”কী বললে?”
”আপনার নাম বললুম। শুনে বলল, ঠিক আছে, জহরদা থাকলে তো কথাই নেই। বুঝলেন জহরদা, ইচ্ছে ছিল আপনাকেই চিফ কোচ করে রাখব। কিন্তু এখন লোকের মনোভাব বোঝেন তো, সাইনবোর্ড দেখেই পটকে যায়, বিজ্ঞাপনের যুগ তো! ইন্ডিয়া—প্লেয়ার কথাটার তো একটা আকর্ষণ আছে।… বলুন না, আছে কি না?”
জহরের মুখে পাতলা হাসি ভেসে উঠল। ”আছে। তবে আমি তো কোচ হলুম। আর কে—কে থাকবে?”
”জিতু বিশ্বাস, প্রশান্ত চক্রবর্তী আর মৃণাল গুপ্তর সঙ্গে কথা বলেছি। আপনি তো এদের চেনেন। জিতুদা আর প্রশান্তদা রেলের হয়ে রনজি ট্রফি খেলেছেন। ভাল পেস বোলার ছিল। আর মৃণাল তো এখন ফার্স্ট ডিভিশনে খেলে।”
‘এত কোচ নিয়ে স্কুল, ছাত্র ক’জন হবে?” জহরের কপালে ভাঁজ। এই স্কুল ব্যাপারটা তাঁর মাথায় ঢুকছে না। এতকাল ধরে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, কত দিকপাল ক্রিকেটার বেরিয়েছেন, তাঁরা তো কেউ স্কুলে খেলা শেখেননি! দুখিরামবাবু ছিলেন। কত নামকরা ক্রিকেটার, ফুটবলারকে তিনি তৈরি করে দিয়েছেন। তিনি তো স্কুল খুলে ছেলেদের কোচ করেননি! ছেলেদের মধ্যে প্রতিভা দেখেছেন, প্রতিভা বিকাশের পথে তাদের চালনা করেছেন। যে ওঠার, সে নিজেই উঠে এসেছে। যার মাথা আছে, পরিশ্রম করে, বড়—বড় প্লেয়ারদের খেলা মন দিয়ে দেখে, নিজেকে সেই ছাঁচে ফেলে তৈরি হয়ে ওঠে। জহরের মনে পড়ল, মাঠে গিয়ে নির্মল চ্যাটার্জির ব্যাটিং গোগ্রাসে গিলতেন, তাঁর ফুটওয়ার্কের ছবি মনের ক্যামেরায় তুলে নিতেন। তখন গোয়াবাগানের সান স্পোর্টিংয়ে খেলছেন, নেটে নকল করতেন সেই ছবিগুলোকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলে, ইনিংসের ভিত গড়ার ধৈর্য আর হুঁশিয়ারিটা শিখেছিলেন পঙ্কজ রায়ের খেলা দেখে দেখে। কেউ তাঁকে কোচ করেনি, কেউ একজন তাঁর গুরু নয়।
”দুটো নেটে খেলা হবে আপাতত শুধু বিকেলে, তবে ছুটির দিনে দু’বেলা। প্রতি ছাত্র হপ্তায় তিনদিন কোচিং নেবে।”
”কতক্ষণ করে নেবে?”
”সেটা ঠিক হবে ছাত্রসংখ্যা দেখে, যদি ছেলে বেশি হয় তা হলে কুড়ি কি চব্বিশ বল খেলবে। এখানে তো কেউ প্র্যাকটিস করতে আসবে না, শিখতে আসবে। খেলা ছাড়াও তো অনেক কিছু শেখার থাকবে। বাচ্চচা—বাচ্চচা ছেলে, আগে ব্যাট ধরা শিখবে, ব্যাট নিয়ে দাঁড়াতে শিখবে, কীভাবে ফরওয়ার্ড খেলতে হবে, পা কোথায় যাবে, ব্যাকলিফট কীভাবে করবে, কনুই কতটা ভাঙবে, এসব আগে শিখে তবে নেটে বল খেলবে, ঠিক কি না?”
