”তোলে তুলবে। …সকালে দৌড়ও কী?” প্রসঙ্গটা বদলাবার জন্য জহর বললেন।
”হ্যাঁ, দেশবন্ধু পার্কে চার পাক দৌড়ই।”
”কাল থেকে পাঁচ পাক দেবে।”
.
রাজনারায়ণ পার্কে ক্রিকেট কোচিং স্কুলের উদ্বোধন জাঁকজমকের সঙ্গে হল। শামিয়ানা খাটিয়ে সভা হয়। বক্তৃতা দিলেন পুরপিতা যশোদাজীবন ধর, বিধায়ক অরুণ বিশ্বাস। যশোদাজীবন বললেন: ”এই রাজনারায়ণ পার্কের স্কুল থেকে আগামী দিনের বাঙালি টেস্ট প্লেয়ার ঝাঁকে—ঝাঁকে উঠে আসবে, এই ইঙ্গিত আমি এখনই পাচ্ছি, অভিভাবকদের উৎসাহ আর উদ্দীপনা দেখে। ছোট—ছোট ভাইয়েরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিক্ষার মাধ্যমে ক্রিকেটের জ্ঞান অর্জন করবে এই স্কুল থেকে, বিখ্যাত টেস্ট খেলোয়াড় অনীশ সেনের তত্ত্বাবধানে তারা শিখতে পারবে গাওস্কর, কপিলদেব হয়ে ওঠার জন্য কীভাবে ব্যাট করতে হবে, বল করতে হবে। আমি আশা করব, একদিন আমার ওয়ার্ডের এই রাজনারায়ণ পার্ক থেকে উঠে আসা এগারোটা বাঙালি ছেলে নিয়েই ইন্ডিয়ার টেস্ট টিম হবে। সেদিন এই পার্কে সাতদিন ধরে সংবর্ধনার ব্যবস্থা আমি করব। আমি দেখতে পাচ্ছি সেই সম্ভাবনার বীজ আজ এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বপন করা হল।”
বিধায়ক অরুণ বিশ্বাস বললেন : ”ক্রিকেট খেলা আর জীবনের খেলা একই জিনিস। দুটো খেলাতেই দরকার মনোনিবেশ। একটু এধার—ওধার হলে, মনোনিবেশে চিড় ধরলেই আউট। আপনাকে মাঠ ছেড়ে চলে যেতে হবে। জনসেবার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হারালেই ইলেকশনে হেরে যাবেন। ক্রিকেট থেকে এই শিক্ষাটা, জনসেবায় মনোনিবেশের শিক্ষাটা পেয়েছি বলেই ইলেকশনে জিতে বিধায়ক হতে পেরেছি। প্রত্যেকদিন পাড়ায়—পাড়ায় ঘুরে মন দিয়ে যেভাবে জনসংযোগ করি ঠিক সেইভাবে এই স্কুলের ছেলেদের প্রতিদিন প্র্যাকটিস করতে হবে, তা না হলে ম্যাচ জিততে পারবে না। আশা করব আমার কথাগুলো শিক্ষার্থীরা মনে গেঁথে নেবে। এখন এই স্কুল খোলা মাঠে হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে যাতে এখানে ইন্ডোর হল তৈরি করে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা যায় সেজন্য সামনের বাজেট সেশনে আমি প্রস্তাব দেব। আমার কেন্দ্র থেকে টেস্ট প্লেয়ার তৈরি করার যে—কোনও প্রয়াসকে আমি সাহায্য করবই।”
এর পর আরও তিন—চারজন বক্তৃতা দেয়। বক্তাদের সামনে মাঠের একধারে বসে ছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা, তাঁদের উলটোদিকে চারজন কোচ আর তাঁদের পেছনে জনা পঁচিশ নানা বয়সী ছেলে। একদিকে একটা টেবিলে বসে তিনজন খবরের কাগজের লোক। তা ছাড়াও পাড়ার জনাপঞ্চাশ কৌতূহলী লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে। ছবি তুলল কাগজের দু’জন ফোটোগ্রাফার, প্রতাপ কোনও খুঁত রাখেনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে, হ্যান্ডবিল বিলি করে, বড়—বড় রাস্তার মোড়ে ফেস্টুন টাঙিয়ে সে প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্বোধন করলেন ধুতিপরা বিধায়ক, ব্যাট হাতে। নেটের মধ্যে তাঁকে বল করলেন ট্রাউজার্সপরা পুরপিতা। বল করার আগে তিনি বনবন করে ডানহাতটা ঘুরিয়ে বললেন, ”সেই কবে স্কুলে পড়ার সময় বল করেছি আর আজ করছি।”
