”খেলুক না রবারের বল। আস্তে—আস্তে ওদের রবার থেকে আসল ক্রিকেট বল রপ্ত করাতে হবে। করে দেখ, অনেক ভাল ছেলে পেয়ে যাবি। কার মধ্যে কী আছে কে জানে! এরা টাকা খরচ করে শিখতে এসেছে তার মানে আগ্রহ আছে। এই তো তিন—চারটে ছেলেকে আমার ভাল লাগল। অনেক টাকা খরচ করে প্রতাপ নেমেছে, স্কুলটাকে টিকিয়ে রাখা দরকার। অনেক ভূষিমাল আসবে তারমধ্যে একটা মুক্তোও তো পেয়ে যেতে পারি।”
বিকেল পাঁচটা থেকে জহর দাঁড়িয়ে রইলেন হাতিবাগানের মোড়ে। বেজাকে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে তেলেভাজার দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছিলেন সেইখানে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। বেজা অফিস ফেরত এখানেই বাস থেকে নামে।
কলকাতা কর্পোরেশন অফিসে চাকরি করে। সেখানে অফিস করতে যাওয়া বা অফিস থেকে বেরনো নিজের মর্জি মতোই বেশিরভাগ লোক করে। জহরের একবার মনে হল বেজা কি নিয়মমতোই অফিস যায় আর বেরোয়? যদি নিয়ম মানে তা হলে সাড়ে পাঁচটায় এখানে বাস থেকে নামার কথা।
জহর ঘড়ি দেখলেন। ঠিক সাড়ে পাঁচটা।
‘কী রে জহর, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস?”
জহর চমকে উঠে ঘুরে দেখলেন মূর্তিমান ব্রজেন হালদার। মুখে একগাল হাসি।
”তেলেভাজা খাব কিনা ভাবছি।”
”আমাকে ঠাট্টা করছিস!… ছেড়ে দিয়েছি। তুই বলার পর থেকে আর খাই না। এখন আমি সব ব্যাপারে ডিপিপ্লিনড থাকার চেষ্টা করি। গ্যাস্ট্রিকটাকে আর্মার দিয়ে ব্যাকফুটে নিয়ে গেছি। আলসারটাকে এবার স্টাম্পড করবই। জানিস জহর, আমি কাঁটায়—কাঁটায় দশটায় অফিসে চেয়ারে বসি, ঘড়ি ধরে অফিস থেকে বেরোই। ভেবে দেখেছি, ডিসিপ্লিনড হতে হলে এই ব্যাপারটা দিয়েই শুরু করা উচিত। মনে পড়ে তোর, বলেছিলি রোজ সকালে দৌড়তে, ফ্রি হ্যান্ড করতে। রোজ নয়, তবে মাঝে—মাঝে করি, খুব ফ্রেশ লাগে।”
”তোর এখন নিজেকে ভাল লাগছে?”
”খুব ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে, দশ রানে দশটা উইকেট নিয়েছি। জহর, একটা কথা বুঝতে পারছি, শরীর যদি তরতাজা থাকে তা হলে সেই মানুষ কখনও দুঃখী থাকতে পারে না। তার প্রমাণ কী জানিস, আগে খিদে হত না, এখন হয়।” বেজার মুখ নির্মল সুখের হাসিতে ঝকমক করে উঠল, ”বুঝলি রে জহর, দারুণ খিদে হয়। এটা একটা রেয়ার ব্যাপার, দুর্লভ জিনিস। তিরিশ বছর আগে এমনই খিদে হত, তার মানে আমার তিরিশ বছর বয়স কমে গেছে, হাঃ হাঃ হাঃ। ডিসিপ্লিন! লোভ সামলে চলা!” বেজার হাসি আর থামে না।
জহর অবাক হয়ে তাকিয়ে। এই বেজাকে তিনি যেন চিনতে পারছেন না। সেই একই রকম রোগা রয়েছে বটে, কিন্তু মুখচোখে শুকনো বসে যাওয়া ভাবটা আর নেই। ঝকঝকে লাগছে।
‘বেজা, এখন তোর বল করতে ইচ্ছে করছে না?”
