”কাম অন পল, কাম অন।” দাঁড়িয়ে উঠে চেঁচাচ্ছে আর কেউ নয়, হিয়ার বাবা। গ্যালারির হতভম্ব ভাবটা তাতে যেন ভেঙ্গে খানখান হয়ে পড়ল।
”জোরে জোরে, আরো জোরে!” শুধু এই চীৎকার ধাপে ধাপে উঠে অবশেষে আক্ষেপে ভেঙ্গে পড়ল। কোনি পারল না। অমিয়া তার খেতাব রক্ষা করল। দ্বিতীয় হল হিয়া। কোনি তৃতীয় হল বেলার সঙ্গে।
তারপর আর একটি ব্যাপার ঘটল। ধীরেন জলের কাছে ঝুঁকে এক গাল হেসে অমিয়াকে কিছু বলছিল, সেই সময় ভিড় ঠেলে ছুটে এসে ক্ষিতীশ তার পিছনে লাথি কষাল। ধীরেন উল্টে গিয়ে জলে পড়ল। তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। কয়েকটি ছেলে ক্ষিতীশকে হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে গেল সেখানে থেকে। তখন শোনা গেল চীৎকার করে সে বলে যাচ্ছে, ”পারবি না, এভাবে পারবি না।…”
রাস্তায় বেরিয়ে এসে কোনির তোয়ালে দিয়ে ক্ষিতীশ মুখ মুছল। ঠোঁটের কষ বেয়ে তখনো রক্ত গড়াচ্ছে। কোনির কপাল ফুলে উঠেছে। একটা পানের দোকান দেখে ক্ষিতীশ বরফ কেনার জন্য দাঁড়াল। ঠিক তখনই ওর পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে হিয়ার বাবা নেমে এল।
”সরি মিস্টার সিনহা। এমন ডাটিঁ ব্যাপার এখানে হবে আমি জানতাম না। হিয়া, তার মা, আমরা কেউই খুশি হতে পারছি না। এভাবে মেডেল জেতায় কোন আনন্দ নেই।”
ভদ্রলোক কোনির পিঠে চাপড় দিয়ে বললেন, ”দুঃখ কোরো না। জোরে সাঁতার কাটার দরকারটা আজ তুমি অনুভব করতে পেরেছ, তুমি লাকি। তোমার লাস্ট ফরটি মিটারস আমি ভুলব না।”
ক্ষিতীশ প্রথমে বিভ্রান্ত তারপর অভিভূত হয়ে গেল। গাড়ির জানালা দিয়ে হিয়া এবং তার মা দেখছে। ক্ষিতীশ এগিয়ে এসে হিয়ার মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ”বড়ো হও মা।” তারপর ইতস্তত করে বলল, ”সেদিন কোনিকে আমি খুব বকেছি।”
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির ছেঁড়া বুক পকেটটা টান মেরে ক্ষিতীশ খুলে ফেলল।
”তোর বৌদিকে এসব কিছু বলিসনি।”…
প্রণবেন্দু ঘরের সকলের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ”কি হয়েছিল, আমরা জানি। সেকথা এখন আলোচনা করে লাভ নেই। বাংলার মান—সম্মানের কথাই এখন আমাদের ভাবতে হবে, টিমটা যাতে সেরা হয় তার জন্য তুচ্ছ দলাদলি ভুলে যেতে হবে। মহারাষ্ট্রই আমাদের মেয়েদের একমাত্র রাইভ্যাল। ওদের রমা যোশির সঙ্গে ফ্রি স্টাইলে পাল্লা দেবার কেউ নেই, একমাত্র কনকচাঁপা পাল ছাড়া। ফ্রি স্টাইলের তিনটে ইনডিভিজুয়াল, আর একটা রিলে, এই চারটের মধ্যে অন্ততঃ দুটোতে, একশো আর দু’শোয় কনকচাঁপার সিক্সটি পারসেন্ট চান্স আছে।”
”কিসে বুঝলে যে আছে?” একজন জানতে চাইল।
