”নিশ্চয়।”
”শুধু ব্যাটসম্যান তৈরি নয়, বোলারও তৈরি করতে হবে। ফিল্ডিং প্র্যাকটিস চাই। উইকেটকিপার তৈরি করতে হবে, প্রত্যেকটা ছেলেকে ক্রিকেটের আইন শিখতে হবে। একটা অলরাউন্ড শিক্ষা চাই।”
”আপনি যেমন চাইবেন সেইভাবেই করবেন।” প্রতাপ নম্র বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ”স্কুলের সুনাম যাতে হয়, ছাত্র যাতে বাড়ে সেটা দেখা তো উচিতই। তা হলে জহরদা, বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, আমি আসি। যথাসময়ে আপনাকে খবর দেব।”
প্রতাপ বেরিয়ে যাওয়ার পরই জহরের মনে পড়ল হাবলায় হেমন্ত গুহর বলা কথাগুলো—’লুফে নিয়ে ফেলেছি। জহর ট্রান্সফারের জন্য তৈরি থেকো।’ কথাটা কি আন্তরিক? এরকম প্রতিশ্রুতি তো অনেক শুনেছেন জীবনে। আবেগ—উচ্ছ্বাসের বশে অনেকে অনেককিছুই বলে ফেলে, পরে ভেবেচিন্তে মত বদলে ফেলে। তাঁর বয়সের কথাটা হেমন্ত গুহ নিশ্চয় ভাববে।… কিন্তু তাঁকে নিতেও তো পারে! হয়তো রামবাবুকে খুশি করতে ফুলবাগানে সই করাবে। এইসব ক্লাবে বড় ডোনারদের মন জুগিয়ে চলতে হয়। সই করিয়ে তারপর বসিয়ে রাখবে। এরকম ঘটনাও তো তাঁর জীবনে ঘটেছে। ফুটবলের মতো ক্রিকেটেও বসিয়ে রাখা আকছার হয়।
জহরের মনে টানাপোড়েন চলল কিছুক্ষণ। খেলাক বা না—খেলাক মাঠে যাওয়ার এত বছরের অভ্যাস তো তিনি ছাড়তে পারবেন না। আবার এদিকে প্রতাপকেও কথা দিয়ে ফেলেছেন। ফুলবাগানে নাম লেখালে ময়দানে ওদের নেটে যেতে হবে, তা হলে রাজনারায়ণ পার্কের কোচিং স্কুলে যাবেন কখন?
দুইয়ের মধ্যে একটা সমঝোতা তাঁকে করতে হবে।
জহর পালের ভয়টা নেহাতই অমূলক ছিল। ক্রিকেট ট্রান্সফারের প্রথমদিনেই হেমন্ত গুহ তাঁকে ফুলবাগানে সই করালেন। সই করে সি এ বি ক্লাব হাউস থেকে তিনি এবং সমু বেরিয়ে আসার সময় হেমন্ত গুহকে প্রশ্ন করলেন, ”ভেবেচিন্তে আমাকে নিলেন তো? একটা—দুটো ম্যাচ খেলতে পাব তো?”
