”আমার ছেলেকে এখানে ভর্তি করিয়েছি। লোকটি গদগদ ভঙ্গিতে যোগ করলেন, ”আপনি একটু দেখবেন, খুব ট্যালেন্টেড।”
”বয়স কত?”
”এই এগারো ছাড়িয়ে—” লোকটি পাশে দাঁড়ানো মহিলার দিকে তাকালেন, ”বারো হয়েছে কি?”
”এগারো বছর এগারো মাস সাতদিন হল বুবাইয়ের। … এই যে বুবাই।” মহিলা তাঁর পেছনে দাঁড়ানো লম্বাচওড়া নধর চেহারার একটি ছেলেকে সামনে টেনে আনলেন। জহর একপলক তাকিয়ে দেখে বললেন, ”ট্যালেন্ট আছে বুঝলেন কী করে?”
”গলিতে খেলে তো, দেখেছি বড়—বড় ছক্কা মারে। এ—বাড়ি ও—বাড়ির ছাদে বল পাঠায়। তিনটে জানলার কাচ ভেঙেছে। তিনশো টাকা দিয়ে কাচ বদলে দিয়েছি।”
”তা হলেই ট্যালেন্ট আছে প্রমাণ হল?”
”জ্যোতিষী ওর কুষ্টিতে বলে দিয়েছেন, খুব বড় প্লেয়ার হবে, শচীন টেন্ডুলকরকেও ছাপিয়ে যাবে। খুব নামী জ্যোতিষী চণ্ডীচরণ শাস্ত্রী।” মহিলার চোখমুখে বিশ্বাস আর ভক্তি উপচে উঠল। জহর লক্ষ করলেন বুবাইয়ের বাবার দু’হাতের আঙুলে মোট চারটি আংটি। মুক্তো, পলা, পোখরাজ, চতুর্থটি চিনতে পারলেন না।
”আপনি কী করেন?” জহর শুকনো গলায় জানতে চাইলেন।
”ফিজিকস পড়াই বাবা নরোত্তম দাস কলেজে, আর বাড়িতে কিছু ছাত্র পড়াই।”
”কিছু বলছ কেন?” মহিলা চাপা ধমক দিলেন স্বামীকে, ‘সতেরোজন সকালে, এগারোজন সন্ধেয়, তবে হপ্তায় দু’দিন করে পড়ে। আপনাদের ছেলেমেয়ে কেউ থাকলে পাঠিয়ে দেবেন, মাইনে লাগবে না। … বুবাইকে একটু আলাদা করে যদি টিপস দেন। মানে ট্যালেন্ট তো আছেই, শাস্ত্রীমশাই বলেছেন, কিন্তু ট্যালেন্টকে তো পথ চিনিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
”সে তো নিশ্চয়। তবে ট্যালেন্ট নিজেই নিজের পথ করে নেয়, তাকে আর পথ চেনাতে হয় না।” জহর উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর পাশে বসা অন্য তিন কোচ—জিতু বিশ্বাস, প্রশান্ত চক্রবর্তী আর মৃণাল গুপ্তকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ”তোরা দেখে কথা বলে নে ছেলেদের সঙ্গে, কে কেমন খেলে বুঝে নিয়ে তিনটে ব্যাচে ভাগ করে নে। অনীশ তো সটকে পড়ল। কারা অ আ ক্লাসের আর কারা অজ আম, আর কারা ঐক্য বাক্য—এটা বাছাই করে আমাদের শুরু করতে হবে।”
”একটা কথা বলছিলাম।” বুবাইয়ের বাবা জহরের কথার মাঝে বলে উঠলেন, ”বুবাইকে কি হেলমেট আনতে হবে? ওর জন্য ব্যাট প্যাড গ্লাভস সবই কিনেছি, জুতোও, কিন্তু হেলমেটটা কেনা হয়নি।”
”সবই কিনেছেন যখন, ওটাই বা বাদ যায় কেন?” জহর বললেন।
”আমিও তাই বলি।” বুবাইয়ের মা উৎসাহভরে বললেন, ”শচীন তো হেলমেট পরেই খেলে।”
”জিতু, তোরা গিয়ে ছেলেদের সঙ্গে কথা বল। কোন ব্যাচ কোন দিনে আসবে সেটা বলে দিবি।”
”জহরদা, কে কেমন খেলে সেটা আগে দেখে না নিলে ব্যাচ ঠিক করব কী করে?”