”শুধু ওর সেদিনের ফিনিশ করা দেখেই বুঝেছি। যেরকম রোখা জেদী সাঁতার ও দেখাল, তাতে স্প্রিন্ট ইভেন্টে ওর সমকক্ষ এখন বাংলায় কেউ নেই। আমি ওর ট্রেনিংয়ের খবর রাখি, দু তিনবার দেখেও এসেছি, জোর দিয়েই বলছি মহারাষ্ট্রের কাছ থেকে চ্যাম্পিয়নশিপ ছিনিয়ে নিতে হলে এই মেয়েটিকে চাই।”
”শুধু ফ্রি স্টাইল জিতেই আমরা চ্যামপিয়ন হয়ে যাব? ধীরেন ঘোষ তাচ্ছিল্যভরে বলল এবং অন্যান্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মতো হাসল। কিন্তু তাকে সায় দিয়ে কেউ মাথা নাড়ল না এবার।
”হিয়ার কাছ থেকে আমি তিনটে গোল্ড আশা করছি। দুটো ব্রেস্ট স্ট্রোকে, একটা ব্যাক স্ট্রোকে। মেডলিতেও ফিফটি—ফিফটি চান্স আছে। এছাড়াও অঞ্জু, পুষ্পিতা, বেলা ও অমিয়া পয়েন্ট আনবে। এ বছর আমরা লেডিজ চ্যামপিয়ন হতে পারি।”
”কিন্তু কনকচাঁপা পাল এ বছর কোন ক্লাব স্পোর্টসে নামেনি, স্টেট চ্যামপিয়নশিপে দুটোতে ডিসকোয়ালিফাই হয়েছে আর একটায় প্রথম দুটো প্লেসের মধ্যে আসতে পারেনি,বাকিগুলোয় আর নামেনি। ওর টাইমিং কি, আমরা তা জানি না। সুতরাং কি করে ওকে সিলেক্ট করা যায়!” ধীরেন ঘোষ টেবলে ঘুঁষি মেরে চেঁচিয়ে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড সভাঘর নিস্তব্ধ রইল। সবশেষে ধীর শান্ত গলায় প্রণবেন্দু বলল, ”তাহলে বালিগঞ্জ সুইমিং ক্লাবের সুইমারদের বাদ দিয়েই আপনাদের টিম করতে হবে। আমার মেয়েদের আমি উইথড্র করে নিচ্ছি।”
”তা কি করে হয়!” সভায় গুঞ্জন উঠল। একজন বলল, ”কনকচাঁপা পালকে সিলেকশন দিলে ক্ষতিই বা কি! যাবে তো নিজের টাকায়।”
এরপর শুরু হল তর্কাতর্কি। সেটা পৌঁছল চীৎকারে। এক সময় ধীরেন রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় বলল, ”প্রণবেন্দু ব্ল্যাকমেল করে অ্যাপোলোর সুইমার টিমে ঢোকাতে চায়। এতে ওর কি যে স্বার্থ আছে বুঝছি না।”
প্রণবেন্দু জবাব দিল, ”রমা যোশির সোনা কুড়োনো বন্ধ করা ছাড়া আমার আর কোন স্বার্থ নেই।”
.
কোনি মাদ্রাজ যাওয়ার মনোনয়ন অবশেষে পেল। বাংলার ম্যানেজার হয়েছে ধীরেন ঘোষ। মেয়েদের বিভাগে ম্যানেজার বেলেঘাটা সুইমিং ক্লাবের প্রণতি ভাদুড়ি এবং কোচ হরিচরণ মিত্র। মাদ্রাজ মেলে ওরা সন্ধ্যায় রওনা হবে। ক্ষিতীশ এসেছে ট্রেনে কোনিকে তুলে দিতে। আর এসেছে কান্তি, চণ্ডু, ভাদু। কোনির ভাই গোপাল।
কামরায় জানলার ধারে বসেছে কোনি। জানলা থেকে দূরে সবার থেকে একটু তফাতে প্ল্যাটফর্মে ক্ষিতীশ দাঁড়িয়ে। কোনি কথা বলছে কান্তিদের সঙ্গে। ধীরেন ঘোষ হাঁকডাক করে তদারকিতে ব্যস্ত। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে আসছে, এখনো নাকি কয়েকজন পৌঁছয়নি।
কোনির মুখে চাপা ভয়। কলকাতার বাইরে সে কখনো যায়নি। সাড়ে চোদ্দশ’ কিলোমিটার অর্থাৎ প্রায় ৩৫ ঘণ্টা ট্রেনে বাস। কামরার আর এক কোণে জুপিটারের অমিয়া আর বেলা। ওরা অভ্যস্ত। এটা ওদের পঞ্চম ন্যাশনাল চ্যামপিয়নশিপ। হিয়া বাবা—মা’র সঙ্গে দু’দিন পর প্লেনে যাবে।