”ভীষণ করছে।”
”তা হলে চলে আয় রাজনারায়ণ পার্কে, ওখানে একটা ক্রিকেট কোচিং স্কুল হয়েছে। আমি ওখানে একজন কোচ। একটা—দুটো ভাল ছেলে পেয়েছি, খুবই কাঁচা, তবে ভাল বোলার হতে পারে। ওদের নিয়ে তুই পড়ে যা, তৈরি কর। আসবি?”
বেজা ফ্যালফ্যাল চোখে সাত—আট সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাসের সুরে বলল, ”তৈরি করব! বলিস কী?”
”কাল থেকেই চলে আয়। সকাল সাতটায় আমি থাকব। জীবনে ভালভাবে একটা ফিফটি অন্তত করে যা।”
পরদিন সকাল সাতটায় বেজা রাজনারায়ণ পার্কে হাজির। বহুদিন তুলে রাখা, ইস্ত্রিবিহীন, আধময়লা সাদা ট্রাউজার্সটা ঢলঢল করছে। পায়ে ময়লা সাদা কেডস, মোজা নেই। ঊর্ধ্বাঙ্গে পোলোগলা খয়েরি গেঞ্জি। একটু লাজুক সুরে জহরকে সে বলল, ”হঠাৎই তুই বললি কিনা তাই…. আজই প্যান্টের কাপড় কিনে দর্জিকে দিয়ে আসব। কত রোগা হয়ে গেছি দেখেছিস।”
”বেজা তুই যেমনই প্যান্ট পর না কেন, ছেলেরা তা লক্ষ করবে না, তারা দেখবে তোর বল। ওই ছেলেটার নাম অনিন্দ্য লক্ষ কর।” জহর একহাতে বেজার কাঁধ ধরে নেটের ধারে এসে দাঁড়ালেন। দু’জন কোচ এবং অনিন্দ্য বল করছে, ব্যাট করছে একটি কিশোর।
”জহর, একসময় আমি কলকাতার ওয়ান অব দ্য বেস্ট ড্রেসড ক্রিকেটার ছিলুম। পায়ের বুট থেকে মাথার ক্যাপ—সবাই তাকিয়ে দেখত। এখনকার ছেলেদের সামনে ভিখিরির মতো ড্রেস করে থাকলে ওরা আমাকে মানবে কেন?”
”মানে কি না—মানে সেটা আমি বুঝব।” জহর হাত নেড়ে অনিন্দ্যকে ডাকলেন। ”এঁকে তুমি চেনো না।” জহর তাকালেন বেজার দিকে। ”এঁর নাম ব্রজেন হালদার, তোমার জন্মের আগে খেলতেন, লেফট আর্ম আর্থোডক্স স্পিনার। তোমরা বেঙ্কটপতি রাজুকেই শুধু দেখেছ আর বিষেন বেদির নাম শুনেছ। ব্রজেন ওদের মতোই বোলার কিন্তু—” জহর থেমে গেলেন। অনিন্দ্য কৌতূহলী চোখে বেজার দিকে তাকাল।
”ওর কাছে তোমাকে বল—করা শিখতে হবে। রোজা এতক্ষণ তো অনিন্দ্যকে দেখলি, কী মনে হচ্ছে?”
”মন্দ নয়, হবে। ….. দেখি আর—একটু।” বেজা ওকে ইঙ্গিত করল নেটে গিয়ে বল করতে এবং নিজেও ওর সঙ্গে এগিয়ে গেল। নেটের বাইরে জিতু আর প্রশান্ত অল্পবয়সী ক্রিকেটারদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে সঠিকভাবে ব্যাট ধরে স্টান্স নেওয়া, ব্যাট পেছনে তোলা, পা সামনে বাড়িয়ে ডিফেন্সিভ খেলার মহড়া দিয়ে চলেছে। যার ভুল হচ্ছে কোচরা তাকে ঠিক করে দিচ্ছে। এর পর নেটে ওরা বল খেলবে। ওদের বাড়ির লোকেরা দাঁড়িয়ে দেখছে।
”বুবাইকেও কি এইসব করতে হবে নাকি? ও তো খেলতে জানে।”
বুবাইকে নিয়ে তার মা এসে গেছেন। হাতে বড় একটা কিট ব্যাগ আর ব্যাট। সাদা পোশাক আর বুট—পরা বুবাইকে ক্রিকেটারের মতোই দেখাচ্ছে। মায়ের হাতে একটা হেলমেট, সাধারণত যা স্কুটার চালকদের মাথায় দেখা যায়।
