”এইসব করে বুবাই সময় নষ্ট করবে নাকি?” মায়ের স্বরে ফুটে উঠেছে বিরক্তি। ”ওকে বরং নেটে খেলতে দিন।”
”তা দেব। কিন্তু এটা কোত্থেকে জোগাড় করলেন?” জহর হেলমেটটা আঙুল দিয়ে দেখলেন।
‘ওর কাকার। … হেলমেট ছাড়া ফাস্ট বল খেলবে কী করে?”
”এখানে ফাস্ট বোলার কোথায়? ওটা আপনার কাছেই থাকুক। তা ছাড়া ওটা পরে স্কুটার চালানো যায়, ক্রিকেট খেলা যায় না। … বুবাই প্যাড পরো।” কথাগুলো বলে জহর নেটের দিকে এগোলেন, বেজা তখন বল করার সময় অনিন্দ্যর হাতটা মাথার ওপর আরও কতটা উঠবে সেটা দেখাচ্ছে।
‘আরও তোলো …. হ্যাঁ, টপ থেকে। আর—একটু শরীরের ভার দিতে হবে বল ছাড়ার সময় … বডি ওয়েটটা না থাকলে উইকেট থেকে বাউন্সটা তুলতে পারবে না … কোমরটা মুচড়ে এইভাবে ঘোরাবে …. দাঁড়াও, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
বেজা বলটা হাতে নিল। জহর নেটের বাইরে থেকে ব্যাটসম্যানকে শুধু বললেন ”মারতে যেয়ো না।”
বহু, বহু বছর পর ব্রজেন হালদার হাতে ক্রিকেট বল নিয়ে বারবার টিপল, হাতের তালু আর আঙুলে ঘষল। পুরনো যে অনুভূতিটা হারিয়ে গেছে সেটা ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় বলটাকে আঙুলে জড়িয়ে সামনে উইকেটের একটা জায়গার দিকে তাকাল। বার পাঁচেক বলটাকে দু’হাতে লোফালুফি করে আগের মতো দু’কদম দ্রুত হেঁটে এসে ডেলিভারি দিয়েই দু’হাত পাশে ছড়িয়ে কুঁজো হয়ে ওত পেতে রইল। জহর বলের ফ্লাইটে চোখ রাখলেন।
কাঁচা, অনভিজ্ঞ কিশোর ব্যাটসম্যান তোল্লাই বলটা দেখে আর লোভ সামলাতে পারল না। বাঁ পা বাড়িয়ে হাঁটু গাড়ল সুইপ করার জন্য। বেজা মুগ্ধ চোখে বনবন ঘোরা বলটার ভেসে যাওয়া দেখছে। বলটা নেমে এল, ছেলেটিও ব্যাট চালাল। ম্যাটের ওপর পড়ে বলটা প্রায় ছ’ইঞ্চি ঢুকে এসে ব্যাটের তলা দিয়ে, কোমর ঘেঁষে লেগ স্টাম্পে আঘাত করল।
”বলেছিলুম মারতে যেয়ো না।” চাপা গলায় জহর ধমক দিলেন।
বেজা অনিন্দ্যর হাতে বল তুলে দিয়ে বলল, ‘নাও এবার তুমি করো।”
”না।” চেঁচিয়ে উঠলেন জহর, ”বেজা তুই বল করে যা, যতক্ষণ পারিস।”
প্যাড পরে বুবাই তৈরি। জহর তাকে পাশের নেটে যেতে বলে নিজেই বল নিলেন। ঠোঁট কামড়ে আড়ষ্টভাবে বুবাই ব্যাট ধরে দাঁড়াল। জহর বল দিলেন অফ ব্রেক করিয়ে অফ স্ট্যাম্পের বাইরে। বুবাই পিছিয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ব্যাট চালাল। ব্যাটের বদলে বল লাগল প্যাডে। পরের বলটা লাগল ঊরুতে, তার পরেরটা শর্ট পিচ ছিল, লাগল তার ঘুরে যাওয়া শরীরের কোমরে।
”এ কী বল দিচ্ছেন, বুবাই যে খেলতে পারছে না!” বুবাইয়ের মা বিরক্ত মুখে বললেন, ”সব যে ওর গায়ে লাগছে! হাড়গোড় ভাঙে যদি? আপনি ঠিক করে বল দিন।”