কথাটা শুনে হেমন্ত যেন আহত হলেন। বললেন, ”তোমার মতো ভেটারেনের মুখে এসব কী কথা? তুমি রনজি খেলতে চাও না টেস্ট খেলার স্বপ্ন দেখছ? টিমে কখন যে কার দরকার পড়বে তা কি এখন বলা যায়? দরকার পড়লেই তুমি খেলবে। ফার্স্ট ইলেভেনে ঢোকার জন্য লড়বে এরা।” তিনি সমুর পিঠে হাত রাখলেন।
”তা হলে একটা কথা বলে রাখি।” জহর বললেন, ”আমি কিন্তু রোজ নেট প্র্যাকটিসে যেতে পারব না। একটা নতুন ক্রিকেট কোচিং স্কুল হচ্ছে আমাদের ওদিকে রাজনারায়ণ পার্কে, সেখানে কোচ করব। ওখানেই ক্রিকেটের টাচে থাকব, প্র্যাকটিসও করে নেব। তবে ক্লাবে আমি মাঝেমধ্যে নিশ্চয় যাব।”
”বেশ, তাই হবে। জয়প্রকাশের প্রমোশন নিয়ে বদলি হওয়ার কথা হায়দরাবাদে, সামনের জানুয়ারিতে। চেষ্টা অবশ্য করছে কলকাতায় থেকে যাওয়ার। যদি যায়, টিমে তা হলে সিনিয়ার প্লেয়ার কেউ আর থাকবে না। এবার চারজন নতুন ছেলে নিচ্ছি। তোমাকে তা হলে দরকার হতে পারে সিজনের শেষের দিকে।”
‘দরকার হতে পারে’ কথাটা জহরের ভাল লাগল। তাঁর মনে গভীর একটা তৃপ্তি এনে দিল। শিরদাঁড়া টান করে তিনি বললেন, ”দরকারের সময় দেখে নেবেন ওই বুড়ো ঘোড়া কেমন ছোটে।”
হেমন্ত গুহ চোখ সরু করে হাসলেন। মাথা নেড়ে বললেন, ”এইসব ছেলে—ছোকরারা দেখবে, আমি আর কী দেখব! চলি এখন, সৌগতর ব্যাঙ্কে একবার যেতে হবে। ব্রাদার্স নাকি টোপ ফেলেছে ওকে গাঁথার জন্য।”
হেমন্ত গুহ তার অ্যাম্বাসাডারে উঠে চলে যাওয়ামাত্র যেন মাটি ফুঁড়ে হাজির হল কানু ভটচায।
”এই যে জহর, তা হলে ফুলবাগানে সই করলি! মাঠে নামার শখ এখনও তোর গেল না দেখছি!” কানু হাসল। চারটে না—থাকা দাঁতের ফাঁক দিয়ে জিভটা বেরিয়ে এল।
”তোমারও তো মাঠে চরে বেড়াবার শখ দেখছি এখনও যায়নি, নইলে এই ভরদুপুর বেলায় তুমি কী করতে এখানে?”
”দেখতে, কে কোন ক্লাবে যাচ্ছে তাই দেখতে। সব দেখেশুনে তবেই তো টিম করতে হবে। তা ফুলবাগান আর প্লেয়ার পেল না, শেষে তোর মতো একটা বুড়ো ঘোড়াকে ধরল! হেমন্তর কি মাথাখারাপ হয়েছে! ঘাস খাওয়াবার জন্য আর লোক পেল না?” কানু ভটচায নিজের রসিকতায় হেসে উঠল।
”ঠিকই বলেছ কানুদা, ব্রাদার্সের ঘাস চিবিয়ে—চিবিয়ে তো বুড়ো হয়ে গেলুম, এবার ফুলবাগানের ঘাস খেয়ে দেখি ছোকরা হওয়া যায় কি না।”
”হবি, হবি, আমাদের সঙ্গে খেলা পড়ুক, তোর টগবগানি ছুটে যাবে।” কানু ভটচায তিনটে আঙুল তুলে দেখাল। ”তিনটে আনছি এবার। হরিয়ানার ওমকিশোর, হায়দরাবাদের বরকতউল্লা আর দিল্লির মান্টু সিং। কলকাতার যত ট্রফি আছে সব এবার নেব। পি সেনটা বড় ফসকে গেল, বাগানের ফুল তো জয়প্রকাশ আর সৌগত। জয়প্রকাশের বদলির খবর পেয়ে গেছি। সৌগত ফুল তুলে নিলুম বলে!” কানু একটা কাল্পনিক ফুল নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুঁকল।
”যাকগে এসব কথা, তোর ছেলে কেমন আছে?” কানু ভটচায দরদি বন্ধুর মতো জানতে চাইল। ”কীসব ছবিটবি তুলে পরীক্ষা করলি, রেজাল্ট কী?”
”ভালই আছে। ওষুধ খেয়ে যাচ্ছে।”
”ভাল থাকলেই ভাল। আজকাল চিকিচ্ছের যা খরচ!”
”চলো সমু। চলি কানুদা।” জহর সমুর হাত ধরে টান দিলেন।
ফেরার সময় সমু জিজ্ঞেস করল, ”লোকটা করে কী জহরদা?”
”কিছু করে না। বিয়ে করেনি, সংসার নেই, মাঠ আর ক্লাব নিয়ে পড়ে আছে।”
”যাদের আনবে বলল তারা তো সব টেস্ট খেলেছে। ব্রাদার্স এবার সব ট্রফি ঘরে তুলবে।” সমু নিশ্চিত স্বরে বলল।
