্রকাশ একচল্লিশ বল খেলে তেরো রান। তার কাছ থেকে দ্রুত রান চেয়ে ফুলবাগান সমর্থকরা চিৎকার শুরু করেছে। জহর মনে মনে বললেন, জয়প্রকাশ তো ঠিকই খেলছে। মারতে হয় তো আরও দশ ওভার পর শুরু করা উচিত।
কিন্তু কী একটা পোকা জয়প্রকাশের মাথার মধ্যে নড়ে উঠল, সে বরকতের দশম ওভারের প্রথম বলটাকেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে ছয় মারতে গেল। বলটা ব্যাটের কানায় লেগে ঘুরে এসে অফ স্টাম্পের বেল ফেলে দিল। গ্যালারি নিস্তব্ধ। ব্রাদার্সের সমর্থকরা আনন্দে হাত তুলে চিৎকার করে উঠল। ফুলবাগানের শক্ত খুঁটিটাকে তারা উপড়ে দিয়েছে। জয়প্রকাশ বিকারহীন মুখে ফিরে আসতেই সমর্থকরা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। দূর থেকে জহরের মনে হল, ওরা জয়প্রকাশের উদ্দেশে কটুকাটব্য করছে।
জহরের পেছনে এক দর্শক বলল, ”এইরকম সময়ে এই খেলা! দরকার কী হাঁকড়াবার?”
”আরে দাদা, টাকার খেলা আছে। জয়প্রকাশ তো কাঁচা নয়, ঝানু প্রফেশনাল। দেখুন কত টাকা পানু পোদ্দারের কাছ থেকে পেয়েছে।”
জহর মুখ ঘুরিয়ে দেখে নিলেন একবার, কথাটা কে বলল। জবাব একটা দিতেন, কিন্তু মুখ বন্ধ রাখলেন, মাঠের এইসব কথাবার্তা ত্রিশ—পঁয়ত্রিশ বছর ধরে শুনে আসছেন। সুপ্রকাশের সঙ্গে ওপেন করতে দু’নম্বরে নেমেছিল যে ছেলেটি সে এখনও টিকে আছে ত্রিশ রানে। টেকনিক ভাল, স্পিনটা খেলতে পারে, হাতে মার নেই। জহর ভাবলেন এখন তো এই ভরসা।
জহরের ভাবনার সঙ্গে—সঙ্গেই বরকতের বলে ছেলেটি পা বাড়িয়ে ব্যাট পাতল। ব্যাট—প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে এসে লাগল স্টাম্পে। একশো রানেই পাঁচটা উইকেট চলে গেল। এবার যে নামল তাকেও জহর চেনেন না। ছেলেটি ছটফটে। সব সময়ই রান খুঁজছে। চারটে বাউন্ডারি নিয়ে কুড়ি রানে পৌঁছে গেল কুড়ি বলে। ওর সঙ্গী যে তার রান আট। এর পরই বরকত চার বলের ব্যবধানে দু’জনকেই ক্যাচ তুলিয়ে মাঠ থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিল। জহর অবাক হলেন ওদের স্পিন খেলার অক্ষমতা দেখে। ফুলবাগান এত কাঁচা ছেলেকে নিয়ে টিম করে ভুল করেছে। বরকত খুবই ভাল বোলার, ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা চট করে ধরে নিতে পারে, কিন্তু তাই বলে ওকে ভয় পাওয়ার কী আছে? এই ছেলেগুলোর বেজার বলে প্র্যাকটিস নেওয়া উচিত।
সমু এসেছে। জহর সিধে হয়ে বসলেন। ছেলেটাকে শুধু হাবলার সেই ম্যাচটায় দেখেছেন। উইকেট কামড়ে থাকতে পারে। সমু ঠিক তাই করল হাবলায় যা করেছিল। ইনিংসের শেষপর্যন্ত ব্যাট করে পঞ্চান্ন বলে সাতাশ রান করল। বরকত নিল সাতটা উইকেট, ওমকিশোর দুটো, টাকা খরচ করে পানু ভাল বোলারই ভাড়া করে এনেছে। জহর শুধু একটা ব্যাপারে খুশি হলেন, বরকত চেষ্টা করেছিল কিন্তু সমুর উইকেটটা নিতে পারেনি। উইকেট পায়নি সৌগতও। নুরু ওকে চার ওভারের বেশি বল করতে দেয়নি। ফুলবাগান চুয়াল্লিশ ওভারে একশো একাত্তর রান তুলে সবাই আউট।
ওমকিশোর আর বাসুদেব ওপেন করল ব্রাদার্সের ইনিংস। প্রথম ওভার থেকেই ওম ফুলবাগান বোলিংকে সেই যে কচুকাটা শুরু করল থামল একশো চব্বিশ রান করে, মাত্র পঁচাশিটা বল খেলে। তার আগে বাসুদেব পঁচিশ করে এল বি ডাবুল হয় অনুপের বলে। ব্রাদার্সের রান তখন একশো দশ। তিন নম্বরে আসে মান্টু সিং। এসেই ডিপ পয়েন্টে ক্যাচ দেয় জয়প্রকাশকে। শক্ত ছিল না কিন্তু সে ক্যাচটা হাতে পেয়েও ফেলে দেয়। ফুলবাগান সমর্থকরা আর্তনাদ করে ওঠে। অবশ্য ম্যাচ তখন ব্রাদার্স জিতেই নিয়েছে। আর দরকার তখন গোটা পনেরো রান।