বিধায়ক হাসি—হাসি মুখে ব্যাটটা খাঁড়ার মতো ধরে দাঁড়ালেন। পুরপিতা দশগজ ছুটে এসে বল করলেন বা ছুড়লেন। বল নেটের ওপর দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে রাজনারায়ণ ইনস্টিটিউটের দেওয়ালে ঠকাস করে লাগল। বিধায়ক হতভম্ব চোখে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বলটার দিকে মুখ তুলে সভয়ে তাকিয়ে, তখনই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। চটাপট আওয়াজ উঠল হাততালির। পুরপিতা লাজুক স্বরে বললেন, ”বলটা ঠিকমতো হল না, আর—একবার করি।” এবার তিনি আরও জোরে দৌড়ে এলেন বল করতে। ডেলিভারি দেওয়ার আগে ফাস্ট বোলারদের মতো লাফিয়ে উঠলেন। মাটিতে পা পড়তেই পা হড়কে গেল আর বলটা হাত থেকে বেরিয়ে ফুলটস হয়ে সোজা গিয়ে লাগল বিধায়কের বাঁ হাঁটুর নীচে।
”বাবা রে!” দু’হাতে পা চেপে ধরে বিধায়ক উবু হয়ে বসে পড়লেন।
হইহই করে প্রতাপ ও কয়েকজন ছুটে গেল। বিধায়ককে চ্যাংদোলা করে একটা চেয়ারে বসানো হল। তিনি কাতরাতে—কাতরাতে বললেন, ‘মনোনিবেশটা, ঠিকমতো হয়নি বলেই—একটু বরফ দিন।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওরে একটু বরফ… মালি, মালি।” প্রতাপ ছুটে গেল।
চেয়ারে বসে জহর চুপচাপ দেখে যাচ্ছিলেন। পাশে বসা অনীশকে বললেন, ”কী বুঝছ?”
”আমাদেরও মনোনিবেশ করতে হবে।” অনীশ গম্ভীর মুখে বলল।
”সাতদিন ধরে সংবর্ধনা নিতে হবে, এখন থেকেই তৈরি হও।”
”জহরদা, তার থেকেও বিপদ, এগারোটা টেস্ট ক্রিকেটার এই কোচিং স্কুল থেকে যখন বেরোবে তখন ইন্ডিয়া টিমের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে ভেবে দেখেছেন কী? আপনি বরং সামলান, আমি এখন কেটে পড়ছি।” বলেই অনীশ চেয়ার থেকে উঠে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। জহর ফ্যালফ্যাল করে এধার—ওধার তাকাতে লাগলেন।
”আপনিই তো জহর পাল, স্কুলের ডেপুটি ডিরেক্টর অব কোচিং?” ধুতি—পঞ্জাবি পরা সৌম্যদর্শন, বছর চল্লিশ—বিয়াল্লিশ বয়সী লোকটি নমস্কার করলেন।
প্রথমে জহরের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। তারপর মনে পড়ল হ্যান্ডবিলে দেখেছেন বটে তাঁর নামের পাশে অমন একটা কথার সঙ্গে ব্র্যাকেটে বেঙ্গল রনজি ট্রফি প্লেয়ার জোড়া আছে। তার আগে আছে ডিরেক্টর অব কোচিং অনীশ সেন, ব্র্যাকেটে ইন্ডিয়া টেস্ট প্লেয়ার। তিনি প্রতিনমস্কার করে বললে, ”হ্যাঁ আমি।”