জহর চুপ করে রইলেন।
”কোচিং ফি, ভেবে দেখলুম, একটু কমসমই রাখব, মাসে পঁচাত্তর টাকা। এটা এমন কিছু বেশি নয়। মাসে বারোটা কোচিং, প্রতি কোচিং পিছু ছ’টাকা পঁচিশ পয়সা। দেড়শো টাকা মাইনে দিয়ে যদি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তে পারে, চারশো টাকা দিয়ে যদি প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারে, তা হলে পঁচাত্তর টাকা দিয়ে ছেলেকে ক্রিকেটার করাতে কি খুব গায়ে লাগবে? বাঙালি ইলিশ খেতেই দুশো টাকা খরচ করে একবেলায়।”
জহরের মনে পড়ল একদিন দেড়শো টাকা দিয়ে আধ কেজি বাগদা তিনি নিজেই কিনেছেন। এটা শখের ব্যাপার কিন্তু ক্রিকেটকে শৌখিন খেলা ভাবতে তিনি রাজি নন, প্রতাপ ব্যবসার জিনিস হিসেবে ক্রিকেটকে দেখছে। দেখুক। কিছু ছেলে ব্যাট ধরা, বল করাটা তো তবু শিখবে।
”সবই তো বুঝলাম, কোচিং দেব কি বিনি পয়সায়?”
”ছি ছি ছি, এ কী কথা বলছেন জহরদা! আপনাকে প্রণামী দেব না, তা কি হয়?”
”অনীশকে কত দেবে?”
”পাঁচশো।”
জহর তীক্ষ্ন চোখে প্রতাপের মুখের দিকে তাকিয়ে। তাঁর মনে হল প্রতাপ মিথ্যা কথা বলল। নিশ্চয় কমিয়ে বলছে যাতে তাঁকেও কম দিতে হয়। তার নাম ভাঙিয়েই যে স্কুল চলবে এটা না বোঝার মতো কাঁচা লোক অনীশ নয়। হাজার টাকার কমে সে আসবে না।
”আপনাকেও পাঁচশো দেব। তবে অ্যামাউন্টটা কাউকে কিন্তু বলবেন না।” প্রতাপ হাত বাড়িয়ে জহরের হাত স্পর্শ করল অনুরোধ জানাতে।
”ঠিক আছে, আমি রাজি।”
প্রতাপের মুখে স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল।
”অনেক টাকা ঢালতে হচ্ছে। দুটো নেটের একটা কংক্রিট আর—একটা মাটিরই করছি, ওখানে ঘাসের পিচ মেন্টেন করা খুবই শক্ত, তবে চেষ্টা করব। নারকোল ছোবড়ার ম্যাটে খেলাব। বাচ্চচাদের জন্য প্যাড, ব্যাট, গ্লাভস, বলও দিতে হবে… বুঝলেন জহরদা, ঝামেলা আর খরচ অনেক, শেষপর্যন্ত লোকসান খেয়ে না যাই!” মুখটা বিব্রত করে প্রতাপ উঠে দাঁড়াল।
”একটা কথা।” জহর থামিয়ে দিলেন বেরোতে যাওয়া প্রতাপকে। ”কীভাবে শিক্ষা দেওয়া হবে, সেটা কে ঠিক করবে, অনীশ?”
প্রতাপ যেন প্রশ্নটার জন্য তৈরিই ছিল। ”কেন, আপনি ঠিক করবেন! অনীশের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ও বলেছে জহরদার মতো অভিজ্ঞ, ক্রিকেট—গুলে—খাওয়া লোক থাকতে আমি কে? কীভাবে কোচিং হবে সেটা উনিই ঠিক করে দেবেন, আমি মাথা গলাব না।”
জহর বুঝলেন দায়দায়িত্ব এড়াবার জন্য, গায়ে ফুঁ দিয়ে ক’টা টাকা কামাবার জন্য অনীশ প্রশংসা করে তাঁকে গাছে তুলে দিয়েছে। অনীশ অবশ্যই ক্রিকেট বোঝে, নয়তো অতদূর পর্যন্ত যেতে পারত না, ওর ক্রিকেট বোধের প্রতি জহরের শ্রদ্ধাও আছে। তবে অনীশ খুবই পেশাদার। হোক পেশাদার, জহর ভাবলেন, আমার স্বাধীনতায় হাত না দিলেই হল!
”যদি আমি মনে করি কোনও ছেলেকে বাদ দিতে হবে, বা কোনও কোচ ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না, বাদ দিতে হবে, তা হলে বাদ দিতে হবে।”