”ঠিক বলেছিস। তা হলে অর্ধেক ছেলেকে কাল সকালে আর বাকিদের বিকেলে আসতে বলে দে। এই যে বুবাই তুমি কাল বিকেলে এসো।”
বিধায়ক তখন দু’জনের কাঁধে হাত রেখে খোঁড়াতে—খোঁড়াতে চলেছেন পার্কের বাইরে দাঁড়ানো ট্যাক্সির দিকে। তাঁর সঙ্গে চলেছেন পৌরপিতা। ”অরুণদা আমি বলছি এক্স—রে করানোর দরকার নেই, রাতে গরম চুন—হলুদ লাগাবেন, সকালে দেখবেন ব্যথাট্যথা একদম নেই।”
”বাবা ডিউস বল লাগলে খুব লাগে না?’ বুবাই ভীত কণ্ঠে ফিসফিস করে জানতে চাইল।
”প্যাড পরা থাকলে লাগবে কেন!” বাবা ভরসা জোগালেন।
”যদি মুখে লাগে? মুখে তো প্যাড থাকে না।”
বাবা আর কথা খুঁজে না পেয়ে বললেন, ”চলো, এবার বাড়ি যাই। কাল বিকেলে আসতে হবে।”
প্রতাপ চরকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠান ভালয় ভালয় কাটল বলা যেত, যদি বিধায়ক অরুণ বিশ্বাসের পায়ে বলটা না লাগত। প্রতাপ তাই কিঞ্চিৎ বিষণ্ণ। প্রথমদিনেই একটা খুঁত থেকে গেল। নেট এবং ম্যাট খুলে পঞ্চা মালি ইনস্টিটিউটের ঘরে তুলে রাখছে। ডেকরেটরের লোক চেয়ার টেবিল তুলছে ঠেলাগাড়িতে, রিকশায় তোলা হচ্ছে মাইক ও স্পিকার। প্রতাপ ব্যস্ত হয়ে এল জহরের কাছে।
”সব ঠিকঠাক চলছে তো জহরদা?”
”চলছে। শুধু একটা কথা, ছাত্র ভর্তির আগে ট্রায়াল দিয়ে টেস্ট করে নেওয়া দরকার ছিল।”
‘তা হলে জহরদা চারটের বেশি ছেলে আপনি পেতেন না। চারটে ছাত্র দিয়ে তো স্কুল চলে না। আপনি বেছেবুছে যে—ক’টা পান তাদের নিয়ে আলাদা কোচ করুন। বাকিদের ওই তিনজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিন। … অনীশ সেন কি চলে গেছে? ওকে সবাই দেখেছে তো?”
”দেখেছে।” জহর ওকে আশ্বস্ত করলেন।
পরদিন সকালে জহর ম্যাট উইকেটে তেরোটি ছেলেকে ব্যাট করিয়ে তিনজনকে বেছে নিলেন নিজে কোচ করাবেন বলে। তাদের বয়স ষোলো—সতেরো। তাঁর মনে হয়েছে এদের ক্রিকেট বোধ আছে, খেলতে জানে, টেকনিকে ত্রুটি রয়েছে, দরকার উঁচু পর্যায়ের বোলিংয়ে প্র্যাকটিস। মৃণাল মোটামুটি সুইং করায়, জিতু এবং প্রশান্ত অফব্রেকটা করে দিতে পারে। এতেই কাজ চলে যাবে। তা ছাড়া অনিন্দ্য নামে বছর তেরো—র একটা ছেলে বাঁ হাতে স্পিন করায়, খারাপ নয়। এর দিকেও নজর দেওয়া দরকার।
নজর দেওয়া দরকার মনে হতেই জহরের মাথায় একটা চিন্তা টোকা দিল। বেজা! জিতুকে হাতছানি দিয়ে তিনি ডাকলেন।
”জিতু, বিকেলে আমি আসতে পারব না, একটা জরুরি কাজ আছে, তুই ম্যানেজ করে নিস। বারো—চোদ্দোটা তো ছেলে, পারবি না?”
”না পারার তো কিছু নেই। তবে জহরদা, ব্যাট ধরা শেখাতে হবে, এমন ছাত্রের কথা তো আমি ভাবিনি। বেশিরভাগই তো গলিতে রবারের বল—খেলা ছেলে!”