‘কীরকম করে দেব বলুন তো, ইমরান খাঁর মতো করে? টেন্ডুলকর তো শুরু করেছিল ইমরান—আক্রামের বল দিয়ে!” জহর নিরীহ মুখ করে বললেন। মহিলার রকমসকম যে তাঁকে মজা দিচ্ছে সেটা আর তিনি জানাতে চান না।
”বুবাইয়ের ব্যাটের ওপর যাতে বল পড়ে সেইভাবে করুন। ওর ব্যাটিং তো দেখেননি, ছাদের ওপর ফিল্ডার রাখতে হয়! শচীনের মতো ছয় মারে। হ্যাঁ রে বুবাই, ওই যে বাড়িটার জানলায় কাচ রয়েছে, ভাঙতে পারবি? জানেন, ওর বাবাকে কত টাকা গচ্চচা দিতে হয়েছে?” মহিলার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল পুত্রের জানলার কাচ ভাঙার গর্বে।
জহর একবার তাকিয়ে দেখলেন প্রায় দেড়শো মিটার দূরের জানলাটার দিকে। তারপর একতলা সমান উঁচু করে লোপ্পাই একটা বল ছাড়লেন। বুবাই প্রবল বিক্রমে ব্যাট চালাল এবং ফসকাল বলটা, শূন্য থেকে সোজা বুবাইয়ের মাথার ওপর পড়ল। শব্দ হল, ‘খটাস’।
”ও ও ও মা আ আ গো ও ও— আমার ছেলের মাথাটা ফাটিয়ে দিলেন!” মহিলা দৌড়ে গিয়ে ছেলের মাথা দু’হাতে চেপে ধরলেন।
জহর প্রথমে ভয় পেয়ে গেছলেন। কিন্তু যখন দেখলেন রক্ত বেরোয়নি, আশ্বস্ত হলেন। নম্রস্বরে বললেন, ”আমাদের কাছে তো রবারের বল নেই, আপনি যদি ওই মোড়ের দোকান থেকে একটা কিনে এনে দেন!”
”আপনি ঠাট্টা করছেন? বুবাই বাড়ি চল। ক্রিকেট কোচিং স্কুলে না গিয়েই শচীন এত বড় হয়েছে। তুইও হবি।”
মায়ের সঙ্গে বুবাইয়ের চলে যাওয়া দেখে জহর হাঁফ ছাড়লেন। একটা ঝামেলা কমল। অন্য নেটে তখন মনের আনন্দে বল করে যাচ্ছে ব্রজেন হালদার।
”বেজা অফিস যেতে হবে, মনে রাখিস।” জহর চেঁচিয়ে বললেন।
.
সমু এসে খবর দিল সামনের শনিবার ফুলবাগানের প্রথম লিগ ম্যাচ জোড়াসাঁকো স্পোর্টিংয়ের সঙ্গে।
”তুমি টিমে আছ?”
”পনেরোজনে আছি।”
জহর বুঝে গেলেন তাঁর কথা ভাবা হয়নি। এই নিয়ে আর জিজ্ঞাসা করলেন না। একদিন মাত্র নেটে গেছলেন। কিছুক্ষণ বল করেন। স্লিপ ক্যাচ প্র্যাকটিসে ছেলেদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। যে—কটা বল পেয়েছিলেন, ধরেছিলেন। ব্যাটিং প্র্যাকটিসে তাঁকে ডাকা হয়নি। হেমন্ত গুহর তদারকিতে নেট পরিচালিত হয়।
”কীরকম লাগছে ছেলেদের। অনেকেই নতুন।” হেমন্ত গুহ নেট প্র্যাকটিস শেষে তাঁর কাছে জানতে চান।
”নেটে তো সবাই ভালই ব্যাট করল।” বাকি যে কথাটা বলতে চাইলেন সেটা আর জহর বললেন না—ম্যাচে কী করে সেটাই দেখার! সেইদিনই তিনি বুঝে গেছলেন, তাঁকে শুধু রেখেই দেওয়া হয়েছে, খেলাবার জন্য নয়। এর পর তিনি আর যাননি। রাজনারায়ণ পার্কেই মনপ্রাণ ঢেলে দেন। সেখানে নিয়মিত বেজা বল করতে আসে। জহর তার বল খেলে ছেলেদের বুঝিয়ে দেন স্পিন বল খেলার রহস্য ভেদ করতে হলে কী করতে হবে। মৃণালের মিডিয়াম পেস আর সুইং খেলে দেখিয়ে দেন বিবেচনা আর ধৈর্য কাকে বলে। প্রতিদিন ভোরে দৌড়ন গঙ্গার তীরে।
